কক্সবাংলা ডটকম :: সময়কে আমরা সাধারণত মহাবিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও অপরিবর্তনীয় বিষয়গুলোর একটি বলে মনে করি।
একটি সেকেন্ড, একটি মিনিট কিংবা একটি ঘণ্টা—সবখানেই যেন একইভাবে প্রবাহিত হয়। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দেখিয়েছে, বাস্তবতা এতটা সরল নয়।
মহাকর্ষ ও গতির প্রভাবে সময়ের প্রবাহও পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ সময় কোনো সার্বজনীন ঘড়ি নয়; এটি স্থান ও মহাকর্ষের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই বিস্ময়কর ধারণার ভিত্তি স্থাপন করেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন।
১৯১৫ সালে প্রকাশিত তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ (General Relativity) তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকর্ষ কোনো অদৃশ্য বল নয়; বরং ভর ও শক্তির কারণে স্থান ও সময়ের (Space-Time) জ্যামিতিক বক্রতা।
কোনো ভারী বস্তু তার চারপাশের স্থানকালকে বাঁকিয়ে দেয় এবং সেই বক্রতার মধ্য দিয়েই অন্যান্য বস্তু চলাচল করে।
এই তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী ছিল—প্রবল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে সময় তুলনামূলকভাবে ধীরে প্রবাহিত হবে।
এই ঘটনাকেই বলা হয় মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণ (Gravitational Time Dilation)। সহজভাবে বলতে গেলে, যেখানে মহাকর্ষ বেশি, সেখানে সময়ের গতি ধীর। পৃথিবীতেও এর অস্তিত্ব রয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা একটি অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি এবং পাহাড়ের চূড়ায় থাকা আরেকটি ঘড়ি দীর্ঘ সময় পর তুলনা করলে দেখা যায়, তাদের সময়ে সূক্ষ্ম পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
যদিও এই পার্থক্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অনুভব করা যায় না, বিজ্ঞানীরা তা পরীক্ষাগারে সফলভাবে পরিমাপ করেছেন।
১৯৫৯ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী রবার্ট পাউন্ড ও গ্লেন রেবকা প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে এই প্রভাবের সত্যতা প্রমাণ করেন।
পরে ১৯৭১ সালের বিখ্যাত হ্যাফেলে-কিটিং (Hafele-Keating) পরীক্ষায় পারমাণবিক ঘড়ি বহনকারী বিমান পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার পর দেখা যায়, স্থির অবস্থায় থাকা ঘড়ির তুলনায় সময়ে সামান্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এসব পরীক্ষাই নিশ্চিত করে যে আইনস্টাইনের তত্ত্ব কেবল গাণিতিক সৌন্দর্য নয়, বাস্তবতার সঠিক ব্যাখ্যা।
সময়ের এই ধীরগতির সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ দেখা যায় কৃষ্ণগহ্বরের (Black Hole) আশপাশে। কৃষ্ণগহ্বর এমন এক মহাজাগতিক বস্তু, যার মহাকর্ষ এতটাই শক্তিশালী যে আলো পর্যন্ত তার আকর্ষণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।
এর চারপাশে স্থান ও সময় এতটাই বিকৃত হয়ে যায় যে, দূরের একজন পর্যবেক্ষকের তুলনায় সেখানে সময় অনেক ধীরে অতিক্রান্ত হয়।
তাত্ত্বিকভাবে এমন পরিস্থিতি সম্ভব, যেখানে কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছাকাছি অবস্থানকারী একজন পর্যবেক্ষকের কাছে মাত্র এক ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও পৃথিবীতে কেটে যেতে পারে বহু বছর।
এই ধারণা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় ২০১৪ সালের বিখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক চলচ্চিত্র Interstellar-এর মাধ্যমে, যেখানে একটি গ্রহে এক ঘণ্টা সমান ছিল পৃথিবীর প্রায় সাত বছর।
তবে “এক ঘণ্টা সমান সাত বছর” কোনো সার্বজনীন নিয়ম নয়। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে কৃষ্ণগহ্বরের ভর, ঘূর্ণন (Spin) এবং পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপর।
