কক্সবাংলা ডটকম(১৫ মে) :: বর্তমানে এআই (AI) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চ্যাটজিপিটি, জেমিনির মতো এআই টুল প্রায় সবাই কোনও না কোনও কারণে ব্যবহার করেন। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট বা অফিস অ্যাপের মতো টুলগুলো ই-মেল লেখা, মিটিং সামারি তৈরি, শিডিউল প্ল্যানিং এমনকি কন্টেন্ট তৈরির কাজও করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এগুলো কি সত্যিই আমাদের উৎপাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি বাড়াচ্ছে, নাকি আমাদের ভিন্ন ভাবে ব্যস্ত রাখছে মাত্র?
অনেকের জন্যই এআই সময় বাঁচানোর দারুণ এক উপায়। শিক্ষার্থীরা জটিল রিসার্চ সহজ করতে এটি ব্যবহার করছে, পেশাদাররা একঘেয়ে কাজগুলো অটোমেট করছে এবং ক্রিয়েটররা আগের চেয়ে দ্রুত আইডিয়া জেনারেট করতে পারছে। একটি ই-মেল বা প্রেজে়ন্টেশন আউটলাইন লিখতে যেখানে আগে ৩০ মিনিট লাগত, এখন কয়েক মিনিটেই তার একটি খসড়া তৈরি হয়ে যাচ্ছে।
তবে এর পাশাপাশি ‘অতিনির্ভরতা’-র মতো নতুন একটি সমস্যাও মাথাচাড়া দিয়েছে। মেসেজ লেখা থেকে শুরু করে সাধারণ সমস্যার সমাধান— সব কিছুর জন্য এখন মানুষ এআই-এর ওপর ভরসা করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এবং স্বাধীন ভাবে চিন্তা করার দক্ষতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
আর একটি বাস্তব সমস্যা হলো তথ্যের আধিক্য বা ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’। এআই খুব দ্রুত কন্টেন্ট তৈরি করতে পারলেও তা সব সময়ে নির্ভুল হয় না। ফলে এআই-এর তৈরি করা কাজ চেক করা, এডিট করা বা ভুল সংশোধনের পিছনে মানুষকে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে যে সময়টা বাঁচে, তা পরে ভেরিফিকেশন করতেই শেষ হয়ে যায়।
এ ছাড়া ‘ফেক প্রোডাক্টিভিটি’-র বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। সারাক্ষণ নতুন নতুন এআই টুল টেস্ট করা, ড্রাফট জেনারেট করা বা প্রম্পট ঠিকঠাক করতেই অনেক সময় চলে যায়। এতে মনে হতে পারে যে অনেক কাজ হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে অর্থবহ কাজ খুব একটা এগোয় না।
একটা সময় ছিল, মানুষ রাস্তা চিনত মাথায় রেখে। তারপর জিপিএস এল, মানচিত্র মাথা থেকে সরে গেল পকেটে। সার্চ ইঞ্জিন আসার পর মানুষ তথ্য মুখস্থ রাখা ছেড়ে দিল — শুধু মনে রাখল কোথায় খুঁজতে হবে। এখন এআই এসেছে। আর বিজ্ঞানীরা বলছেন, এবারের পরিবর্তনটা আরও গভীর — শুধু স্মৃতি নয়, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ, এমনকি চিন্তার মূল কাঠামোটাই হয়তো বদলে যাচ্ছে।
যে পরিশ্রম না করলে পেশি কমে
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী অ্যাডাম গ্রিন বিষয়টাকে জিমের উপমায় বোঝান। এআইকে দিয়ে কাজ করানো অনেকটা রোবটকে দিয়ে ভার তোলানোর মতো — ঘাম আপনার হচ্ছে না, ফলে শরীরও তৈরি হচ্ছে না। মস্তিষ্কও তাই। কম ভাবলে, ভাবার সক্ষমতাও কমে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি এআই ব্যবহার করেন তারা সমালোচনামূলক চিন্তার পরীক্ষায় তুলনামূলক পিছিয়ে পড়ছেন। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘কগনিটিভ সারেন্ডার’ — চিন্তার আত্মসমর্পণ।
ঘর্ষণটাই আসল শেখা
মনোবিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে — কগনিটিভ ফ্রিকশন। নিজে অঙ্ক কষা, কঠিন বই ধীরে পড়া, কোনো সমস্যায় আটকে থাকা — এই অস্বস্তিটাই মস্তিষ্ককে শক্তিশালী করে। এআই সেই ঘর্ষণ সরিয়ে দেয়। উত্তর তাৎক্ষণিক মেলে, কিন্তু শেখাটা থাকে না।
ওকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারবারা ওকলে বলেন, কোনো কিছু চোখের সামনে দেখলেই মনে হয় মাথায় গেঁথে গেছে — কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।
তাহলে করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা এআই বর্জনের কথা বলছেন না। বলছেন সচেতনভাবে ব্যবহারের কথা।
এআই জিজ্ঞেস করার আগে নিজে একটু ভাবুন। কিছু শিখতে চাইলে নোট নিন, হাতে লিখুন। লেখা শুরু করার আগে নিজের ভাবনাগুলো আগে কাগজে নামিয়ে রাখুন — তারপর এআই দিয়ে সেটাকে ঝালাই করুন। আর মাঝে মাঝে বিরক্ত হতে দিন নিজেকে — সেই অস্বস্তিই গভীর চিন্তার দরজা খোলে।
মানুষের যা আছে, যন্ত্রের তা নেই
অ্যাডাম গ্রিন বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক এমন সংযোগ তৈরি করতে পারে যা ব্যক্তিগত, অপ্রত্যাশিত এবং সত্যিকার অর্থেই নতুন। কোনো সম্ভাবনানির্ভর যন্ত্র সেটা পুরোপুরি নকল করতে পারে না। আগামী দিনে সেই স্বাতন্ত্র্যই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
গাড়ি আসার পর মানুষ দৌড়ানোর ক্ষমতা হারায়নি — বরং দৌড়ানো হয়ে উঠেছে সচেতন পছন্দ। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতেও নিজে চিন্তা করার তাগিদটুকু ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
এআই ব্যবহার করবেন যে ক্ষেত্রে:
- একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিমূলক (রিপিটিটিভ) কাজে
- প্রথম ড্রাফট তৈরি এবং ব্রেনস্টর্মিং বা আইডিয়া খোঁজার ক্ষেত্রে
- বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ইনফরমেশন গুছিয়ে রাখার জন্য
যে ক্ষেত্রে এআই এড়িয়ে চলবেন:
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে
- সৃজনশীল বা জটিল চিন্তাভাবনার প্রয়োজনে
- গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ফ্যাক্ট যাচাই করার সময়ে
এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট তখনই সবচেয়ে বেশি কার্যকর, যখন একে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকল্প নয় বরং সহায়ক হিসেবে দেখা হয়। এআই-কে দিয়ে সব কাজ করিয়ে নেওয়া আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং এআই-এর সহায়তায় সময় বাঁচিয়ে সেই সময়টুকু আরও গভীর ও অর্থবহ কাজে লাগানোই আসল সার্থকতা।













