কক্সবাংলা ডটকম(২০ মে) :: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে দেশে সামগ্রিক ভোগব্যয় কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও সরকারের রাজস্ব আহরণে।
চলতি মূলধনের সংকটে উদ্যোক্তারা ব্যবসার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা কমে গেছে। একই সঙ্গে ধীরগতি দেখা দিয়েছে সরকারের রাজস্ব আয়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আমদানি শুল্ক বাবদ সরকারের রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৭ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কম।
একই সময়ে ভ্যাট থেকে আয় হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় সামান্য কম। আমদানির বিপরীতে ভ্যাট আদায় ৪ শতাংশ কমলেও স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির বিপরীতে ভ্যাট আদায় বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা পরিস্থিতির কারণেই রাজস্ব আহরণে এমন ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের ৬৫ শতাংশের বেশি আসে পরোক্ষ কর থেকে, যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা ব্যয়। বাজারে বিক্রি ও চাহিদা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই কর আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, আমদানি কমে যাওয়া, শিল্পোৎপাদনে ধীরগতি এবং ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি রাজস্ব খাতে পড়ছে। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং কর ব্যবস্থাকে সহজ ও স্বচ্ছ না করলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব হবে না।
ব্যবসায়ী নেতারাও বর্তমান পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)-এর সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদহারে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তার মতে, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে করজাল সম্প্রসারণে সরকারের বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। যদিও আগের প্রান্তিকের তুলনায় এটি কিছুটা বেশি, তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আয় কমেছে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও প্রথম নয় মাসে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে থাকায় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
অর্থ বিভাগের সাবেক সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকার চাইলেই টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মোকাবিলা করতে পারবে না। তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের বাজেট পরিকল্পনার সঙ্গে রাজস্ব, ব্যয় ও ঋণের সামঞ্জস্য নেই, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি), ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ ও রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশের মতো শীর্ষ কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা কমেছে। বিএটিবিসির চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আয় কমেছে প্রায় ৮৭২ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা কমেছে ১০৮ কোটি টাকা।
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় মানুষ ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে এফএমসিজি খাতসহ বড় বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ধীরগতির হয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দিতেও অনীহা দেখাচ্ছে, যা শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে।
সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল না হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।













