কক্সবাংলা ডটকম(২২ মে) :: বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার এখন আর শুধু সীমান্তঘেঁষা অপরাধ নয়; এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক নেটওয়ার্কে।
পর্যটন, শিক্ষা ও চাকরির ভিসার আড়ালে দেশের তরুণদের ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অনিরাপদ সমুদ্রপথে হাজারো মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে চরম ঝুঁকি ও মৃত্যুর মুখে।
সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর মানব পাচার ইউনিটের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভয়াবহ এই চিত্র।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক পাচার রুট, সংঘবদ্ধ দালালচক্র, ট্রানজিট ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাচার কৌশলের নানা তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব পাচার এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে বিমানপথে মানব পাচারের জন্য সাতটি প্রধান আন্তর্জাতিক গন্তব্য সক্রিয় রয়েছে।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি, সার্বিয়া-মেসিডোনিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং কম্বোডিয়া-লাওস। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডে দেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি এবং সংঘবদ্ধ দালালচক্র জড়িত।
পাচারকারীরা সাধারণত উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবন ও স্থায়ী বসবাসের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের টার্গেট করে। প্রথমে পর্যটন, শিক্ষা কিংবা চাকরির ভিসা সংগ্রহ করে বৈধতার আড়াল তৈরি করা হয়। পরে তৃতীয় কোনো দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে চূড়ান্ত গন্তব্যে পাঠানো হয়, যাতে সরাসরি নজরদারি এড়ানো সম্ভব হয়।
সিআইডির তথ্যমতে, ইতালিগামী রুট বর্তমানে সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে প্রথমে নেপাল, ভারত বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নেওয়া হয়। পরে মিসর, তিউনিসিয়া কিংবা লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।
এই যাত্রায় মরুভূমি ও সমুদ্রপথে অসংখ্য যুবক প্রাণ হারাচ্ছেন। জাল ভিসা, ভুয়া ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও স্থানীয় দালালচক্র পুরো প্রক্রিয়াকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
এদিকে আমেরিকা ও কানাডাগামী রুটেও নতুন কৌশল দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে ব্রাজিল এবং পরে মেক্সিকো হয়ে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করা হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অন-অ্যারাইভাল সুবিধা এবং দুর্বল ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। কানাডার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও পর্যটন ভিসার অপব্যবহার বাড়ছে। বিদেশে গিয়ে অনেকে অবৈধ অবস্থানে পড়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “বর্তমান পাচারকারীরা শুধু সীমান্ত নয়, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন এজেন্সি ও ভুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।”
অস্ট্রেলিয়াগামী রুটেও ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, পরে ইন্দোনেশিয়া হয়ে সমুদ্রপথে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় ছোট নৌকা ও মাছ ধরার ট্রলারে গাদাগাদি করে মানুষ পরিবহন করা হয়। খাদ্য ও নিরাপত্তার অভাবে বহু মানুষ নিখোঁজ কিংবা নিহত হচ্ছেন।
অন্যদিকে রাশিয়াগামী রুটে সৌদি আরব হয়ে বাংলাদেশিদের নেওয়ার তথ্য দিয়েছে সিআইডি। সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধপ্রবণ অঞ্চলে শ্রমিক বা নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের নামে মানুষ পাঠানোর প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া ও লাওস এখন মানব পাচারের নতুন কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রথমে থাইল্যান্ড এবং পরে এসব দেশে নিয়ে তথাকথিত “অনলাইন চাকরি” বা “কাস্টমার সার্ভিস” কাজের প্রলোভন দেওয়া হয়। বাস্তবে গিয়ে অনেকে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েন এবং জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা, জুয়া ও আর্থিক জালিয়াতির কাজে বাধ্য হন। পালানোর চেষ্টা করলে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
সিআইডি আরও জানিয়েছে, জলপথে মানব পাচারের দুটি বড় রুট বর্তমানে সক্রিয়। একটি রুটে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং অন্য রুটে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়।
ছোট নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সাগরে আটকে রাখা হয় ভুক্তভোগীদের। নৌকাডুবি, অনাহার, মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন এবং মৃত্যুর ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।
সিআইডির মানব পাচার ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। গত চার বছরে ইউনিটটি মোট ৩৪৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ১২২টি মামলা তদন্তাধীন বা নথিভুক্ত রয়েছে। ২০২৪ সালে ছিল ১০০টি এবং ২০২৩ সালে ৮৬টি মামলা।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিসংখ্যান দৃশ্যমান অপরাধের আংশিক চিত্রমাত্র। সামাজিক লজ্জা, আর্থিক ক্ষতি ও ভয়ভীতির কারণে অনেক পরিবার অভিযোগই করে না।
মানব পাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের কথা জানিয়েছে সিআইডি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে সমন্বয়ের পাশাপাশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মানব পাচার মনিটরিং সেল কাজ করছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সহায়তায় প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশিদের সাক্ষাৎকার, যাচাই ও পুনর্বাসন সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে আইওএম, ইউএনওডিসি, ইউএনএইচসিআর, ইন্টারপোল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সংস্থা।
সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, “মানব পাচার এখন আন্তঃদেশীয় অপরাধে পরিণত হয়েছে। তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্ত ছাড়া বড় চক্র ভাঙা কঠিন।”
পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও পাচারকারীদের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের ভাষ্য, ভুয়া ভিসা, প্রতারণামূলক চাকরির অফার এবং দীর্ঘ ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে সিআইডি ও অন্যান্য সংস্থা সমন্বিতভাবে এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল অভিযান পরিচালনা করে মানব পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। বেকারত্ব, বিদেশে উচ্চ আয়ের প্রলোভন, অনলাইন প্রতারণা ও জনসচেতনতার অভাব—এসব কারণ দূর না করলে পাচারচক্র নতুন কৌশলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে।
এদিকে মানব পাচারবিরোধী আইন থাকলেও বিচার কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে কার্যকর শাস্তির নজির খুবই কম। তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা এবং আপস-মীমাংসার কারণে অধিকাংশ মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে অনেক পাচারকারী বারবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “কর্মসংস্থানের সংকট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা মানুষকে বিদেশে উচ্চ আয়ের স্বপ্ন দেখায়। পরিবারগুলো সরল বিশ্বাসে দালালের হাতে টাকা তুলে দেয়, পরে সর্বস্বান্ত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে মানব পাচার শুধু সীমান্তনির্ভর নয়; সোশ্যাল মিডিয়া, ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালেও এটি বিস্তার লাভ করেছে। কঠোর আইন থাকলেও কার্যকর বিচার না হওয়ায় পাচারকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।”
তার মতে, মানব পাচার রোধে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দালাল ও রিক্রুটিং চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।














