কক্সবাংলা ডটকম(৬ নভেম্বর) :: প্রায় প্রতি বছরই অক্টোবর-নভেম্বরে অস্থির হয়ে ওঠে দেশের পেঁয়াজের বাজার। স্থানীয় উৎপাদনে চাহিদা মেটানো সম্ভব না হওয়ায় এ সময় আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলেই দাম বেড়ে যায় হু হু করে। তবে সে চিত্রে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগোচ্ছে দেশ।
গত পাঁচ বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির উৎপাদন বেড়েছে ৫১ শতাংশের বেশি। বিপরীতে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে আমদানি। উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ায় গত চার বছরের মধ্যে এ সময়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে পেঁয়াজের খুচরা মূল্য।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত জাতের বীজ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ সম্প্রসারণ, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আগ্রহ উৎপাদন বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ায় মৌসুমের বাইরে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখাও সম্ভব হচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানে পড়েছেন বলে কৃষকের অভিযোগ।
এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পেঁয়াজ চাষে তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। তাতে আবারো তৈরি হবে আমদানিনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি। তাই উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কৃষককে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেয়ার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল প্রায় ২৫ লাখ ১৭ হাজার টন। পরের অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টনে। উৎপাদন আরো বেড়ে ২৯ লাখ ১৭ হাজার টন হয় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে।
দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় ৩২ লাখ ২১ হাজার ৪৩১ টন। আর সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে রেকর্ড ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৩০ টন। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে ১৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর পাঁচ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৩ লাখ ২ হাজার ৫৩৩ টন, যা শতাংশের হিসাবে ৫১ দশমিক ৩১।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম মনে করেন, উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে কৃষকের লোকসান কমানো জরুরি। তিনি বলেন, ‘কৃষক যে পণ্যে দাম পান, সেখানেই যান—এটি অর্থনীতির সহজ কথা। গত কয়েক বছরে পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক ভালো ছিল। ফলে কৃষক এ ফসলের উৎপাদনে ঝুঁকেছেন। এতে উৎপাদন বেড়েছে, আমদানির পরিমাণ কমেছে এবং দেশের বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।’
উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে গবেষণা, নতুন ও উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ সম্প্রসারণেরও ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। দাম কম থাকায় এবার কৃষক লোকসান গুনেছেন উল্লেখ করে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তাদের রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের উৎপাদনে টিকিয়ে রাখতে হবে।
তবে আলুর মতো পেঁয়াজের বাজারেও যাতে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়েও থাকতে হবে সতর্ক। চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক তথ্য প্রকাশ করে সে অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে। পেঁয়াজে আমরা সফলতা অর্জন করেছি। অন্যান্য মসলাজাতীয় পণ্যেও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব।’
উৎপাদন বৃদ্ধির বিপরীতে কমেছে পেঁয়াজের আমদানির পরিমাণও। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল ৬ লাখ ২ হাজার ২৯ টন। এর পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫১ হাজার টনে।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি ৬ লাখ ৫ হাজার টনে নামে। চাহিদা পূরণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আনা হয় ৪ লাখ ৭৪ হাজার টনের মতো। সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি নেমে এসেছে মাত্র ৮৬ হাজার ৩৯৮ টনে। আর চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজনই হয়নি, চাহিদা পূরণ হচ্ছে নিজেদের জোগান দিয়েই।
দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বছরে প্রায় ৩০ লাখ টনের মতো পণ্যটির চাহিদা। সংরক্ষণ ও পরিবহনজনিত অপচয় বা পোস্ট হারভেস্ট লস বিবেচনায় নিলে এ চাহিদা দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টনে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে পেঁয়াজের পোস্ট হারভেস্ট লস ২৫ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংগ্রহ-পরবর্তী অপচয় কমানোও দেশের পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চলতি বছর আমদানির প্রয়োজন না হওয়ার পেছনে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর দেশে সংরক্ষিত পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ টনে। সংরক্ষণে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারও বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সংরক্ষণকালীন পচন ও ওজন কমে যাওয়া। প্রচলিত পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত নষ্ট হয়। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও মৌসুমের পরবর্তী সময়ে বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে। এ সমস্যা মোকাবেলায় কৃষক পর্যায়ে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের চার হাজার এয়ার ফ্লো মেশিন দেয়া হয়। আর গত অর্থবছরে প্রথম কিস্তিতে চার হাজার এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে বিতরণ করা হয় ১৫ হাজার মেশিন। এর বাইরে অন্য কর্মসূচির আওতায় দেয়া হয়েছে আরো ৩ হাজার ৭০০টি মেশিন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে ২৭ হাজার ৭০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন। এর মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে প্রায় তিন লাখ টন।
পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ার পেছনে কৃষকের পরিশ্রমের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল নতুন জাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরাও। এ বিষয়ে মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বগুড়ার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘কৃষকের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। আগে সাধারণত শীতকালেই পেঁয়াজ চাষ হতো। এখন গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজেরও আবাদ হচ্ছে। আগে দেশী পেঁয়াজ বলতে ছোট আকারেরই বেশি উৎপাদন হতো। এখন গবেষণার মাধ্যমে বড় আকারের পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এতে ফলন বেড়েছে চার থেকে পাঁচ গুণ।’
বারি-৪ ও বারি-৬ নামে পেঁয়াজের জাত বাজারে এসেছে জানিয়ে এ গবেষক বলেন, ‘এসব জাতের একেকটি পেঁয়াজের ওজন ৪০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। বারি-২, ৩ ও ৪ জাতের পেঁয়াজ সারা বছর চাষ করা যায়। এগুলো দ্রুত উত্তোলনও সম্ভব। ফলে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং আমদানির প্রয়োজনীয়তা কমেছে। আমরা পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছি।’
বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় এর সুফল পাচ্ছেন ভোক্তারাও। রাজধানীর খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, রাজধানীতে গতকাল পণ্যটির খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা। অথচ গত বছরের একই দিনে (৫ নভেম্বর) দাম ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। আর ২০২৪ সালের একই দিনে দেশী পেঁয়াজের দাম চড়েছিল ১৩০ থেকে ১৫০ এবং আমদানীকৃত ৮৫ থেকে ১২০ টাকায়। রাজধানীতে দেশী পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ১২৫ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে পেঁয়াজের তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা এ ফসলের আবাদ বাড়িয়েছেন। এতে উৎপাদন বেড়েছে, কমেছে আমদানির প্রয়োজনীয়তা। অন্যদিকে কম দামে পেঁয়াজ পেয়ে স্বস্তিতে রয়েছেন ভোক্তারাও। তবে বাজারে দীর্ঘদিন দাম কম থাকলে কৃষকরা পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যেতে পারেন। এতে উৎপাদন কমে গিয়ে আবারো আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। ফলে উৎপাদনে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। আমাদের লক্ষ্য শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা নয়, ভবিষ্যতে উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ বিদেশে রফতানির সক্ষমতা অর্জন করাও। এ লক্ষ্য সামনে রেখে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণ ও বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।’ গবেষণা, উন্নত বীজ সরবরাহ, উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার ফ্লো মেশিন সরবরাহসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।












