কক্সবাংলা ডটকম(১৯ জুলাই) :: ফুটবল বিশ্বকালের ইতিহাস শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি দুই ফুটবল দর্শনের, দুই সংস্কৃতির, দুই মহাদেশের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাব্য।
একদিকে শৃঙ্খলা, শক্তি ও কৌশলের ইউরোপ; অন্যদিকে শিল্প, ছন্দ, সুজনশীলতা ও আবেগে ভরপুর দক্ষিণ আমেরিকা।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই মহাদেশ লড়াই করে চলেছে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটের জন্য।
এই দ্বৈরথকে অনেকে বলেন ‘ইউরো বনাম লাতিন’-একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসকেই সংজ্ঞায়িত করেছে।
প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই সেই লড়াইয়ের সূচনা। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার ফাইনালে মুখোমুখি হওয়া ছিল দক্ষিন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ লড়াই।
এরপর ১৯৫০ সালে ফাইনালের প্রচলিত ব্যবস্থা না থাকলেও শেষ গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলকে হারিয়ে উরুগুয়ের শিরোপা জয় ইতিহাসে ‘মারাকানাজো’ নামে অমর হয়ে আছে।
এরপর শুরু হয় ইউরোপ ও দক্ষিন আমেরিকার পাল্টাপাল্টি আধিপত্যের গল্প।
১৯৫৮ সালে ব্রাজিল প্রথমবারের মতো ইউরোপের মাটিতে বিশ্বকাপ জিতে নতুন যুগের সূচনা করে। পেলের আবির্ভাবে লাতিন ফুটবলের সৌন্দর্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬২, ১৯৭০ ও ১৯৯৪- ব্রাজিলই দীর্ঘ সময় দক্ষিণ আমেরিকার পতাকা বহন করেছে।
পরে ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা, বিশেষ করে দিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে লাতিন ফুটবল আবারও বিশ্বসেরা হওয়ার স্বাদ পায়।
কিন্তু নতুন শতাব্দীতে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। ইউরোপীয় ফুটবল আরও শক্তিশালী, আরও বৈজ্ঞানিক, আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।
২০০৬ থেকে ২০১৮-টানা চারটি বিশ্বকাপ জেতে ইউরোপের চার ভিন্ন দেশ-ইতালি, স্পেন, জার্মানি ও ফ্রান্স।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘ একচ্ছত্র আধিপত্য।
সেই আধিপত্যে প্রথম বড় আঘাত হানে আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে কাতারের মহারণে ফ্রান্সকে হারিয়ে লিওনেল মেসির দল শুধু বিশ্বকাপই জেতেনি, দক্ষিণ আমেরিকার হারানো গৌরবও ফিরিয়ে আনে।
এক অর্থে ব্রাজিলের পর লাতিন আমেরিকার নেতৃত্ব এসে পড়ে আর্জেন্টিনার কাঁধে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার এই লড়াই কতটা সমানে সমান।
১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০১৪ এবং ২০২২- মোট ১২টি ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে দুই মহাদেশের প্রতিনিধি।
কখনও ব্রাজিলের সাম্বা জিতেছে, কখনও ইতালির দৃঢ়তা, কখনও জার্মানির শৃঙ্খলা, আবার কখনও আর্জেন্টিনার আবেগ।

অন্যদিকে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে নয়বার হয়েছে অল ইউরোপ ফাইনাল। ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৭৪, ১৯৮২, ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৮- এই নয়টি আসরে শিরোপা থেকেছে ইউরোপের ভেতরেই। আর অল দক্ষিণ আমেরিকা ফাইনাল হয়েছে মাত্র একবার- ১৯৩০ সালে।
সংখ্যার হিসাবেও দুই মহাদেশের দ্বৈরথ অবিশ্বাস্যরকম কাছাকাছি।
এখন পর্যন্ত ইউরোপের পাঁচ দেশ- জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেন মিলে জিতেছে ১২টি বিশ্বকাপ।
অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার মাত্র তিন দেশ- ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে- জিতেছে ১০টি বিশ্বকাপ।
দেশের সংখ্যা কম হলেও শিরোপার লড়াইয়ে ইউরোপকে কখনোই সহজ পথ দেয়নি লাতিন আমেরিকা।
ইতিহাস আরও একটি আকর্ষণীয় গল্প বলে।
১৯৮৬ সালে যেমন চার সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে তিনটি ছিল ইউরোপের, দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধি ছিল শুধু আর্জেন্টিনা।
দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুতে সেই আর্জেন্টিনাই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতে ইউরোপের স্বপ্ন ভেঙেছিল।
চার দশক পর যেন ইতিহাস আবার নিজেকে নতুন করে লিখছে। ইউরোপীয় শক্তির ভিড়ে আবারও দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল, উরুগুয়ে, কলম্বিয়া কেউ নেই। লাতিন ফুটবলের সমস্ত আশা এখন আলবিসেলেস্তেদের কাঁধে।
ফুটবলের বিশ্বকাপ তাই কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি দুই মহাদেশের অহংকার, দুই দর্শনের সংঘর্ষ, দুই ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতির মহারণ।
একদিকে ইউরোপের পরিকল্পিত শক্তি, অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার সৃজনশীল সৌন্দর্য।
প্রায় একশ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্পটি আসলে কোনো এক দেশের নয়; এটি ইউরোপ বনাম লাতিন আমেরিকার চিরন্তন লড়াই।
কখনও ইউরোপ এগিয়ে যায়, কখনও লাতিন আমেরিকা ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু এই দ্বৈরথই বিশ্বকাপকে দিয়েছে তার সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে নাটকীয় এবং সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

ইউরোপ-লাতিন
২০২২ আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স
২০১৪ আর্জেন্টিনা-জার্মান
২০০২ ব্রাজিল-জার্মানি
১৯৯৮ ফ্রান্স-ব্রাজিল
১৯৯৪ ব্রাজিল-ইতালি
১৯৯০ আর্জেন্টিনা-জার্মানি
১৯৮৬ আর্জেন্টিনা-জার্মানি
১৯৭৮ আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস
১৯৭০ ব্রাজিল-ইতালি
১৯৬২ ব্রাজিল-চেকোস্লোভাকিয়া
১৯৫৮ ব্রাজিল-সুইডেন
অল লাতিন
১৯৩০ উরুগুয়ে-আর্জেন্টিনা
অল ইউরোপ
২০১৮ ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া
২০১০ স্পেন-নেদারল্যান্ডস
২০০৬ ইতালি-ফ্রান্স
১৯৮২ ইতালি-জার্মানি
১৯৭৪ জার্মানি-নেদারল্যান্ডস
১৯৬৬ ইংল্যান্ড-জার্মানি
১৯৫৪ জার্মানি-হাঙ্গেরি
১৯৩৮ ইতালি-হাঙ্গেরি
১৯৩৪ ইতালি-চেকোস্লোভাকিয়া
লিগ পদ্ধতি
১৯৫০ ব্রাজিল-উরুগুয়ে

ফাইনালের রেফারি কে এই স্লাভকো ভিনচিচ?
২০১০ সাল থেকে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারি হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন ভিনচিচ। স্লোভেনিয়ার ঘরোয়া লিগ ছাড়াও বড় বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ইউরোপীয় ফুটবলে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ইউরোপা লিগ মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৭২টি ম্যাচে তিনি রেফারির ভূমিকা পালন করেছেন।
ভিনচিচের ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো ২০২২ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট ও রেঞ্জার্সের মধ্যকার ইউরোপা লিগ ফাইনাল এবং ২০২৪ সালের রিয়াল মাদ্রিদ ও ডর্টমুন্ডের মধ্যকার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল পরিচালনা করা। এ ছাড়া দুটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও দুটি বিশ্বকাপে রেফারি হিসেবে ছিলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বড় টুর্নামেন্টগুলোর গত ১০টি ম্যাচে তিনি একটি লাল কার্ডও দেখাননি। তবে মেক্সিকোর কাছে ২-০ গোলে হেরে ইকুয়েডরের বিদায় নেওয়ার ম্যাচে সেই রেকর্ডে ছেদ পড়ে। ওই ম্যাচে ইকুয়েডরের ডিফেন্ডার পিয়েরো হিংকাপিয়েকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়। আর্সেনালের এই ডিফেন্ডার যখন মেক্সিকোর সান্তিয়াগো হিমেনেজের সাথে কথা বলছিলেন, তখন তিনি হাত দিয়ে মুখ লুকিয়ে রেখেছিলেন।













