শনিবার ৪ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪,৬০০ বছর ধরেও অটুট গিজার পিরামিড , ভূমিকম্পেও কেন ভেঙে পড়ে না?

🗓 বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

👁️ ৩১ বার দেখা হয়েছে

🗓 বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

👁️ ৩১ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২ জুলাই) :: পৃথিবীতে মানুষের তৈরি অসংখ্য স্থাপনা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। কোনোটি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে, কোনোটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে, আবার কোনোটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো সময়ের কঠিন পরীক্ষায় টিকে থেকে আজও প্রকৌশল বিস্ময়ের প্রতীক হয়ে আছে। মিশরের গিজার মহাপিরামিড (গ্রেট পিরামিড অব গিজা) সেই বিরল স্থাপনাগুলোর অন্যতম।

প্রায় ৪,৬০০ বছর আগে নির্মিত এই মহাপিরামিড এখনও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু সময়ের ক্ষয় নয়, একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প, তীব্র তাপমাত্রার পরিবর্তন, মরুভূমির ঝড় এবং প্রাকৃতিক ক্ষয়—সবকিছুই সহ্য করেছে এটি।

ফলে দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলীদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—কী এমন বৈজ্ঞানিক রহস্য লুকিয়ে আছে এই স্থাপনায়, যা একে হাজার হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে?

সম্প্রতি সেই প্রশ্নেরই নতুন উত্তর খুঁজে পেয়েছেন একদল গবেষক।

মিশরের ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিওফিজিক্স (NRIAG)-এর ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ এলগ্যাবরি এবং তাঁর সহকর্মীদের পরিচালিত গবেষণা Scientific Reports সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণাটি বলছে, মহাপিরামিডের স্থায়িত্ব শুধু বিশাল আকার বা বিপুল ওজনের কারণে নয়; বরং এর অভ্যন্তরীণ গঠন, ওজনের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন, জ্যামিতিক নকশা এবং মাটির সঙ্গে কম্পনের ভিন্ন সম্পর্ক—সব মিলিয়েই এটি পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

MAJOR DISCOVERY: How The Great Pyramid is Earthquake-Proof!

ইতিহাসের একমাত্র টিকে থাকা প্রাচীন আশ্চর্য

গিজার মহাপিরামিড প্রাচীন বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র স্থাপনা, যা আজও অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ সালে ফারাও খুফুর সমাধি হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লেগেছিল দুই দশকেরও বেশি।

পিরামিডটির মূল উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪৬.৬ মিটার (৪৮১ ফুট), যদিও বর্তমানে বাইরের আবরণী পাথর ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় এর উচ্চতা প্রায় ১৩৮.৮ মিটার

এতে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ২৩ লাখ চুনাপাথর ও গ্রানাইটের ব্লক, যাদের অনেকগুলোর ওজন ২ থেকে ১৫ টন পর্যন্ত। আধুনিক ক্রেন বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই এত বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল, তা আজও প্রকৌশল জগতের অন্যতম বড় রহস্য।

কীভাবে চালানো হলো গবেষণা?

গবেষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে পিরামিডে কম্পন সৃষ্টি করতে পারেননি, কারণ এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন। তাই তারা পিরামিডের ভেতরে ও চারপাশে ৩৭টি অতিসংবেদনশীল সিসমিক সেন্সর স্থাপন করেন।

এই সেন্সরগুলো মানুষের অনুভূতির বাইরে থাকা অতি ক্ষুদ্র কম্পনও শনাক্ত করতে সক্ষম। সমুদ্রের ঢেউ, বাতাস, যানবাহনের চলাচল কিংবা পৃথিবীর স্বাভাবিক ক্ষুদ্র কম্পন—এসব প্রাকৃতিক উৎস থেকেই উৎপন্ন কম্পনের তথ্য সংগ্রহ করে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেন পিরামিডের প্রতিক্রিয়া।

আধুনিক প্রকৌশলে এই পদ্ধতিকে Ambient Vibration Analysis বলা হয়, যা ঐতিহাসিক ভবন, সেতু ও বহুতল ভবনের কাঠামোগত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বহুল ব্যবহৃত।

How the Great Pyramid Survived Earthquakes for 4,600 Years - tovima.com

ভূমিকম্পের শক্তি কেন পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারে না?

