রবিবার ১৬ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের স্থপতিকে হত্যার ৫১ বছর, কী ঘটছিল ১৫ আগস্টের আগে

🗓 শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

👁️ ২০ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

👁️ ২০ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৫ আগস্ট) :: শোকাবহ ১৫ আগস্ট আজ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদাতবার্ষিকী। গত দুই বছরের মতো এবারও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসেছে দিনটি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজ থাকছে না কোনো আনুষ্ঠানিকতা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতন ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পূর্ববর্তী টানা ১৫ বছর দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ও ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দিবসটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সরকারি ছুটি বাতিল করে। ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন বন্ধ থাকে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকার ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। ফলে এবারও দিনটিতে কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থাকছে না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেদিন ভোরবেলা ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শাহাদাতবরণ করেন তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে– মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, সেনা কর্মকর্তা শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল এবং দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল প্রমুখ। তবে প্রবাসে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

কর্মসূচি নেই আওয়ামী লীগের

আগের ১৫ বছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হতো ‘শোকাবহ আগস্ট’। কিন্তু সরকার পতনের পর কার্যত ছিন্ন-ভিন্ন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আজ শনিবার আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে আজ রাতে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা করার কথা জানানো হয়েছে। এতে ভারতে অবস্থানরত দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন। এ ছাড়া ফেসবুকে কেউ কেউ বারবার আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ এবং বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘোষণা দিচ্ছেন।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধেও কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ পাচ্ছেন না দলীয় নেতাকর্মীরা। গণঅভ্যুত্থানের বছর ২০২৪ সালেও সেখানে গোপালগঞ্জ জেলা ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের ব্যানারে স্বল্প পরিসরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া-মোনাজাতের কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল। তবে ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ঢোকার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধের প্রধান ফটকসহ ভেতরে পুলিশের কঠোর পাহারা বসানো হয়েছে। স্থানীয় মানুষ এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এই অবস্থায় কমপ্লেক্সটির ভেতরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের সমাধি জরাজীর্ণ রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে, রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এই চত্বরে অবস্থিত মসজিদ, লাইব্রেরি, গবেষণা কেন্দ্র, প্রদর্শনী কেন্দ্র, উন্মুক্ত মঞ্চ, ফুলের বাগানসহ গোটা এলাকা অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরে উঠেছে।

পলাতক পাঁচ খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনা আরও অনিশ্চিত

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার চেষ্টা করলেও তাদের ফেরত আনতে পারবে না, এটাই বাস্তবতা।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সেই পলাতক পাঁচ আসামি হলেন– লে. কর্নেল (বরখাস্ত) এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) এ এম রাশেদ চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। তাদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্য তিনজনের অবস্থান জানা নেই।

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ১২ আসামির মধ্যে পাঁচজনের সাজা কার্যকর করা হয়। তারা হলেন– সাবেক মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) ফারুক রহমান, কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, এ কে এম মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) ও লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি)। আরেক আসামি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদের ফাঁসি ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল কার্যকর করা হয়। ওই বছর ৭ এপ্রিল ঢাকার গাবতলী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে তিনি প্রায় দুই যুগ ভারতে আত্মগোপন করেছিলেন। আরেক পলাতক আসামির মৃত্যু হয় বিদেশে।

নূর ও ডালিমসহ পাঁচ পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও সফল হয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। এদিকে গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে  কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী এখন দেশছাড়া। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেবে না বিএনপি সরকার।

তাছাড়া, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যেসব দেশে আত্মগোপন করে আছেন, সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তিশালী বন্দিবিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকা বড় বাধা। অনেক পশ্চিমা দেশ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না। বাংলাদেশ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফিরিয়ে আনতে চাইলে সেই দেশগুলো আইনি জটিলতা বা মানবাধিকারের প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে, পলাতক আসামিরা আশ্রয় নেওয়া দেশের আদালতে আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে রেখেছেন। পাশাপাশি যেসব দেশে পলাতকরা আইনি মর্যাদায় বসবাস করছেন, তাদের অবস্থান হালনাগাদ করাও কঠিন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, রাজনৈতিক চিন্তা করলে সরকারের নীতি এক ধরনের হবে, আর আইনের শাসনের কথা চিন্তা করলে, বাংলাদেশে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, এটা সত্য যে আওয়ামী লীগ সরকার এই ফাঁসির আসামিদের ফিরিয়ে আনার জন্য বহু চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। যেহেতু ফাঁসির রায় হয়েছে, তাই বিদেশিরা তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা আসামিদের ফেরত পাঠাবে না। এই সরকার চেষ্টা করলেও তাদের ফেরত আনতে পারবে না, এটাই বাস্তবতা।

১৫ আগস্টের আগে বাংলাদেশে কী ঘটছিল

স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রথমবার সামরিক অভ্যুত্থান দেখে বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে সংঘটিত ওই অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।

এমন একটি সময় এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যখন দেশটিতে রীতিমত অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গঠন করা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল)। চারটি ছাড়া অন্যসব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিল করা হয়েছিল।

সেইসঙ্গে, দুর্নীতি-লুটপাট ও চুরি-ডাকাতির ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘিরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।

এর মধ্যেই দল নিষিদ্ধ এবং নেতাকর্মীদের ‘বিনা বিচারে হত্যা ও গ্রেপ্তারের’ প্রতিবাদে সরকারের বিরুদ্ধে নানান তৎপরতা শুরু করে চরমপন্থী বিভিন্ন সংগঠন।

আগস্টের আগে শেখ মুজিবের ওপর এক দফা হামলাও হয়েছিল বলে তখন ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিল ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।

“সব মিলিয়ে দেশে তখন দম বন্ধ হওয়ার মতো এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বাকশালের কারণে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের সুযোগ যেহেতু সেভাবে ছিল না, সেজন্যই হয়তো সেনাবাহিনীর একটি অংশ তখন ক্যু করার পথ বেছে নিয়েছিল,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।

কিন্তু শেখ মুজিব নিহত হওয়ার আগের কয়েক সপ্তাহ বাংলাদেশে ঠিক কী ঘটছিল?

দুর্নীতি ও লুটপাট

স্বাধীনতার পর কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, কোনোভাবেই সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলো না শেখ মুজিবের সরকার। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পর দুর্নীতি ও লুটপাট আরও বেড়ে যায় বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও সেসময়ের পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানা যায়।

“রিলিফের মাল দুঃস্থ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। চলে গম চুরি, চাল চুরি, কম্বল চুরি,” অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন।

দুর্নীতি, লুটপাট ও চোরাচালান বন্ধসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায় সরকার। তারা কাজ করতে গিয়ে দেখেন দুর্নীতি ও চোরাচালানের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অনেকেই জড়িত।

“তরুণ অফিসাররা এসময় ক্ষমতাসীন পার্টির বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। পার্টির নেতারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেখ সাহেবের কাছে ক্রমাগত অভিযোগ তুলতে থাকে,” নিজের বইতে লিখেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মি. হামিদ।

দলের ভেতর থেকে চাপ বাড়তে থাকার একপর্যায়ে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনে সরকার।

বিবিসি বাংলাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এমন সিদ্ধান্তের ফলে সেনা সদস্য এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা নেগেটিভ পারসপেশন (নেতিবাচক ধারণা) তৈরি হয় যে, শেখ মুজিব তার দলের নেতাকর্মীদের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ না করে উল্টো প্রশ্রয় দিচ্ছেন।’

ফলে দুর্নীতি-লুটপাট আরও সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে। সেসময় সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে কীভাবে খাদ্যশস্য লুটপাট হচ্ছিলো, ১৯৭৫ সালের ২৬শে জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে সেটির কিছু ছবি ছাপানো হয়।

ব্যাপারটিকে ‘হরির লুট’ আখ্যা দিয়ে খবরে লেখা হয়েছে, গুদাম থেকে খাদ্যশস্য পাচারের এমন ঘটনা অনেকদিন থেকেই ঘটছে।

এর কিছুদিন পর প্রকাশিত আরেকটি খবরে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, সরকারি গুদাম থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর সময় পথেই এক চতুর্থাংশ খাদ্যশস্য ‘রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাচ্ছে’।

মূলতঃ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে অনেকটাই ‘অরক্ষিতভাবে’ পাঠানোর কারণে যাত্রাপথে ট্রেনের বগি ভেঙে ‘ব্যাপকহারে খাদ্য পাচার’ করা হচ্ছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার একটি ছবিও প্রকাশ করে পত্রিকাটি।

দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ছাপা সরকারি গুদাম থেকে খাদ্যশস্য পাচারের ছবি

১০ই অগাস্ট দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “সমাজের সর্বস্তর আজ দুর্নীতির বিষদাঁতে বিদ্ধ…মুক্তিযুদ্ধে শহীদানের পরিবার-পরিজনকে দেয়া ২৭১টি চেক ওরা গায়েব করে ফেলেছে।”

আইনশৃঙ্খলায় অবনতি

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই আরও খারাপের দিকে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের মতো ঘটনা ঘটতে থাকে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের বাড়িতে চুরি-ডাকাতির পাশাপাশি সেসময় ট্রেন এবং লঞ্চেও অহরহই ডাকাতির ঘটনা ঘটে, যার খবর ছাপা হয় তখনকার পত্র-পত্রিকায়।

১৯৭৫ সালের ১১ই অগাস্ট দৈনিক বাংলা পত্রিকায় তেমনি একটি ট্রেন ডাকাতির খবরে ছাপা হয়।

‘দুর্ধর্ষ ট্রেন ডাকাতি’ শিরোনামের খবরটিতে বলা হয়েছে, ঠিক আগের রাতে চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদীগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ডাকাতির ঘটনাটি ঘটেছে।

সেখানে বাধা দিতে গেলে ডাকাত দলের সদস্যরা শতাধিক রাউন্ড গুলি নিক্ষেপ করে। সেই গুলিতে দুই যাত্রী নিহত এবং অন্তত ২২ জন আহত হন বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান

১৯৭৫ সালের শুরুতে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির শীর্ষ নেতা সিরাজ শিকদারকে হত্যা করে পুলিশ।

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় চরমপন্থী সংগঠনটির নেতাকর্মীরা তাদের সহিংস তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে দেশের ‘শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে’ বলে জানায় তৎকালীন সরকার।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বহারা পার্টিসহ চরমপন্থী বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে পুলিশ ও রক্ষী বাহিনী।

সেই অভিযানের খবরাখবর নিয়মিতভাবেই তখনকার পত্রপত্রিকায় বের হতে থাকে। সেখানে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে ‘গোলাগুলিতে’ মাঝেমধ্যেই চরমপন্থী নেতাকর্মীদের নিহত হতে দেখা যায়। কম ক্ষেত্রেই সরকারি বাহিনীর সদস্যদের হতাহত খবর পাওয়া যায়।

১৩ই অগাস্ট, অর্থাৎ শেখ মুজিব নিহত হওয়ার দুইদিন আগে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত তেমনই একটি খবরের শিরোনাম: ‘৪ জন চরমপন্থী নিহত, ১ জন গ্রেফতার’।

খবরটিতে বলা হয়েছে, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় অভিযান চালাতে গেলে ‘চরমপন্থীরা’ রক্ষী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি নিক্ষেপ শুরু করলে তারাও পাল্টা গুলি চালায়।

এতে চরমপন্থী সংগঠনের চার সদস্য ঘটনাস্থলে নিহত হন। এছাড়া অপর একজনকে গ্রেফতার করা হলেও বাকিরা পালিয়ে যান।

প্রথমে খরা, তারপর বন্যা

চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের প্রভাব তখনো পুরোপুরি কাটয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। খাদ্য সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদেরকে উৎসাহ দেওয়া হয় যে, আউশের মৌসুমে তারা যেন আরও বেশি জমিতে ধান চাষ করে।

কৃষকদের অনেকে এই আহ্বানে সাড়াও দেন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই দেখা দেয় খরা।

১৯৭৫ সালের নয়ই জুলাই প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের একটি খবরের শিরোনাম: ‘পানির অভাবে আউশ ধানের গাছ শুকাইয়া যাইতেছে’।

সেখানে বলা হয়েছে, ভরা বর্ষা মৌসুমেও অনেকদিন বৃষ্টি না হওয়া ও সেচের অভাবে কুমিল্লা, নেত্রকোণা, কালিগঞ্জসহ দেশের অনেক এলাকায় আউশের সফলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পানির অভাবে ধানের গাছ শুকিয়ে মরতে বসায় কৃষকরা চিন্তায় পড়ে গেছেন।

এ ঘটনার সপ্তাহ দেড়েকের মধ্যে ‘মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে দেশে দেখা দেয় আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। খরার পর শুরু হয় একটানা বৃষ্টি।

এই অতিবৃষ্টি ও উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর অঞ্চলের অনেক এলাকায় বন্যা দেখা দেয়।

এতে আউশের ফসলসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির পাশাপাশি বেশকিছু প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।

অন্যদিকে, বন্যা কবলিত এলাকায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা যায়। সেইসঙ্গে, তীব্র হয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ

সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, বেশকিছু কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে তখন অস্থিরতা ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল।

বিশেষ করে, দলীয় নেতাদের চাপের মুখে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্তে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

এছাড়া সেনাবাহিনীর একাংশ শেখ মুজিবের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা মেনে নিতে পারছিলেন না বলেও জানা যায়।

“এই সময় তরুণ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের কিছু অংশ দারুণ ক্ষেপে ওঠে। তারা ভেতরে ভেতরে দল পাকাতে থাকে,” নিজের বইতে লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ।

পদ-পদবী ঘিরে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দেয়।

অন্যদিকে, রক্ষী বাহিনীর সুযোগ-সুবিধা ঘিরেও সেনাদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যেই একটি গুজবকে কেন্দ্র করে সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে।

“ক্যান্টনমেন্টে গুজব ছড়িয়ে পড়লো, শেখ সাহেব সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত করে ভারতীয় সহযোগিতায় রক্ষী বাহিনীকে গড়ে তুলছেন। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে রক্ষী বাহিনীকে সাজিয়ে দিচ্ছেন। রক্ষী বাহিনীর জন্য নূতন নূতন ব্যারাক, নূতন গাড়ি, নূতন ইউনিফর্ম সেনাবাহিনীর সন্দেহ আরো বাড়িয়ে তোলে,” সাবেক সেনা কর্মকর্তা মি. হামিদ তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রস্থে লিখেছেন।

এর বাইরে, বিভিন্ন ইস্যুতে সেনাবাহিনীর তরুণ কিছু কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনা ঘিরেও অনেকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন মি. হামিদ।

দুর্নীতিরোধে অভিযান

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেটার ফলে তৎকালীন সরকার যে ক্রমেই সাধারণ মানুষের সমর্থন হারাচ্ছিল, একপর্যায়ে তিনি নিজেও সেটি টের পান।

তখন দুর্নীতি ও চোরাচালান বন্ধে বেশ কয়েক দফায় অভিযানও চালায় তার সরকার। এর মধ্যে সবশেষ অভিযানটি শেখ মুজিব শুরু করেছিলেন নিহত হওয়ার সপ্তাহ তিনেক আগে।

জুলাইয়ের শেষভাগের ওই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল মূলতঃ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিরুদ্ধে। ফলে সেসময়ের পত্র-পত্রিকায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা এবং গ্রেফতার হওয়ার খবর নিয়মিতভাবে ছাপা হতে দেখা যায়।

১৯৭৫ সালের পহেলা অগাস্ট দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত তেমনই একটি খবরের শিরোনাম: ‘সাত লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩ জন গ্রেফতার’।

