শুক্রবার ৭ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে আতংক

🗓 শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৪১ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৪১ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৭ আগস্ট) :: ব্যাংকে টাকা রাখেন নিরাপদ ভেবে। কিন্তু সেই টাকা যদি ব্যাংকের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিভিন্ন ব্যবসায় চলে যায়, তাহলে আপনার আমানত কতটা নিরাপদ—এই প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৩টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে ব্যাংকের এই বিস্তার বড় হলেও দেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এত ব্যাংক থাকার পরও কেন আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে?

বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশের মালিকানা বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ও শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে যুক্ত। পোশাক, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ, ওষুধসহ নানা খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তারা ব্যাংকের মালিকানা বা পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এখানেই তৈরি হচ্ছে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা।

কারণ একজন ব্যাংকারের প্রধান দায়িত্ব হলো আমানতকারীর অর্থ নিরাপদ রাখা, ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। অন্যদিকে একজন ব্যবসায়ীর স্বাভাবিক লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ করে ঝুঁকি নিয়ে মুনাফা অর্জন করা।

এই দুই ভূমিকা যখন একই গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন ব্যাংকের অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত মাত্রায় যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

অর্থনীতিতে এ ধরনের ঋণকে বলা হয় Related Party Lending—অর্থাৎ ব্যাংকের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের কিংবা ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ দেওয়া।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো খেলাপি ঋণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে, তার একটি বড় অংশ সময়মতো ফেরত আসছে না।

খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে বিভিন্ন দেশের খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান তুলনা করার সময় সংজ্ঞা, হিসাব পদ্ধতি ও ব্যাংকিং কাঠামোর পার্থক্যও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো Capital Adequacy Ratio (CAR)

সহজভাবে বললে, কোনো ব্যাংক বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়ার পর তার কিছু নিজস্ব মূলধন সংরক্ষণ করে রাখে, যাতে ঋণের একটি অংশ আদায় না হলেও ব্যাংক তা সামাল দিতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের কিছু ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক সীমার নিচে নেমে গেছে। ২০২৬ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মূলধন পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—ব্যাংক যদি নিজের মূলধনই ধরে রাখতে না পারে, তাহলে আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালনা পর্ষদে অতিরিক্ত পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার অভিযোগ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা দিয়ে যাত্রা শুরু করে। পরে ১৯৮০-এর দশক থেকে বেসরকারি ব্যাংকের বিকাশ ঘটে। এরপর ধীরে ধীরে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

২০১৩ সালে একসঙ্গে নয়টি নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সমালোচকদের অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, দেশের অর্থনীতিতে এতগুলো নতুন ব্যাংকের আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না।

এরপর ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিবর্তনের মাধ্যমে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ বাড়ানো হয় এবং পরিচালকদের মেয়াদও বৃদ্ধি পায়।

সমালোচকদের মতে, এর ফলে কিছু ব্যাংকে পরিবার ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক সংকটের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে বিভিন্ন বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নাম।

বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া এবং ব্যাংক পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নথিপত্রের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময় এসব বিষয়ে বড় অঙ্কের ঋণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে।

এস আলমের পাশাপাশি বেক্সিমকো, শিকদার, নাসা, ওরিয়নসহ বিভিন্ন বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংকঋণ ও মালিকানার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মূল প্রশ্নটি হলো—একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী যখন কোনো ব্যাংকের ওপর বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তখন সেই ব্যাংকের ঋণ বিতরণে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কতটা?

Related Party Lending-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই।

একজন ব্যবসায়ী নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রথমত, ঋণ মূল্যায়ন দুর্বল হতে পারে।
স্বাধীন কোনো ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে ব্যাংক তার ব্যবসা, সম্পদ, আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ঝুঁকি যাচাই করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই মাত্রার কঠোরতা বজায় না থাকার আশঙ্কা থাকে।

দ্বিতীয়ত, ঋণ পর্যবেক্ষণ দুর্বল হতে পারে।
ঋণ দেওয়ার পর নিয়মিতভাবে ব্যবসার আর্থিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা ব্যাংকের দায়িত্ব। কিন্তু মালিকানাগত সম্পর্ক থাকলে সেই নজরদারি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ আদায়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকের মালিক বা প্রভাবশালী পরিচালকের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলে সেটি আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কতটা কঠোর হতে পারবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।

এর ফল হতে পারে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় এবং শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের ওপর ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই আলোচনা হচ্ছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এ বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

ভারতে ১৯৬৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ১৪টি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়। এর পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং খাতকে সীমিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণের সুযোগ বাড়ানো।

যুক্তরাষ্ট্রেও ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ কার্যক্রমের মধ্যে পৃথকীকরণের নীতি জোরদার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় নানা পরিবর্তন এসেছে।

অর্থাৎ, ব্যাংকিং খাতে মালিকানা, পরিচালনা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা বিশ্বজুড়েই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

প্রথমত, ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় স্বার্থের সংঘাত কমাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ এবং দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকার প্রবণতা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, Related Party Lending-এর ওপর কঠোর নজরদারি করতে হবে। ব্যাংকের মালিক, পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

চতুর্থত, খেলাপি ঋণ আদায়ে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী একীভূতকরণ, পুনর্গঠন কিংবা অকার্যকর ব্যাংক বন্ধের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার, ব্যাংকের প্রয়োজন এবং ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

একজন সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখেন বিশ্বাস করে। তাঁর সঞ্চয়, বেতন, পেনশন কিংবা পরিবারের ভবিষ্যতের টাকা ব্যাংকের কাছে আমানত হিসেবে থাকে।

সেই টাকা কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে চলে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীই।

তাই ব্যাংককে শুধু ব্যবসা হিসেবে দেখলে হবে না। ব্যাংক হলো একটি জনস্বার্থভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার ওপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কোটি মানুষের সঞ্চয়।

বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা কত—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংকগুলো কতটা শক্তিশালী, সুশাসিত ও জবাবদিহিমূলক।

কারণ ৬৩টি ব্যাংক থাকলেই ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী হয় না।

শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠে আমানতকারীর আস্থা, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের ওপর।

সাধারণ মানুষের সেই আস্থা নষ্ট হলে ক্ষতিটা শুধু একটি ব্যাংকের হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর