রবিবার ১৯ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় বিশ্বের পরাশক্তির তীক্ষ্ণ নজর কক্সবাজারে

🗓 শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

👁️ ২৯ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

👁️ ২৯ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৮ জুলাই) :: ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের হাত ধরে আঠারো শতকের শেষভাগে যাত্রা শুরু হয়েছিল আজকের কক্সবাজারের। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই কর্মকর্তা ১৭৯৮ সালের শেষ দিকে বা ১৭৯৯ সালের শুরুতে আরাকান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়ে রামু অঞ্চলে আসেন।

কোম্পানি উদ্বাস্তুদের চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করলেও হিরাম কক্স বেছে নেন বাঁকখালী ও নাফ নদীর মধ্যবর্তী দক্ষিণাঞ্চল। বর্তমান শহরের বাঁকখালী নদীর তীরে তিনি উদ্বাস্তুদের জন্য আবাসন গড়ে তোলেন এবং একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারেই ‘কক্সের বাজার’ পরিচিতি লাভ করে, যা ধীরে ধীরে কক্সবাজারে রূপ নেয়।

তবে কক্সের উদ্যোগ শুধু মানবিক পুনর্বাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িত ছিল বনভূমি আবাদ, কৃষি সম্প্রসারণ, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব সীমান্তে একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার বৃহত্তর কৌশল। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর কক্সবাজারের বর্তমান বাস্তবতা সেই ইতিহাসেরই সম্প্রসারিত রূপ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

উদ্বাস্তু, সীমান্ত ও নিরাপত্তা—যে তিনটি বিষয় একসময় এ অঞ্চলের গুরুত্ব নির্ধারণ করেছিল, আজও সেই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক বাণিজ্য, মানব পাচার, মাদক চোরাচালান এবং মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন।

বর্তমানে কক্সবাজার শুধু দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংবেদনশীল জেলা। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ঘিরে কক্সবাজার এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

চীন-সংযোগ করিডোরের প্রস্তাবে নতুন আলোচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে কক্সবাজারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চীন ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রস্তাবিত করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয়ে পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি শাখা যাবে ইয়াঙ্গুনে এবং অন্যটি পৌঁছাবে রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে। পরবর্তীতে সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে এটি কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান মনে করেন, কক্সবাজারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বর্তমানে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’র সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাঁর মতে, মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা কমাতে বঙ্গোপসাগর হয়ে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে কক্সবাজার

ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে জেলার অর্থনৈতিক গুরুত্বও। একসময় শুধুমাত্র পর্যটননির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিচিত কক্সবাজার এখন জ্বালানি, বন্দর ও শিল্প বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক এবং জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ভবিষ্যতের ‘বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর’ হিসেবে দেখছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।

এছাড়া সম্প্রসারণ করা হচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। রানওয়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে এটি দেশের প্রথম সমুদ্রঘেঁষা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত হওয়ার পথে। একই সঙ্গে চালু হয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ, যা পর্যটন, বাণিজ্য এবং পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পুরো দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি চালু হলে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্যও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে।

রোহিঙ্গা সংকট: বৈশ্বিক মানবিক চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। জেলার পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চল আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও উদ্বাস্তু সংকটের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

বিশেষ করে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযান শুরু হলে কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পূর্ববর্তী ঢলের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা একাধিকবার কক্সবাজার সফর করেছেন। তবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও টেকসই প্রত্যাবাসন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক নয়, বরং নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে। বন উজাড়, পাহাড় ধ্বংস, স্থানীয় শ্রমবাজারে চাপ এবং সীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধির বিষয়গুলো ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি: মাদক ও মানব পাচারের করিডোর

টেকনাফ-নাফ নদী সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে মানব পাচার চক্রও এ অঞ্চলকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, সীমান্তবর্তী এলাকার পাশাপাশি শরণার্থী শিবিরকেন্দ্রিক অপরাধী নেটওয়ার্কও মাঝে মাঝে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইয়াবা, অস্ত্র, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, টেকনাফ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় মানব পাচার ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব অপরাধ দমনে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

জাতীয় রাজনীতিতেও বাড়ছে গুরুত্ব

কক্সবাজারের গুরুত্ব শুধু অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় রাজনীতিতেও জেলার প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য। এছাড়া বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)-এর একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা এ জেলা থেকে উঠে এসেছেন।

ঐতিহাসিকভাবেও কক্সবাজার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ আমলে খান বাহাদুর মৌলভি জালালুদ্দীন আহমদ এবং পাকিস্তান আমলে মৌলভি ফরিদ আহমদ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সেন্ট মার্টিন ও সামুদ্রিক কৌশল

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনও কক্সবাজারের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ, ব্লু ইকোনমি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের প্রেক্ষাপটে দ্বীপটির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা একাধিকবার সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অধিকার, জ্বালানি অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে দ্বীপটির গুরুত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে কক্সবাজার

বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজার বর্তমানে বাংলাদেশের এমন একটি জেলা যেখানে ইতিহাস, ভূরাজনীতি, অর্থনীতি, পর্যটন, নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকট একইসঙ্গে মিলিত হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেল সংযোগ ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে জেলার গুরুত্ব আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তবে একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, মাদক ও মানব পাচার, পরিবেশ ধ্বংস, বন উজাড়, পাহাড় কাটা এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও জরুরি। উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে সুষম সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার শুধু দেশের প্রধান পর্যটন নগরী নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর