রবিবার ৯ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোটরসাইকেল থেকে বিলাসবহুল গাড়ি : ইয়াবা পাচারে নতুন নতুন কৌশল পরিবর্তন মাদক কারবারীদের

🗓 শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

👁️ ২৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

👁️ ২৮ বার দেখা হয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে মাদকের নেটওয়ার্ক, সাম্প্রতিক অভিযানে মিলছে নতুন নতুন কৌশলে দেশজুড়ে ইয়াবা পাচারের কৌশলে পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, প্রচলিত বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পিকআপের পাশাপাশি এখন মোটরসাইকেল ব্যবহার করেও ইয়াবার চালান পরিবহন করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী কথিত ‘বাইকার গ্যাং’, দম্পতি এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে ইয়াবা পরিবহনের ঘটনা সামনে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পাচারকারীরা তল্লাশি এড়াতে একেক সময় একেক ধরনের যানবাহন ও কৌশল ব্যবহার করছে।

কখনো মোটরসাইকেল, কখনো ব্যক্তিগত বা বিলাসবহুল গাড়ি, আবার কখনো পিকআপে করে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক অভিযানের ঘটনাগুলোতে এমন প্রবণতারই ইঙ্গিত মিলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইয়াবার নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত।

সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে চালান সংগ্রহের পর তা বিভিন্ন হাত ঘুরে চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছায় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি।

এই নেটওয়ার্কে বহনকারী থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা ও কথিত মূল হোতাদের বিভিন্ন স্তর রয়েছে।

মোটরসাইকেলে বড় চালান

সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে বড় পরিমাণ ইয়াবা পরিবহনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার ডাকবাংলো এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচটি মোটরসাইকেলসহ ছয়জনকে আটক করে র‌্যাব-৭।

এ সময় তাদের কাছ থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানানো হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা বলা হয়েছে।

র‌্যাবের দাবি, আটক ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ ‘বাইকার গ্যাং’-এর সদস্য এবং মোটরসাইকেল ব্যবহার করে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবার চালান পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

আটক ব্যক্তিরা হলেন—মো. বশির (৩৮), বেলাল উদ্দিন (৩২), নুরুল মোস্তফা (২৭), মো. সাইফুল (২৪), মো. হাসান (৩৯) ও মো. হোসেন (৩৭)।

র‌্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এআরএম মোজাফফর হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে আটক ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে মাদক পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

পিকআপেও ইয়াবার চালান

এর আগে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার লইট্টাঘাটা ৪ নম্বর ঘাটের প্রবেশমুখে মেরিনার্স রোডে চেকপোস্টে তল্লাশির সময় কক্সবাজার থেকে আসা একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন নীল রঙের খোলা পিকআপ থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, চালানটি নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার এলাকার এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আনা হচ্ছিল। এ ঘটনায় উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের উত্তর পুকুরিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. আবুল কালাম (৩৮)কে গ্রেপ্তার করা হয়।

কোতোয়ালি থানার ওসি জায়েদ নূর বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশির সময় পিকআপ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

এছাড়া গত (১ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চুনতী রেঞ্জ বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত পুলিশ চেকপোস্টে অভিযান চালিয়ে একটি প্রাইভেটকারের গোপন চেম্বার থেকে ১৬ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দুই নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের পলাশ মাহমুদ (৩৬), গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার পূর্ব কলমেরশর এলাকার মো. সজীব মিয়া (২৮), নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বিদ্যাবল্লভ গ্রামের সাদিয়া আক্তার (২৪) এবং নুসরাত জাহান ইভা (১৯)।

লোহাগাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) গোবিন্দ দাস জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মেট্রো-গ-৩১-৪৮৬৩ নম্বরের একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় গাড়িটির বাম পাশের পেছনের সিটের চাকার ওপর বডির ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি করা একটি গোপন চেম্বার থেকে ১৬ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

তিনি জানান, ইয়াবার চালানটি কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করে প্রাইভেটকারের গোপন চেম্বারে লুকিয়ে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়।

সরকারি স্টিকার ব্যবহার করেও পাচারের চেষ্টা

শুধু মোটরসাইকেল বা পিকআপ নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ এড়াতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এর আগে কক্সবাজারের রামুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো একটি প্রাইভেটকারে ইয়াবা পাচারের সময় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এ সময় ছয় হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

এ ছাড়া কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে বিলাসবহুল গাড়িতেও ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগে অভিযান হয়েছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবারিরা তল্লাশি এড়াতে যানবাহনের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি নানা পরিচয় ও কৌশল ব্যবহার করছে।

দম্পতি ও তরুণদেরও ব্যবহার

মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামের খুলশী থানার ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের রেলওয়ে হাসপাতালের সামনে অভিযান চালিয়ে চার হাজার পিস ইয়াবাসহ এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, পাচারকারীরা অনেক সময় সাধারণ যাত্রী বা পরিবারের সদস্যের পরিচয় ব্যবহার করেও মাদক পরিবহনের চেষ্টা করে।

সাম্প্রতিক আরেক ঘটনায় কক্সবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত ইয়াবা নেটওয়ার্কের বিস্তারের চিত্রও পাওয়া গেছে। ৭ আগস্ট খুলনায় র‌্যাবের অভিযানে ৩ হাজার ৯৫৮ পিস ইয়াবাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী এলাকার দুই নারীও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টেকনাফেও অব্যাহত অভিযান

কক্সবাজারের টেকনাফেও ইয়াবাবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া চকবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯৮০ পিস ইয়াবা, মাদক বিক্রির নগদ ৭২ হাজার ৯৯০ টাকা, একটি ইলেকট্রিক শক মেশিন ও দুটি মোবাইল ফোনসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১৫।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তবর্তী টেকনাফ ও উখিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে ইয়াবা পরিবহনের রুটগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।

তরুণদের জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় কিছু উঠতি বয়সী তরুণ ও কিশোর মাদক পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ প্রথমে মাদক সেবনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পরে অর্থের প্রয়োজনে বিক্রি বা পরিবহনে জড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভুল সঙ্গের কারণে তরুণদের একটি অংশ মাদকাসক্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে শুধু বাহক বা পরিবহনকারীদের গ্রেপ্তার নয়, মাদকের অর্থের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা এবং এর পেছনে থাকা কথিত মূল হোতাদের শনাক্ত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি

বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, মাদক, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ দমনে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। শুধু মাদক বহনকারীকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; কক্সবাজারভিত্তিক মাদক নেটওয়ার্কের মূল হোতাদেরও ধারাবাহিকভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে।

এদিকে ৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদক চোরাচালান ও মাদকের বিস্তার রোধ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি জানান, একটি টাস্কফোর্স কমিটির মাধ্যমে মাদক চোরাকারবারি ও ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করা হবে এবং সেই তালিকার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, মাদক নির্মূলে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। পুলিশ নিয়মিত মাদক উদ্ধার ও সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করছে এবং নগরীর সব থানায় মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইয়াবা পাচারকারীরা একক কোনো পরিবহনব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করছে। ফলে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে সীমান্ত, মহাসড়ক, নগরীর প্রবেশপথ ও সম্ভাব্য সরবরাহ নেটওয়ার্কে সমন্বিত নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর