কক্সবাংলা ডটকম :: সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির সম্ভাবনা ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার প্রচেষ্টায় বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
১লা জুলাই এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হংকং ভিত্তিক South China Morning Post।
প্রতিবেদনটির হেড লাইন ছিল India’s arms sector eyes pivotal breakthrough with UAE: ‘confidence booster’ কক্সবাংলায় এর অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো।
South China Morning Post জানায় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক নিরাপত্তা বাজারে ভারত একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
গত ২২ জুন প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচনায় ভারতের স্বয়ংক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ‘আকাশতীর’ (Akashteer) বিক্রির সম্ভাবনাও রয়েছে।
এখনও কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি এবং আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইউএইর পক্ষ থেকে কোনো অর্ডার এলে তা ভারতের জন্য প্রতীকী ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কারণ, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ থেকে ধীরে ধীরে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারকে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে।
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মোস একটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা স্থল, সমুদ্র কিংবা আকাশ—সব প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায় এবং এটি সর্বোচ্চ ম্যাক-৩ গতিতে উড়তে সক্ষম।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ.বি. শিবানে বলেন, “ভারতের জন্য এটি বড় ধরনের আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করবে।
এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র ক্রেতা দেশ থেকে ক্রমবর্ধমান অস্ত্র রপ্তানিকারকে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে, উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে এবং বিশ্বকে দেখাবে যে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও কেনার উপযোগী।”

শিবানের মতে, ইউএই কেবল ব্রহ্মোস নয়, বরং আকাশ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, পিনাকা রকেট ব্যবস্থা, নির্ভুল লক্ষ্যভেদী গোলাবারুদ এবং নৌ বা উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য ড্রোনসহ আরও বিভিন্ন ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে আগ্রহী।
আশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র, যিনি আগে কাতারে কর্মরত ছিলেন, বলেন—এ ধরনের চুক্তি হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও ভারতীয় অস্ত্র কেনার বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে।
তিনি বলেন, “ইউএই অত্যন্ত উন্নতমানের প্রতিরক্ষা ক্রেতা, যাদের কাছে বর্তমানে বিশ্বের সেরা মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ব্রহ্মোস কেনার সিদ্ধান্ত ভারতের অস্ত্রকে বিশ্বের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি দেবে।”
ভারত ও ইউএইর মধ্যে ইতোমধ্যেই যৌথ সামরিক মহড়া, সাইবার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানসহ বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে।
শিবানে বলেন, “যৌথ উৎপাদনেরও সুযোগ রয়েছে।” তাঁর মতে, বৃহত্তর চুক্তি হলে ইউএই আরও বৈচিত্র্যময় সরবরাহকারী পাবে, ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধে সক্ষমতা বাড়বে এবং কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও বলেন, “ভারত ইতোমধ্যেই অন্যান্য বাজার থেকে আর্টিলারি ও গোলাবারুদের চাহিদা দেখেছে। তাই উপসাগরীয় অঞ্চলেও একই ধরনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।”
সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল ইউএইসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ।
দুবাই ও আবুধাবির অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব হয়।
শিবানের মতে, ইউএইর সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিরক্ষা বাজারকে আরও বহুমুখী করে তুলতে পারে এবং একই সঙ্গে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট, লিংক ওয়েস্ট’ কৌশল বাস্তবায়নে সহায়তা করবে, যার লক্ষ্য ভারত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার সঞ্জয় আইয়ার বলেন, ইউএইর সঙ্গে বর্তমান আলোচনা আগের যেকোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির তুলনায় “অনেক বড় এবং কৌশলগতভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ”।
তিনি বলেন, “এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে—ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর আবুধাবি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত শক্তিশালী করতে চাইছে।”

আইয়ারের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও বর্তমান অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, “আবুধাবি আর ভবিষ্যতের আকাশ প্রতিরক্ষা উন্নয়নের জন্য পুরোপুরি ওয়াশিংটন বা প্যারিসের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের দাম প্রতিযোগিতামূলক এবং এগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক শর্তও তুলনামূলকভাবে কম।”
তিনি আরও বলেন, ইউএইর সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি সৌদি আরব-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির একটি নীরব ভারসাম্য রক্ষাকারী পদক্ষেপ হিসেবেও কাজ করতে পারে, যা দিল্লি উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিল।
গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে বলা হয়েছে—এক দেশের ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
আইয়ারের মতে, ইউএইর সঙ্গে ভারতের আলোচনা আসলে আরও বৃহৎ অস্ত্র রপ্তানি পরিকল্পনার অংশ, যার বাজার তিনটি অঞ্চলে বিস্তৃত—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আর্মেনিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ও ভারত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহসহ বৃহত্তর ‘গ্লোবাল সাউথ’।
২০২৪ সালে ভারত ফিলিপাইনের কাছে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। এছাড়া ভিয়েতনামও আনুমানিক ৬২ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম অল ইন্ডিয়া রেডিওর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৪১১ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, সম্ভাব্য অস্ত্র ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও উচ্চমান—এই দুইয়ের সমন্বয় নিশ্চিত করা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তিনি বলেন, “ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান বা বড় নৌযান নির্মাণে মার্কিন ও ইউরোপীয় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ভারতের জন্য কঠিন হলেও মধ্যম মূল্যের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ অনেক বেশি।”
তিনি আরও বলেন, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করাও অস্ত্রের গুণগত মানের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
চন্দ্রের ভাষায়, “মূলত এটি একটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা বাজার, যেখানে ভারত প্রবেশ করতে চায়। আর উপসাগরীয় অঞ্চল ও আসিয়ান দেশগুলো ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২০১৪ সালে চালু হওয়া ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিকেও আরও গতিশীল করবে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দেশীয় গবেষণা, উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়িয়ে আমদানির ওপর ভারতের নির্ভরতা কমানো।
চন্দ্র বলেন, “এই অস্ত্র বিক্রিগুলো ভারতকে ধীরে ধীরে নিরাপত্তা সেবার ভোক্তা দেশ থেকে নিরাপত্তা সরবরাহকারী দেশে রূপান্তরিত করবে।”