Interstellar চলচ্চিত্রের বৈজ্ঞানিক পরামর্শক নোবেলজয়ী তাত্ত্বিক পদার্থবিদ কিপ থর্ন এমন একটি কাল্পনিক অতিভারী ও দ্রুত ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বর—গার্গানচুয়া—নির্মাণ করেন, যার ক্ষেত্রে এই সময় প্রসারণ তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হতে পারে।
তবে বাস্তবে এমন পরিবেশে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন।
কৃষ্ণগহ্বরের নিকটবর্তী অঞ্চলে জোয়ারীয় মহাকর্ষীয় বল (Tidal Force) এতটাই প্রবল হতে পারে যে কোনো মহাকাশযান বা জীবন্ত প্রাণীকে দীর্ঘায়িত করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে “স্প্যাগেটিফিকেশন (Spaghettification)” নামে অভিহিত করেন।
যদিও অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রে ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon) তুলনামূলকভাবে বড় হওয়ায় কিছু অঞ্চলে এই বল অপেক্ষাকৃত কম হতে পারে।
মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণ শুধু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এর বাস্তব ব্যবহারও রয়েছে।
বর্তমানে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা জিপিএস (GPS) উপগ্রহগুলোর পারমাণবিক ঘড়িতে প্রতিদিন কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড সময়ের পার্থক্য সৃষ্টি হয়।
কারণ তারা পৃথিবীর তুলনায় দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে অবস্থান করে। যদি এই পার্থক্য আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী সংশোধন না করা হতো, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই জিপিএসের অবস্থান নির্ণয়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ত্রুটি দেখা দিত।
অর্থাৎ আমাদের স্মার্টফোনের সঠিক নেভিগেশনও আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের ওপর নির্ভরশীল।
কৃষ্ণগহ্বরের গবেষণা মহাবিশ্বের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর আশপাশের গ্যাস, ধূলিকণা ও নক্ষত্রের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, যা নক্ষত্রের জন্ম, গ্যালাক্সির বৃদ্ধি এবং শক্তি বণ্টনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক দশকে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (EHT), লাইগো (LIGO) এবং ভার্গো (Virgo)-এর মতো গবেষণা প্রকল্প কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
২০১৯ সালে এম-৮৭ গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম ছবি প্রকাশ এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণ আইনস্টাইনের শতবর্ষ পুরোনো তত্ত্বকে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবুও কৃষ্ণগহ্বর এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যময়। সময়ের প্রকৃতি, তথ্য সংরক্ষণ সমস্যা (Information Paradox) এবং কোয়ান্টাম মাধ্যাকর্ষণের মতো মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশ্বের গবেষকরা নিরন্তর কাজ করে চলেছেন।
অনেকের ধারণা, ভবিষ্যতের একটি পূর্ণাঙ্গ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি তত্ত্বই হয়তো এসব রহস্যের সমাধান দেবে।
সবশেষে বলা যায়, কৃষ্ণগহ্বরের কাছে এক ঘণ্টা আর পৃথিবীতে সাত বছরের ধারণা কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়; এটি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের এক চমকপ্রদ বাস্তব প্রকাশ।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময় কোনো স্থির ও অপরিবর্তনীয় সত্তা নয়; বরং মহাবিশ্বের গতিশীল স্থান-কালেরই একটি অংশ।
আমরা দৈনন্দিন জীবনে সময়কে একরৈখিকভাবে অনুভব করলেও মহাবিশ্বের চরম পরিবেশে সেই সময়ই সম্পূর্ণ ভিন্ন গতিতে প্রবাহিত হতে পারে। আর এ কারণেই, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও আইনস্টাইনের তত্ত্ব মানবসভ্যতার অন্যতম বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হিসেবে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।














