কক্সবাংলা রিপোর্ট :: কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে দ্রুত ও নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ বাড়াতে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেই নিহিত এবং সেখানে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে বৈশ্বিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁর লিখিত উত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭-৭৮ সালে প্রথম দফায় প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার জন পরবর্তীতে মিয়ানমারে ফিরে যায়। ১৯৯১-৯২ সালে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যাদের মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জনকে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়। এরপর ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক অভিযান ও নির্যাতনের মুখে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
বর্তমানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১৮ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। মোট পরিবার রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি। আশ্রিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪ শতাংশ প্রবীণ। এছাড়া ৪৯ শতাংশ পুরুষ ও ৫১ শতাংশ নারী। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করছে, ফলে জনসংখ্যার চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতি হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ হলেও রোহিঙ্গার সংখ্যা তার প্রায় দ্বিগুণ। ফলে পরিবেশ, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এরই মধ্যে প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য শনাক্ত করেছে মিয়ানমার। সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন কার্যক্রমকে সামনে রেখে ট্রানজিট সেন্টার প্রস্তুতের কাজও এগিয়ে চলছে। নতুন করে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ট্রানজিট সেন্টার শিগগিরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া টেকনাফ ও ঘুমধুমে আগে থেকেই দুটি ট্রানজিট সেন্টার প্রস্তুত রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনে সম্মত রোহিঙ্গাদের তালিকা হালনাগাদ করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং টেকসই পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিলেও মিয়ানমারের অনীহা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও কার্যকরভাবে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট হিসেবে রোহিঙ্গা সমস্যা এখনও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।














