কক্সবাংলা রিপের্ট :: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি মানবিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তা আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ ও এর অংশীদার সংস্থাগুলো।
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্যাম্পে বসবাসরত প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য এ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতা ও মানবিক সংকট বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই আহ্বান জানানো হয়।
বুধবার ২০মে কক্সবাংলাকে প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
জাতিসংঘ বলছে, ক্রমবর্ধমান সংকটের কারণে জরুরি সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়ছে এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, তা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
মিয়ানমারে নির্যাতন ও সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
চলমান সংঘাতের কারণে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে জনাকীর্ণ ক্যাম্প ও সীমিত মানবিক সম্পদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন খাতে এই তহবিল ব্যয় করা হবে।
এর মধ্যে খাদ্য সহায়তার জন্য ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, বাসস্থানের জন্য ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পানি ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার, শিক্ষার জন্য ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ৫ কোটি ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায়ও বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ডেপুটি হাই কমিশনার Kelly T. Clements বলেন, সীমিত সম্পদের এই সময়ে রোহিঙ্গাদের দক্ষতা ও স্বনির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সুযোগ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত শরণার্থীদের সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পার্টনারশিপ অ্যান্ড ইনোভেশন বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর Rania Dagash-Kamara বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করে বলেন, দাতাদের অব্যাহত সহায়তা রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মানবিক সহায়তা কমে গেলে ক্যাম্পের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
ইউএন উইমেন-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর Nyaradzayi Gumbonzvanda বলেন, নারী ও কিশোরীদের ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন বাড়ছে। জেন্ডার-সংবেদনশীল ও নারীকেন্দ্রিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, মানবিক তহবিল কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের বড় অংশ এখনও ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে ক্যাম্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার পুরোপুরি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে। সীমিত কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগের কারণে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে, রাখাইন রাজ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় দ্রুত প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। হতাশ হয়ে অনেক রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে এ ধরনের নৌপথে দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকায় জাতিসংঘ ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ২০২৬ সালের জেআরপি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এতে অংশ নেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব M. Farhadul Islam, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী Carol Floreসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা।
জাতিসংঘ পুনরায় উল্লেখ করেছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। তবে মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে তারা মনে করছে।














