রবিবার ৯ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা : সাড়ে ছয় বছরে নিহত ১৫ হাজার ৭১২, আহত ১৪ হাজারের বেশি

🗓 শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৮ আগস্ট) :: দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন।

২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

শনিবার (৮ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এ তথ্য জানায়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হন।

২০২১ সালে দুর্ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৮টি, এতে নিহত হন ২ হাজার ২১৪ জন

২০২২ সালে ২ হাজার ৯৭৩টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩ হাজার ৯১ জন

২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ৪৮৭ জন

২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৭৭ জন নিহত হয়েছেন।

অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

বিশেষ করে ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেও এক হাজারের বেশি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

ভারী যানবাহনের ধাক্কায় বেশি দুর্ঘটনা

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৫ হাজার ৪৯৭টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে

অন্যদিকে ৬ হাজার ৩১৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ভারী যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায়। এছাড়া ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনা হয়েছে মুখোমুখি সংঘর্ষে এবং ৭০৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্যান্য কারণে

এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষও প্রাণহানির অন্যতম বড় কারণ। বিশেষ করে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপসহ ভারী যানবাহনের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে গুরুতর হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

দুর্ঘটনার দায় কার?

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী। অন্যদিকে বাসচালক দায়ী ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনায়।

পণ্যবাহী যানবাহন—ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি ও লরিসহ বিভিন্ন যানবাহন—৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপ দায়ী ২ দশমিক ৭২ শতাংশ ঘটনায়।

এ ছাড়া থ্রি-হুইলার ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, বাইসাইকেল ও রিকশা দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং পথচারী ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

আঞ্চলিক সড়কেই বেশি দুর্ঘটনা

সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৬ হাজার ৬৮৯টি আঞ্চলিক সড়কে, ৪ হাজার ৭৭৩টি জাতীয় মহাসড়কে, ১ হাজার ৯৫৭টি গ্রামীণ সড়কে এবং ২ হাজার ৬৪৬টি শহরের সড়কে ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে দ্রুতগতির ভারী যানবাহনের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল, ওভারটেকিং, বিপজ্জনক গতিতে চালানো এবং সড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের গতি ও চলাচলের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে।

নিহতদের বড় অংশ তরুণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন বছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর নিহতদের মধ্যে ৭৫ দশমিক ৩৯ শতাংশের বয়স ছিল ১৪ থেকে ৪৫ বছর। ২০২২ সালেও নিহতদের বড় অংশ ছিল ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী।

ফলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা শুধু সড়ক নিরাপত্তার সংকট নয়; এটি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও তরুণ পেশাজীবীদের একটি বড় অংশ দৈনন্দিন যাতায়াতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দুর্ঘটনার প্রভাব পরিবার ও অর্থনীতিতেও পড়ছে।

কেন বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা?

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোটরসাইকেলের দ্রুত প্রসার, সহজলভ্য গণপরিবহনের ঘাটতি, দীর্ঘ যানজট, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, চালকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি, ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা।

সংস্থাটি আরও বলছে, মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনে গতি ও রোমাঞ্চকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা তরুণদের মধ্যে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়াতে পারে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া মোটরসাইকেল ব্যবহারের সংস্কৃতিও সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

গণপরিবহনের সংকটও বড় কারণ

বাংলাদেশে সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ মোটরসাইকেলকে দ্রুত যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। যানজট এড়িয়ে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগও মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়িয়েছে।

কিন্তু মোটরসাইকেল চার চাকার যানবাহনের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পূর্ববর্তী বিশ্লেষণেও মোটরসাইকেলকে চার চাকার যানবাহনের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে।

মানসম্মত হেলমেটের ব্যবহার জরুরি

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা। শুধু হেলমেট পরলেই হবে না, সেটি মানসম্মত হতে হবে এবং চালক ও আরোহী উভয়েরই সঠিকভাবে হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার সময় মাথায় গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।

দুর্ঘটনা কমাতে যেসব পদক্ষেপের সুপারিশ

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা;
  • ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া;
  • অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো;
  • মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো;
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো;
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের লক্ষ্য করে নিরাপদ মোটরসাইকেল চালানোর প্রচারণা চালানো;
  • মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনে গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ চালনাকে রোমাঞ্চকর হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বন্ধ করা;
  • জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে ভারী ও হালকা যানবাহনের চলাচল আরও সুশৃঙ্খল করা;
  • দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক ও মোড়ে প্রকৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা;
  • চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার মান উন্নত করা;
  • এবং সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালকদের সচেতন করলেই হবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং, এডুকেশন ও এনফোর্সমেন্ট—এই তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভারী যানবাহনের চালকদের দক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক সক্ষমতা নিশ্চিত, সড়কের নকশা ও অবকাঠামো উন্নত এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগে কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে।

নইলে ব্যক্তিগত যাতায়াতের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে মোটরসাইকেলের ব্যবহার যত বাড়বে, ততই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর