কক্সবাংলা ডটকম :: বিশ্বকাপ অভিষেকেই রূপকথা লিখেছে কেপ ভের্দে। প্রথম দুই ম্যাচে স্পেন ও উরুগুয়েকে আটকে দিয়ে চমক দিয়েছিল তারা।
মাত্র ছয় লাখ জনসংখ্যার এই দেশ যে বিশ্বকাপে খেলবে সেটা বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল একটা সময়ে।
সব বাধা পেরিয়ে বিশ্বকাপের মূলপর্বে কেপ ভের্দের জায়গা করে নেওয়াই ছিল বড় চমক। এ বার সেই রূপকথার গল্পে জুড়ল নতুন অধ্যায়।
গ্রুপপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপের নকআউটে পৌঁছে ইতিহাস গড়ল কেপ ভের্দে। শনিবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করেও ‘H’ গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় দল হিসেবে রাউন্ড অফ ৩২-তে পৌঁছে গেল ‘ব্লু শার্কস’রা।
তবে নকআউটের এই লড়াইয়ে তাদের সামনে এবার পর্বতসমান চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে। আগামী ৪ জুলাই (শনিবার) যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় শুরু হবে লড়াই।
কী ভাবে বিশ্বকাপের নকআউটে কেপ ভের্দে?
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যেটা কল্পনাও করেননি অনেকেই, সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখাল কেপ ভের্দে। শনিবার গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করল তারা।
প্রথম দুই ম্যাচে স্পেনের বিরুদ্ধে ০-০ এবং উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ২-২ ড্র করেছিল কেপ ভের্দে। অন্য দিকে শনিবার স্পেনের কাছে হেরে যাওয়ায় তিন ম্যাচে দুই পয়েন্টে শেষ করে উরুগুয়ে। তাই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ড্র করেও তিন পয়েন্ট নিয়ে রানার্স আপ হলো কেপ ভের্দে।
ফলে ছিটকে গেল দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরব।
হিউস্টনে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ম্যাচের প্রথমার্ধে সামান্য হলেও এগিয়ে ছিল কেপ ভার্দে। ৩৩ মিনিটে চোট পেয়ে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন সৌদি আরবের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার হাসান আল-তামবাকতি, যা দলের জন্য বড় ধাক্কা হয়। অন্য ম্যাচে স্পেন যখন প্রথমার্ধের শেষদিকে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে এগিয়ে যায়, সেই খবর জানতেই হিউস্টনের গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন কেপ ভের্দের সমর্থকরা।
তবে ম্যাচের প্রথমার্ধে কোনও দলই উল্লেখযোগ্য গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। শেষ ১৫ মিনিটে উত্তেজনা চরমে পৌঁছয়। তবে জয় পেতে মরিয়া সৌদি আরব আক্রমণের ধার বাড়াতে পারেনি। বরং ম্যাচের শেষ ল্যাপে গোল করার সুযোগ কেপ ভের্দেরই বেশি ছিল। তবে গোলশূন্য ড্র করেও এই এক পয়েন্ট যথেষ্ট ছিল কেপ ভের্দের স্বপ্নপূরণের জন্য।
বিশ্বকাপ অভিষেকেই স্বপ্নের দৌড় কেপ ভের্দের
প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াটাই ছিল কেপ ভের্দের জন্য ইতিহাস। কিন্তু শুধু অংশ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেনি তারা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই করে ফুটবলবিশ্বকে চমকে দিয়েছে ‘ব্লু শার্কস’।
প্রথম ম্যাচে স্পেনের বিরুদ্ধে ড্র করে বড় চমক দেয় কেপ ভের্দে। একাধিক সেভ করে নজর কাড়েন গোলকিপার ভোজিনহা। পরের ম্যাচে দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচে ২-২ ড্র করে কেপ ভের্দে। শনিবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধেও গোলশূন্য ড্র করে অপরাজিত থেকেই শেষ ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করল কেপ ভার্দে।
এ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় তারা।

‘যেকোনো কিছুই সম্ভব’
একটি স্মার্টফোনের স্ক্রিনকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একঝাঁক ফুটবলার। রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছেন উরুগুয়ের বিপক্ষে স্পেনের ম্যাচের শেষ মুহূর্তগুলোর দিকে। স্পেনের জয় নিশ্চিত হতেই বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়লেন সবাই।
ঠিক এমনই এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে শুক্রবার হিউস্টনের গ্যালারিতে। মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের সমর্থকরা এদিন গ্যালারিতে নেচে-গেয়ে এবং আনন্দের অশ্রু বিসর্জন দিয়ে জয় উদ্যাপন করেছেন। কারণ, বিশ্ব ফুটবলের বড় বড় পরাশক্তিদের টেক্কা দিয়ে তারা পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ। আগামী ৩ জুলাই মিয়ামিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে আয়তনে ক্ষুদ্র এই দেশটি।
শুক্রবার সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ‘গ্রুপ এইচ’-এর দ্বিতীয় দল হিসেবে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে কেপ ভার্দে। ম্যাচের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির কোচ বুবিস্তা বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপ কেবল ফুটবল অভিজাতদের জন্য নয়, এটি সব জাতির জন্য।’
শিরোপা জয়ের গল্পগুলো সবসময় রোমাঞ্চকর হলেও, কেপ ভার্দের মতো দলগুলোর গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কেবল অংশ নিতে আসা নয়, বরং মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের দক্ষতা আর লড়াকু মানসিকতার যে প্রতিফলন তারা দেখিয়েছে, তা ফুটবল প্রেমীদের মুগ্ধ করেছে।
দলের এই অভাবনীয় সাফল্যে আপ্লুত মিডফিল্ডার ডেরয় দুয়ার্তে। ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতা এই ফুটবলার বলেন, ‘সত্যি বলতে, এটা পাগলামি! আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতাম। এখন ম্যাচসেরা হওয়া আর ইতিহাসের অংশ হওয়া—এমনটা কখনো কল্পনাও করিনি।’
আগামী পর্বে লিওনেল মেসিদের বিপক্ষে কেপ ভার্দের জেতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে পারে, কিন্তু তারা ইতিমধ্যে এমন এক ইতিহাস লিখে ফেলেছে যা দীর্ঘকাল স্মরণে থাকবে।
দুয়ার্তে বলেন, ‘প্রথমে আমাদের উদ্যাপন করতে দিন। আমরা খুবই খুশি। আশা করি সব কেপ ভার্দিয়ানরাও খুশি। আগামীকাল থেকে আমরা পরবর্তী ম্যাচ নিয়ে ভাবব।’
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে তার সাহসী উচ্চারণ, ‘আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলা, তাই না? কঠিন ম্যাচ, তবে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। সবকিছুই সম্ভব।’
টানা তিনটি ড্র নিয়ে নকআউট পর্বে পা রেখেছে কেপ ভার্দে। বিশেষ করে আসরের প্রথম ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে তাদের দুর্দান্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সেই নৈপুণ্যের কারণেই আজ ফুটবল বিশ্বে কেপ ভার্দের নতুন অনেক ভক্ত তৈরি হয়েছে। যার প্রমাণ মিলল শুক্রবার হিউস্টন স্টেডিয়ামে, যেখানে হাজারো সমর্থক কেপ ভার্দের জার্সি পরে গ্যালারি মাতিয়ে রেখেছিলেন।