গবেষণায় দেখা যায়, পিরামিডের অভ্যন্তরের অধিকাংশ অংশ প্রতি সেকেন্ডে ২.০ থেকে ২.৬ হার্টজ (Hz) হারে স্বাভাবিকভাবে কম্পিত হয়। কিন্তু এর নিচের ভূমির স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক এর সঙ্গে মেলে না।

এখানেই লুকিয়ে আছে মূল রহস্য।

পদার্থবিজ্ঞানে রেজোন্যান্স (অনুরণন) নামে পরিচিত একটি ঘটনা রয়েছে। যদি কোনো ভবনের স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক এবং ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পাঙ্ক এক হয়ে যায়, তাহলে ভবনে কম্পনের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় এবং বড় ধরনের ধ্বংসের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।

গিজার মহাপিরামিডের ক্ষেত্রে গবেষকরা দেখেছেন, মাটি এবং পিরামিডের কম্পনের ছন্দ ভিন্ন হওয়ায় ভূমিকম্পের শক্তি পুরোপুরি কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ক্ষতিকর কম্পনের বড় একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই প্রশমিত হয়ে যায়।

চাপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নতুন ভূমিকা

পিরামিডের রাজকক্ষের (King’s Chamber) উপরে অবস্থিত বিখ্যাত Pressure Relieving Chambers বা চাপ-নিয়ন্ত্রণ কক্ষগুলো নিয়ে নতুন তথ্যও উঠে এসেছে।

এতদিন ধারণা করা হতো, এগুলোর একমাত্র কাজ ছিল ওপরের বিশাল পাথরের চাপ সমাধি কক্ষের ছাদে না পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া।

কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এই কক্ষগুলো সম্ভবত ভূমিকম্পের সময় কম্পনের শক্তিও আংশিকভাবে ছড়িয়ে দেয় এবং কমিয়ে ফেলে। ফলে রাজকক্ষের ওপর অতিরিক্ত কম্পনের চাপ তৈরি হয় না।

সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে চাপ

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পুরো পিরামিডে কম্পনের পার্থক্য খুবই সামান্য। অর্থাৎ কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে অতিরিক্ত চাপ জমে না।

এই ভারসাম্যপূর্ণ ওজন বণ্টনের কারণেই হাজার হাজার বছর ধরে কাঠামোর কোনো বড় অংশ দুর্বল হয়ে পড়েনি।

The Great Pyramid Survived Every Earthquake — Now Scientists Know Why

অতীতের প্রকৌশল থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষা

গবেষকরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে না যে প্রাচীন মিশরীয়রা আধুনিক ভূমিকম্পবিজ্ঞান জানতেন। তবে সমাধি কক্ষকে নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্যে যে স্থাপত্য নকশা তৈরি করা হয়েছিল, সেটিই অনিচ্ছাকৃতভাবে ভূমিকম্প প্রতিরোধেও অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় অংশ না নেওয়া মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শরিফ এল-তাওয়িল বলেন, এই গবেষণা প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে কেন গিজার মহাপিরামিড এত দীর্ঘ সময় ধরে ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পেরেছে।

আধুনিক প্রকৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

বর্তমানে ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণে বেস আইসোলেশন, ড্যাম্পার প্রযুক্তি, শক্তি শোষণকারী বিশেষ কাঠামো এবং উন্নত কম্পিউটারভিত্তিক নকশা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গিজার মহাপিরামিড দেখিয়ে দেয়, হাজার হাজার বছর আগেও শুধুমাত্র জ্যামিতিক নকশা, ভারসাম্যপূর্ণ ওজন বণ্টন এবং সুপরিকল্পিত কাঠামোগত বিন্যাসের মাধ্যমে অসাধারণ স্থায়িত্ব অর্জন করা সম্ভব ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার যুগে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে সক্ষম অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অতীতের এই প্রকৌশল জ্ঞান আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হতে পারে।

গিজার মহাপিরামিডের নির্মাণরহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে নতুন এই গবেষণা অন্তত এটুকু নিশ্চিত করেছে—পৃথিবী যখন কেঁপে ওঠে, তখন মহাপিরামিড কেবল তার বিশাল ওজনের ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তার সূক্ষ্ম প্রকৌশল নকশা, সুষম ওজন বণ্টন, অভ্যন্তরীণ কক্ষের বিন্যাস এবং মাটির সঙ্গে ভিন্ন কম্পন-ছন্দ একসঙ্গে তাকে রক্ষা করে। আর সেই কারণেই প্রায় পাঁচ হাজার বছর পরেও এটি শুধু ইতিহাসের স্মারক নয়, বরং আধুনিক প্রকৌশল বিজ্ঞানের জন্য এক অনন্য জীবন্ত গবেষণাগার।

সূত্র: National Research Institute of Astronomy and Geophysics (Egypt), Scientific Reports

Why the Great Pyramid of Giza Has Withstood Earthquakes for 4,600 Years:  The 'Secret of Vibration' Revealed by Modern Science|最新科学で紐解く歴史ラボ

 

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর