রবিবার ২৮শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

রবিবার ২৮শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

পদ্মা সেতু : হাসিনা যুগের শ্রেষ্ঠ কীর্তি

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২০
516 ভিউ
পদ্মা সেতু : হাসিনা যুগের শ্রেষ্ঠ কীর্তি

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী (১২ ডিসেম্বর) :: আমরা একটি আলো-অন্ধকারের যুগ অতিক্রম করছি। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বমানবতার যে ভয়াবহ মৃত্যু উপত্যকা এখন পার হচ্ছে তার কোনো নজির অতীতের ইতিহাসে নেই। তবু প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানবতা আবারও জয়ী হতে চলেছে। কভিড-১৯ প্রতিরোধ করার জন্য ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ব্রিটেনে প্রথম দেওয়া শুরু হয়েছে। এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ভালোভাবে প্রমাণিত হলে মানবতা আবার এক আলো ও আশ্বাসের যুগের দ্বারপ্রান্তে পা রাখবে।

এ কথা বাংলাদেশের জন্য সত্য- হাসিনা সরকার কভিড ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তা আনার চেষ্টা করছে। এ জন্য বিশ্ব সংস্থার কাছে আর্থিক সাহায্যেরও আবেদন জানিয়েছেন। এখন এই ভ্যাকসিন আনা এবং তা কোটি কোটি মানুষের দেহে প্রয়োগের ব্যাপারে কোনো দুর্নীতি না হলে আশা করা যায়, বাংলাদেশও আগামী বছরের মধ্যভাগের মধ্যে করোনামুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর বছরের শেষ মাসে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়া বাংলাদেশের জন্য এক দুর্লভ ও ঐতিহাসিক ঘটনা। করোনার যে ভয়াল গ্রাসের অন্ধকারে আমরা কাজ করছি, সেই তিমির রাত্রির শেষে আমরা এই ঘটনায় এক উদয় উষার সুসংবাদ শুনতে পেলাম মনে হয়। এই সেতু শুধু উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের সঙ্গেই প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটাবে না, দেশে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও প্রসার বাড়াবে অভাবনীয়ভাবে। কয়েকশ ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, আর্কিটেক ও ওয়ার্কারের পাঁচ বছরব্যাপী অবিরাম শ্রমের ফল এই সেতু। এ জন্য তাদের কাছেও জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে।

শেখ হাসিনা তার তিন মেয়াদের শাসনকালে একটি ইতিহাস তৈরি করে গেলেন। একটি ‘এরা’ বা যুগ সৃষ্টি করে গেলেন, তাকে ভবিষ্যতের ইতিহাস নাম দেবে ‘হাসিনা এরা’ বা হাসিনা যুগ। তার সরকারের যত ভুলভ্রান্তি থাকুক, দুটি কারণে ইতিহাসে চিরকালের জন্য হাসিনা বেঁচে থাকবেন এবং মানুষ তাকে স্মরণ করবেন। অতীতের মোগল যুগের শাসক শায়েস্তা খানের মতো তিনি হবেন ইতিহাসের কিংবদন্তি। এই দুটি কারণের একটি হলো, ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদান এবং অন্যটি হলো, উত্তাল পদ্মা নদীর বুকে সেতু নির্মাণ। এই দু’কাজেই শেখ হাসিনাকে দেশে এবং দেশের বাইরে যে চ্যলেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে, অনেকেই ভাবতেন তিনি তা পারবেন না।

‘৭১-এর ঘাতক দালাল এবং গণহত্যার সহযোগীরা যেভাবে ৪০ বছর বিচার ও দণ্ড এড়িয়ে চলেছে এবং বিএনপির সহযোগিতায় ক্ষমতাতেও গিয়ে বসেছিল, তাতে কেউ মনে করেননি, তাদের বিচার ও দণ্ড হওয়া সম্ভব। শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশের সব বিরোধিতা অতিক্রম করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ‘৭১-এর ঘাতক, বঙ্গবন্ধুর ঘাতক এরা সবাই তাদের অপরাধ ও জাতিদ্রোহিতার শাস্তি পেয়েছে।

পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণ ছিল শেখ হাসিনার জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ। এই সেতু নির্মাণ ছিল বাংলার মানুষের প্রায় শতাব্দীকালের স্বপ্ন। কিন্তু তার জন্য দরকার ছিল বিশাল অর্থ, কারিগর ও প্রযুক্তিজ্ঞান। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপ্রার্থী হয়। বিশ্বব্যাংকও আর্থিক, কারিগরি সাহায্য দিতে রাজি হয়।

পদ্মা সেতু নির্মিত হবে এই আশায় পদ্মার এপারের-ওপারের মানুষ যখন আনন্দে উদ্বেল, সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক চক্রান্তে তাদের আশার মূলে কুঠারাঘাত হানা হলো। বিশ্বব্যাংক হঠাৎ অভিযোগ তুলল, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রজেক্টে দুর্নীতি হচ্ছে। এই ব্যাপারে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীকেও জড়ানো হলো। বিস্ময়ের কথা, তখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কোনো অর্থ বাংলাদেশের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের হাতে এসে পৌঁছেনি। তার আগেই বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ।

এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এই অভিযোগ তোলার পেছনে রাজনৈতিক চাপ ছিল। শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে এই চাপ মানতে অস্বীকার করেন এবং ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ তার নিজস্ব সম্পদের দ্বারা পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা সত্ত্বেও অনেকের মনে সন্দেহ ছিল। বাংলাদেশের পক্ষে নিজস্ব সম্পদ দ্বারা এই সেতু নির্মাণ অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের কাছে নতজানু হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি তা অগ্রাহ্য করেন এবং নিজস্ব সম্পদে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য পাঁচ বছর আগে কাজ শুরু করেন। তারপর অবশ্য চীন, ভারতসহ আরও কিছু বিদেশি সাহায্য এসেছে। কারিগরি সাহায্যও এসেছে। গত বৃহস্পতিবার (১০ ডিসেম্বর) সর্বশেষ অর্থাৎ ৪১তম স্প্যান বসিয়ে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা হয়েছে। শিগগিরই সেতুটির উদ্বোধন হবে এবং তা সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে আরেকটি বিরাট মাইলফলক। এই প্রথম বিশ্বব্যাংকের ঔদ্ধত্য ও সাহায্য অগ্রাহ্য করে একটি ছোট উন্নয়নশীল দেশ এত বিশাল প্রজেক্টের কাজ শেষ করল। এই সেতু বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটাবে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিচ্ছিন্নতার দরুন ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব ব্যাপারে উত্তরবঙ্গ পিছিয়ে ছিল। মঙ্গা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অসচ্ছলতা লেগেই ছিল। হাসিনা সরকার অবশ্য কৃষি উৎপাদন সাফল্যজনকভাবে বাড়িয়ে মঙ্গা থেকে উত্তরবঙ্গকে অনেক আগেই মুক্ত করেছে। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের উন্নতি ঘটবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ উন্নত হবে।

মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসের যেমন নীল নদের ওপর আসোয়ান বাঁধ নির্মাণ নিয়ে রাজনৈতিক চক্রান্তের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তেমনই চক্রান্তের মুখে পড়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মিসরের নাসেরকে চাপ দেওয়া হয়েছিল- তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অধিক সম্পর্ক রক্ষার নীতি থেকে সরে না এলে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাবেন না। নাসের তা পাননি। তখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এগিয়ে এসে আসোয়ান বাঁধ নির্মাণের যাবতীয় ব্যয় বহন করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পদ্মা সেতুতে প্রতিশ্রুত সাহায্যদানে বিশ্বব্যাংক যখন অস্বীকৃতি জানায়, তখন ইউনিয়নের অস্তিত্ব ছিল না। নিজস্ব সম্পদের ওপর প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে সেতু নির্মাণে হাত দেওয়া এবং পাঁচ বছরে তাতে সফল হওয়া অবশ্যই বাংলাদেশে হাসিনা যুগের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।

শেখ হাসিনা শুধু বিশ্বব্যাংকের চাপ নয়, আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের টেলিফোনে দেওয়া প্রচ্ছন্ন হুমকিও অগ্রাহ্য করার সাহস দেখিয়েছেন এবং দেশের সম্মান রেখেছেন। নোবেলজয়ী ড. ইউনূস ক্লিনটন পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাকে নানা অভিযোগের দরুন গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালকের পদ থেকে সরানো হলে ক্লিনটন দম্পতি অখুশি হন এবং ড. ইউনূসের পক্ষ নিয়ে হাসিনা সরকারকে বিব্রত করেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থসাহায্য বন্ধ হওয়ার পেছনে হিলারি ক্লিনটনের প্রভাব অনেকটা কাজ করেছে বলে অনেকেই মনে করেন।

মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসেরের মতো সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে শেখ হাসিনা সব চাপের মুখে নতজানু না হওয়ার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশকে দুর্ভিক্ষমুক্ত করা, গরিবি মুক্ত করা, সন্ত্রাস দমন, অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি কারণে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও এক দিন ইতিহাসে স্বীকৃতি পেতে পারেন। করোনার মতো বিশ্বত্রাস ভাইরাসের হামলার সময়েও তিনি সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে চলেছেন এবং এই দুর্যোগের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ স্থগিত রাখেননি।

মিসরে আসোয়ান বাঁধ নির্মাণ শেষে বাঁধটির উদ্বোধনকালে প্রেসিডেন্ট নাসের বলেছিলেন, ‘আর কোনো কারণে না হোক, এই বাঁধ নির্মাণ করে মিসরবাসীর দুঃখ নীল নদের বন্যার অভিশাপ স্থায়ীভাবে দূর করার জন্য আমার নাম ইতিহাসে থাকবে।’ এই একই কথা বলতে পারেন পদ্মা সেতু উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর কোনো কারণে না হোক, যেসব কারণে তিনি ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন, তার একটি হলো পদ্মা সেতু।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী : লন্ডন, ১১ ডিসেম্বর, শুক্রবার ২০২০

516 ভিউ

Posted ৩:০০ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২০

coxbangla.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

Editor & Publisher

Chanchal Dash Gupta

Member : coxsbazar press club & coxsbazar journalist union (cbuj)
cell: 01558-310550 or 01736-202922
mail: chanchalcox@gmail.com
Office : coxsbazar press club building(1st floor),shaheed sharanee road,cox’sbazar municipalty
coxsbazar-4700
Bangladesh
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
বাংলাদেশের সকল পত্রিকা সাইট
Bangla Newspaper

ABOUT US :

coxbangla.com is a dedicated 24x7 news website which is published 2010 in coxbazar city. coxbangla is the news plus right and true information. Be informed be truthful are the only right way. Because you have the right. So coxbangla always offiers the latest news coxbazar, national and international news on current offers, politics, economic, entertainment, sports, health, science, defence & technology, space, history, lifestyle, tourism, food etc in Bengali.

design and development by : webnewsdesign.com