খবরটিতে বলা হয়েছে যে, ব্যাংকের ভুয়া রশিদ ব্যবহার করে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তিন কর্মকর্তা সরকারি প্রায় সাত লাখ সাড়ে ২৭ হাজার টাকা সমমূল্যের সিমেন্ট তুলে বিক্রি করে, সেই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে জানতে পারে দুর্নীতি দমন সংস্থা। পরে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।

দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিমন্ত্রী বরখাস্ত

১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন যোগাযোগে প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে ‘সতর্ক করা এবং সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার’ লক্ষ্যে মন্ত্রিসভার ওই সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে তখনকার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানিয়ে মঞ্জুরকে ২১শে জুলাই একটি চিঠি পাঠান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সরকার প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান। পরের দিন প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে সেই চিঠির বর্ণনা খবরে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে: “আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৮ (৫) ধারার আওতায় আমি আপনাকে প্রতিমন্ত্রীর পদ হইতে অপসারণ করিতেছি।”

অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা

সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকারের পতন এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় মেজর সৈয়দ ফারুক রহমানকে।

তখনকার প্রথম বেঙ্গল ল্যান্সার রেজিমেন্টের এই কর্মকর্তা বেশ সময় নিয়ে পরিকল্পনাটি করেছিলেন এবং সেটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৫ই অগাস্টের কয়েক সপ্তাহ আগে অন্য সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানা যায়।

কিন্তু সেনাবাহিনীর একজন জুনিয়র কর্মকর্তা মেজর ফারুক, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধাও বটে, তিনি কেন হঠাৎ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনা করলেন?

“ফারুক ছিল বড়ই আবেগপ্রবণ। দেশের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দুর্ভিক্ষ, ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার অপব্যবহার, খুন, হাইজ্যাকিং ইত্যাদি অবলোকন করে সে ভীষণভাবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে,” নিজের বইতে লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন- “দেশ ক্রমাগত ভারতের কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে, শেখ মুজিব দেশকে ভারতের সেবাদাস বানিয়ে ফেলছেন, ফারুকের ভেতরে এই ধারণা প্রবল মানসিক যন্ত্রণার উদ্রেক করে। পাকিস্তানী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আমরা ভারতের শৃঙ্খল পরতে রাজী নই- এই ছিল ফারুকের কথা।”

অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার কথাটি মেজর ফারুক প্রথমে জানান সেনাবাহিনীর আরেক মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদকে। সম্পর্কে তারা দু’জন ছিলেন ভায়রা ভাই।

১২ই অগাস্ট রাতে আলোচনা করে তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ১৫ তারিখকে বেছে নেয় বলে ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রস্থে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোশতাকের সঙ্গে বৈঠক

সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত এবং জোরপূর্বক অবসর দেওয়ার ক্ষুব্ধ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে মেজর ফারুক এবং মেজর রশিদের যোগাযোগ হয়।

চাকরি হারানোর ফলে ক্ষুব্ধ ওইসব কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন মেজর শরীফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, আজিজ পাশা এবং সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান।

এর বাইরে, একজন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাও অভ্যুত্থানে অংশ নেন, যার নাম বজলুল হুদা।

সামরিক এসব কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেন অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারী সেনা কর্মকর্তারা।

তাদের মধ্যে কেবল খন্দকার মোশতাক আহমেদের কাছ থেকেই তারা ইতিবাচক সাড়া পান।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ তার বইতে লিখেছেন যে, ১৯৭৫ সালের দোসরা অগাস্ট শেখ মুজিব সরকারের মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন মেজর রশিদ। তারা দু’জনই ছিলেন কুমিল্লা, তথা একই এলাকার বাসিন্দা।

“মোশতাক আহমেদ শেখ সাহেবের সর্বশেষ কার্যকলাপে সন্তুষ্ট ছিলেন না। মুক্তির উপায় খুঁজছিলেন। অবএব, রশিদ তার সাথে কথাবার্তা বলে সহজেই বুঝতে পারে, প্রয়োজন মুহূর্তে এই বুড়োকে ব্যবহার করা যাবে,” লিখেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হামিদ।

পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় যে, শেখ মুজিবকে উৎখাত ও হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিবেন এবং সব ধরনের রাজনৈতিক চাপ সামাল দিবেন।

শেষমুহূর্তের ‘রেকি’

১৫ই অগাস্ট চূড়ান্ত আঘাত হানার আগের দিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ও এর আশপাশ রেকি বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসেন অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তারা।

শেখ মুজিব হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী সুবেদার গণি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জানান, ১৪ই অগাস্ট বিকেল মেজর ডালিমকে তিনি শেখ মুজিবের বাসভবনের সামনে মোটর সাইকেলে করে ঘোরাফেরা করতে দেখেছিলেন।

এর বাইরে, ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকেও সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় দেখা গিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ।

এছাড়া সেনানিবাসের টেনিসকোর্টেও মেজর ডালিমসহ চাকরিচ্যুত বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাদেরকে দেখা যায় বলে নিজের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হামিদ।

এরপর নিয়মিত মহড়ার নামে অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তারা রাতে ট্যাঙ্ক, অস্ত্র এবং সৈন্য-সামন্তসহ ঢাকা সেনানিবাসে একত্রিত হন। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর ১৫ই অগাস্ট ভোরে তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান।

বত্রিশ নয়, নিরাপত্তা জোরদার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট রাতের শেষভাগে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করতে অভ্যুত্থানকারী সেনারা যখন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে যান, তখন তাদের প্রতিহত করার মতো তেমন জোরদার পাহারার সেখানে ছিল না বলে পরবর্তীতে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে আসে।

বরং সেদিন নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। কারণ ১৫ই অগাস্ট সকালে সেখানে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের। এজন্য যাবতীয় প্রস্তুতিও শেষ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এর মধ্যেই সেখানে বেশ কয়েকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। কারা ওই হামলা চালিয়েছিল সেটি জানা যায়নি। তবে হামলার পর পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর নজরদারী সেখানে আরো বাড়ানো হয়েছিল বলে জানা যায়।

অন্যদিকে, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবন ছিল অনেকটাই অরক্ষিত। যারা সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের কাছে পর্যাপ্ত গোলা-বারুদ মজুদ ছিল না বলেও পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে।

আগেও হামলা হয়েছিল

১৯৭৫ সালে অগাস্টের আগেও শেখ মুজিবের ওপর হামলা হয়েছিল। যদিও বিষয়টি তখন জানাজানি হতে দেয়নি সরকার।

তবে ওই হামলার খবর তখন ওয়াশিংটনকে গোপন তার বার্তায় জানিয়েছিল ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস।

সেখানে বলা হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ২১শে মে বিকেলে শেখ মুজিবের ওপর এক দফা হামলা হয়। মুজিব অক্ষত থাকলেও এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তি আহত হন।

টিভি স্টেশন পরিদর্শন শেষে বাসায় ফেরার সময় তার ওপর ওই হামলাটি চালানো হয়েছিল। তবে সেটির সঙ্গে ঠিক কারা জড়িত, তা মার্কিন তার বার্তায় উল্লেখ করা হয়নি।

তৎকালী রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের নিরাপত্তায় নিয়োজিত একজন পুলিশ কর্মকর্তা মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তাকে হামলার তথ্যটি নিশ্চিত করেন বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে সরকারি সিদ্ধান্তে হামলাটির কথা জনগণকে জানতে দেওয়া হয়নি। তথ্য অধিদপ্তর খবরটি প্রকাশ না করার জন্য পত্রিকাগুলোর কাছে কড়া নির্দেশনা পাঠিয়েছিল বলে মার্কিন গোপন বার্তায় বলা হয়। — বিবিসি বাংলা অবলম্বনে

এই বিভাগ এর আরো খবর

নিরাপদ সীমার নিচে সারের মজুত

রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর