বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার পরিবেশগত সংকটাপন্ন সোনাদিয়া দ্বীপে গত চার বছরে অন্তত সাত হাজার একর প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ বন) উজাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে ৮২টি চিংড়িঘের।
বনভূমি দখল করে সেখানে বছরের এক অংশে চিংড়ি চাষ এবং অন্য অংশে লবণ উৎপাদন করা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে বিএনপি, জামায়াত এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ একসময় লাল কাঁকড়া, সামুদ্রিক কাছিম, ডলফিন ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।
পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০৬ সালে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। আইন অনুযায়ী সেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো ধরনের পরিবর্তন বা বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ।
তবে ইকোট্যুরিজম পার্ক নির্মাণের উদ্দেশ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ একরের বেশি বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় আট হাজার একর ছিল প্যারাবন।
২০১৭ সালে জমি বুঝে নেওয়ার পরও সেখানে কোনো দৃশ্যমান প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। সেই সুযোগে প্রভাবশালী একটি চক্র বনভূমি দখল করে চিংড়িঘের ও লবণ মাঠে রূপান্তর করে।
স্থানীয়দের দাবি, বন উজাড়ের সময় বিপুলসংখ্যক বাইন, কেওড়া ও অন্যান্য ম্যানগ্রোভ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কোথাও কোথাও গাছে আগুন দিয়েও বন ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে।
এতে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। একসময় যেখানে শতাধিক প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক, পাখি ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ ছিল, এখন সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেখা যাচ্ছে চিংড়িঘের ও লবণ মাঠ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, লবণ মৌসুম শেষে এসব ঘেরে আবার চিংড়ি চাষের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করতে হয়।
প্রতিবছর হাজার হাজার একর সরকারি বনভূমি ব্যবহার করে চিংড়ি ও লবণ উৎপাদনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার একর জমিতে চিংড়ি চাষ করা হয়। গত মৌসুমে উৎপাদিত চিংড়ি বিক্রি করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় হয়েছে।
অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় তিন হাজার একর জমিতে উৎপাদিত লবণের বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে, যার পুরোটাই সরকারি বনভূমি দখল করে।
পরিবেশবাদীদের মতে, প্যারাবন ধ্বংস হওয়ায় সোনাদিয়া ও মহেশখালীর উপকূলীয় সুরক্ষা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূল রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করত।
বন উজাড়ের ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
এদিকে প্যারাবন দখল ও ধ্বংসের ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগ পৃথকভাবে একাধিক মামলা দায়ের করেছে।
মামলাগুলোতে শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
গত বছরের অক্টোবর মাসে উচ্চ আদালত অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদ ও বন ধ্বংস বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, সোনাদিয়ার প্যারাবন ধ্বংসের ঘটনায় এ পর্যন্ত একাধিক মামলা করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে উপকূলীয় বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিতর্কিত ইজারা বাতিল করে জমি পুনরায় বন বিভাগের অধীনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। জমি বুঝে পাওয়া গেলে নতুন করে প্যারাবন সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা ও একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী দখলদার চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সোনাদিয়ার অনন্য জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশ দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র : আব্দুল কুদ্দুস রানা, প্রথম আলো।













