জাবেদ আবেদীন শাহীন :: বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার মতো সামাজিক ব্যাধিকে কেবল বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, অসচেতনতা, সামাজিক অনুশাসনের দুর্বলতা, পারিবারিক সংকট এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার নানা ঘাটতি। তাই প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগেই পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে একটি শিশুবান্ধব জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ামুক্ত কক্সবাজার জেলা গঠনে অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
শব্দশৈলী ও নান্দনিক সঞ্চালনার মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট ম্যানেজার সাগর ডি কস্তা। তাঁর স্বাগত কথনে ফুটে ওঠে শিশু সুরক্ষার ব্যাকুল বার্তা। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা গেলে শিশু সুরক্ষায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব। এজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। বাল্যবিবাহ একটি শিশুর শৈশব ও শিক্ষাজীবনকে সংকুচিত করে শিশুশ্রম তার স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া তাকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। এসব সমস্যার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন জরুরি।
তিনি বলেন, কক্সবাজারকে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ামুক্ত করতে হলে শুধু অভিযান কিংবা আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করলে হবে না। পরিবার থেকে শুরু করে বিদ্যালয়, পাড়া—মহল্লা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে একটি কার্যকর সামাজিক নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কোনো শিশু বিদ্যালয় থেকে অনুপস্থিত হলে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে, কোনো কিশোরীর বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা আগেই শনাক্ত করতে হবে এবং কোনো শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত করার পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
সভায় ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সিনিয়র ম্যানেজার ও প্রতিনিধি রোনাল্ড প্রবীর চিসিক বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম যথেষ্ট নয় প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী ও কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা। শিশুদের ঝুঁকি শনাক্ত করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি কো—অর্ডিনেটর মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বাল্যবিবাহ—শিশুশ্রম ও ঝরেপড়া রোধে এর উপর ভিডিওর প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। পরে তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটি শিশুর শিক্ষা বন্ধ হলে তার ঝুঁকি বাড়ে অর্থনৈতিক সংকট তাকে শ্রমে ঠেলে দিতে পারে এবং সামাজিক চাপ তাকে বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই এসব সমস্যার সমাধানেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন সরকারি—বেসরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী ও সুধীজন তাদের মতামত তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু বিয়ের দিন অভিযান চালালে চলবে না আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও কিশোর—কিশোরীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। শিশুশ্রম বন্ধে পরিবারগুলোর আর্থিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং অফিসার পার্থ প্রতীম বাগচী, জয়শ্রী পিউরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সরকারি—বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
মতবিনিময় সভার শেষ পর্যায়ে বক্তারা অভিন্ন মত প্রকাশ করে বলেন, কক্সবাজারকে শিশুবান্ধব জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিরোধের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনের কাঁধে চাপিয়ে দিলে হবে না। প্রতিটি পরিবার, বিদ্যালয়, মসজিদ—মাদ্রাসা, জনপ্রতিনিধির কার্যালয়, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে শিশু সুরক্ষার একেকটি সক্রিয় দুর্গে পরিণত করতে হবে। সমন্বিত সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার অভিশাপ থেকে কক্সবাজারকে মুক্ত করা সম্ভব বলে তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।













