কক্সবাংলা ডটকম :: বজ্রপাত আর প্রবল বৃষ্টির কারণে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন ম্যাচ শুরু হয়নি, তখন অ্যাজ়টেকা স্টেডিয়ামের (Estadio Azteca) গ্যালারিতে উত্তেজনা আরও জমাট বাঁধছিল।
শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে মাঠে গড়ায় খেলা, আর তার পর যেন ঝড় তুলল মেক্সিকো (Mexico)। দুর্দান্ত প্রথমার্ধের সৌজন্যে ইকুয়েডরকে (Ecuador) ২-০ গোলে হারিয়ে ১৯৮৬ সালের পর প্রথম বার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল এল ত্রি (El Tri)।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে মেক্সিকো। প্রথম ২০ মিনিটেই ইকুয়েডরের রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে তারা। যদিও জন ইয়েবোয়া (John Yeboah) একবার পোস্টে বল মেরে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, তবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আয়োজক দলের হাতেই।
কিনিওনেসের গোলেই পথচলা শুরু
ম্যাচের ২২ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। দ্রুতগতিতে আক্রমণে উঠে ইকুয়েডরের ডিফেন্ডারদের পেছনে ফেলে বল পেয়ে যান হুলিয়ান কিনিওনেস (Julian Quinones)। বক্সে ঢুকে ডান পায়ের শক্তিশালী শটে বল জালে জড়ান তিনি। গোল হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে অ্যাজ়টেকা।
প্রথম গোলের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে মেক্সিকো। মাঝমাঠে ১৭ বছরের গিলবার্তো মোরার (Gilberto Mora) অসাধারণ নৈপুণ্য ইকুয়েডরের ফুটবলারদের বারবার সমস্যায় ফেলছিল। তাঁর সৃজনশীলতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মেক্সিকোর আক্রমণকে আরও ধারালো করে তোলে।
জিমেনেজ়ের আঘাতে ম্যাচের ফয়সালা
৩১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে মেক্সিকো। ইকুয়েডরের রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুলিয়ান কিনিওনেসের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়ায় বল পান রাউল জিমেনেজ় (Raul Jimenez)। এর পর সময় নষ্ট না করে জোরালো শটে গোল করেন অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকার। মাত্র নয় মিনিটের ব্যবধানে করা দুই গোলেই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেছিল ইকুয়েডর। বলের দখলও কিছুটা বাড়িয়েছিল তারা। কিন্তু মেক্সিকোর সুসংগঠিত রক্ষণ তাদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। উল্টে পাল্টা আক্রমণে আরও কয়েক বার ব্যবধান বাড়ানোর কাছাকাছি পৌঁছে যায় তারা।
শেষ ১৬-র পথে আত্মবিশ্বাসী মেক্সিকো
ম্যাচের শেষ দিকে সিজার মন্তেস (Cesar Montes) হেডে গোলের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। অন্যদিকে বদলি হিসেবে নামা কেভিন রদ্রিগেজ় (Kevin Rodriguez) ইকুয়েডরের হয়ে একটি ভালো সুযোগ নষ্ট করেন। দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমে পিয়েরো ইনকাপিয়ে (Piero Hincapie) লালকার্ড দেখলে ইকুয়েডরের শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় উৎসব। চার দশকের নকআউট-অভিশাপ ভেঙে দাপুটে জয় তুলে নেয় মেক্সিকো। বৃষ্টিতে দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় মেক্সিকান ফুটবলের এক স্মরণীয় উৎসবে।
মাঠের উৎসব মিলিয়ে গেল মৃত্যুশোকে, মেক্সিকোর স্বপ্নপূরণের রাতেই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) শেষ ৩২-এর ম্যাচে ইকুয়েডরকে (Ecuador) ২-০ গোলে হারিয়ে ইতিহাসের এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে মেক্সিকো (Mexico)। ঘরের মাঠে এই জয়ের পর মুহূর্তেই যেন উচ্ছ্বাসে বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে গোটা শহর— হাজার হাজার সমর্থকের উল্লাসে কেঁপে ওঠে মেক্সিকো সিটির (Mexico City) রাজপথ। কিন্তু সেই বিজয়ের আনন্দই হঠাৎ বদলে যায় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। অতিরিক্ত ভিড় ও প্রবল জনচাপের মধ্যে শ্বাসরোধ হয়ে প্রাণ হারান দুই সমর্থক— উৎসবের ভিড়েই নেমে আসে গভীর শোকের নীরবতা।
উল্লাসের ঢেউয়ে হঠাৎ নেমে আসে শোক
মেক্সিকো সিটির (Mexico City) অ্যাঞ্জেল অফ ইনডিপেনডেন্স (Angel of Independence) স্মৃতিস্তম্ভের কাছে হামবুর্গো ও ল্যাঙ্কাস্টার সড়কের মোড়ে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বিশ্বকাপে দলের ঐতিহাসিক জয় উদ্যাপন করতে সেখানে হাজার হাজার সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন। ক্রমশ বাড়তে থাকা ভিড়ের মধ্যে মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মেক্সিকো সিটির স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুই সমর্থককে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ৪৪ বছর বয়সি এক পুরুষ এবং ১৯ বছর বয়সি এক তরুণীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে শ্বাসরোধ হয়েই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
চার দশকের ইতিহাস ভাঙল মেক্সিকো
অন্যদিকে মাঠে এই জয় ছিল ইতিহাসের অংশ। ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে জায়গা করে নিয়েছে আয়োজক দেশ মেক্সিকো। দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল তারা, শেষ বার এমন সাফল্য এসেছিল ১৯৮৬ সালে। এর আগে টানা আটটি বিশ্বকাপ নকআউট ম্যাচে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল মেক্সিকোকে। সেই দীর্ঘ হতাশার অধ্যায় শেষ করল হাভিয়ের আগিরের (Javier Aguirre) দল।
প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে ম্যাচ শুরু হতে এক ঘণ্টা দেরি হলেও, মাঠে নেমেই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতে থাকে মেক্সিকো। প্রথমার্ধেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ভুল কাজে লাগিয়ে গোল করেন হুলিয়ান কিনিয়োনেস (Julian Quinones)। এর পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রাউল জিমেনেজ় (Raul Jimenez), ফলে বিরতির আগেই ম্যাচের দেওয়াল লিখন ঠিক হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধে ইকুয়েডর বল দখলে এগিয়ে থাকলেও মেক্সিকোর সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। উল্টে যোগ করা সময়ে পিয়েরো হিনকাপিয়ে (Piero Hincapie) লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, যা আরও কঠিন করে তোলে তাদের লড়াই।
নতুন ইতিহাসে মোরা ও জিমেনেজ়ের নাম
এই ম্যাচে আলো ছিনিয়ে নেন তরুণ গিলবার্তো মোরা (Gilberto Mora)। মাত্র ১৭ বছর ২৫৯ দিন বয়সে তিনি বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে প্রথম একাদশে নামা দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন, যেখানে প্রথম স্থানে আছেন কিংবদন্তি পেলে (Pele)।
অন্যদিকে অভিজ্ঞ রাউল জিমেনেজ়ও লিখেছেন নতুন ইতিহাস। ৩৫ বছর ৫৬ দিন বয়সে তিনি বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক মেক্সিকান ফুটবলার হয়ে ওঠেন। পাশাপাশি ৩০-এর বেশি বয়সে নকআউট ম্যাচে গোল করা প্রথম মেক্সিকান হিসেবে নিজের নাম স্থায়ী করেন রেকর্ড বইয়ে।
টানা চারটি জয় এবং একটিও গোল না খাওয়ার দাপুটে রেকর্ড নিয়ে শেষ ১৬-র দিকে পা রেখেছে মেক্সিকো। পরবর্তী রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড (England) এবং ডিআর কঙ্গোর (DR Congo) ম্যাচের বিজয়ী। তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দের মাঝেও দুই সমর্থকের মৃত্যু পুরো দেশের উৎসবের আবহে গভীর শোকের ছায়া ফেলে দিয়েছে।














