কক্সবাংলা ডটকম (১৫ জুন) :: বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন নামে একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
র্যাবের পরিবর্তে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে বাংলাদেশ পুলিশের সহায়ক একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন আইনের প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
খসড়া আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং একটি কার্যকর ও পেশাদার বাহিনী গড়ে তুলতে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ, ১৯৭৯’-এর অধীনে গঠিত র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠন করা হবে।
বর্তমানে খসড়াটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কিছু কারিগরি সংশোধন আসতে পারে, তবে মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে। শিগগিরই এটি মন্ত্রিসভার প্রাথমিক অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
এরপর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে পুনরায় নীতিগত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় তোলা হবে এবং পরে সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে।
এর আগে গত মাসে র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নতুন একটি আধুনিক, পেশাদার ও মানবাধিকারসম্মত এলিট ফোর্স গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
জবাবদিহিমূলক বাহিনী গড়ার পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে র্যাবের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার অভাব, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে একটি গণমুখী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী গঠনের লক্ষ্যেই নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনে বাহিনীর কার্যক্রম, শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্যদের দায়বদ্ধতা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিতর্কের সৃষ্টি না হয়।
র্যাবের সম্পদ ও সদস্যরা এসআরবিতে স্থানান্তর হবে
খসড়া অনুযায়ী, র্যাবের সব সম্পদ, তহবিল, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব, রেকর্ডপত্র, চুক্তি, অধিকার ও দায়-দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে।
এছাড়া র্যাবের সব কর্মকর্তা, সদস্য ও কর্মচারী একই শর্তে নতুন বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করবেন, যতক্ষণ না নতুন আইন অনুযায়ী কোনো পরিবর্তন আনা হয়।
এসআরবির প্রধান দায়িত্ব কী হবে?
নতুন বাহিনীর দায়িত্ব ও কার্যক্রমের মধ্যে থাকবে—
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ
অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা
সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা
অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা
সরকার বা আদালতের নির্দেশে তদন্ত পরিচালনা
এছাড়া প্রয়োজনে প্রবেশ, তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও থাকবে বাহিনীটির।
মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক
র্যাব ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ গঠিত হয় এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই বাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত।
তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ক্রসফায়ার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে র্যাব। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় র্যাব সদস্যদের সম্পৃক্ততা সংস্থাটির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর), গুম তদন্ত কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থা র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেছেন, র্যাবের নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সদস্যদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
তার ভাষায়, “বাহিনীর নাম যা-ই হোক না কেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে—সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।













