বিশেষ প্রতিবেদক :: মায়ানমারের জান্তা সরকারের গণহত্যা ও নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বিভিন্ন সময়ে আশ্রয় নেওয়া ১৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আস্থা রেখেছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কথায়।
তিনি ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে তাদের সঙ্গে ইফতার করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে এ বছর ঈদ উদযাপনের ব্যবস্থা করবেন।
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন তো হয়নি, বরং নতুন করে ৩ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে কক্সবাজারে।
এদিকে ২০২৫ সালের ঈদ পাড় হয়ে গেলেও রোহিঙ্গাদের একজনেরও বাড়ি ফেরা হলো না।
অথচ ড. ইউনূসের সেই প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাস, যা-ই বলা হোক না কেন, ২০১৭ সালের পর থেকে কেউ এতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মনে আশা জাগাননি।
বিশ্বব্যাপী ড. ইউনূসের প্রভাব এবং গ্রহণযোগ্যতার জন্য অনেকে ভেবেছিলেন এবার বুঝি রোহিঙ্গাদের সত্যিকারে প্রত্যাবাসন শুরু হবে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আঞ্চলিক উদ্যোগের মাধ্যমে হয়তো ৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আসতে পারে।
তবে ড. ইউনূসের এই প্রতিশ্রুতি যে শুধু কথার কথা, সেটা বুঝেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। বাস্তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারকে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নিতে দেখা যায়নি।
রোহিঙ্গা নেতারা যারা গত বছর এই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইফতার ও জনসভায় উপস্থিত ছিলেন তাদের মতে, ড. ইউনূস একটা আশা দেখাতে চেয়েছিলেন। আমরা ঠিকই বুঝেছিলাম এটি হওয়ার নয়।
তিনি হয়তো লাখো রোহিঙ্গার সামনে আবেগে বলেছিলেন, সিরিয়াসলি বলেননি।
কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে গত ১৮ মাস রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি ড. ইউনূস সরকারকে।
তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নামে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে রাখাইনে মানবিক করিডর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
করিডর দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাপক সমালোচনার কারণে সেই উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখেনি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে এই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নতুন করে আসা নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন, যা জানুয়ারির তুলনায় ১ হাজার ১২৯ জন বেশি। অর্থাৎ এই সংখ্যক রোহিঙ্গা নতুন করে এক মাসে বাংলাদেশে ঢুকেছে।
ইউএনএইচসিআর আরও জানায়, ২০২৪ সাল থেকে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা এবং নির্যাতনের কারণে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন, যার ফলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই নিরাপত্তা খুঁজে নিচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত এক বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মায়ানমার সরকারের সঙ্গে কার্যকর কোনো আলোচনা হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, মায়ানমার জান্তা সরকারের সঙ্গে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘাত চলছে।
এ অবস্থায় জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মি কেউই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। এ ছাড়া সম্প্রতি দুই দেশেই হয়েছে জাতীয় নির্বাচন। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে বাংলাদেশ ও মায়ানমারে নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ায় আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। ঈদের পর পরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্যোগ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত জটিল হওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আগের চেয়ে আরও অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাই নিশ্চিতভাবে এবারও ক্যাম্পবন্দি ঈদ কাটাবে তারা।
মায়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক মনোযোগের ঘাটতি এবং রাখাইনের নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা–সবকিছু মিলিয়েই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে স্থবির হয়ে আছে।
রোহিঙ্গা নেতা খিন মং জানান, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক কথা বলেছে। কিন্তু ফান্ড ক্রাইসিস নিয়ে কিছু আলাপ হলেও প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো চেষ্টা ছিল না। তিনি মনে করেন, প্রত্যাবাসন এখন সম্ভব হবে না, যত দিন না মায়ানমারে শান্তি ফেরে।
তিনি জানান, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তহবিল সংকটের কারণে ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল মানবিক ইস্যু নয়, বরং একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
তার মতে, রাখাইন অঞ্চলের বাস্তব ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ায় প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হলে কোনো রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চাইবে না।
শরণার্থীবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা রিফিউজি ইন্টারন্যাশনালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর মানবিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ এবং মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মায়ানমারের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা খুবই সীমিত, বরং সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি আছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সমাধান না হলে রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। যার মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩ লাখ । পরিবার রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি। আশ্রিতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক এবং ৪ শতাংশ বয়স্ক রয়েছে। যার মধ্যে ৪৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৫১ শতাংশ নারী। আর প্রতিবছর ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মগ্রহণ করে।
তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৭-৭৮ সালে ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার মিয়ানমারে ফিরে যায়। এরপর ১৯৯১ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন মিয়ানমারে ফিরে যায়। ২০১২ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। তারপর ২০১৭ সালে ৮ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। আর ২০২৪ সাল থেকে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে ৫ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু তার বিপরীতে রোহিঙ্গার সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি।















