কক্সবাংলা ডটকম :: বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। আমানতকারীরা বিশ্বাস করেন, ব্যাংকে রাখা অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং প্রয়োজনমতো তা ফেরত পাওয়া যাবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে সেই আস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এর ফলে কমছে আমানত, হ্রাস পাচ্ছে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ, আর বাড়ছে খেলাপি ঋণের বোঝা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চার বছর আগে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের প্রায় ২৭ শতাংশ ছিল ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশে।
একই সময়ে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা থেকে কমে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আশির দশকে ইসলামী ব্যাংকিং চালুর পর এই প্রথম আমানত প্রবাহে স্থবিরতা ও পতনের প্রবণতা দেখা গেল।
রেমিট্যান্স সংগ্রহেও বড় ধাক্কা লেগেছে। ২০২৩ সালে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫৫ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের মাধ্যমে এলেও বর্তমানে এ হার কমে প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমেও সংকোচন দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতা এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ধর্মপ্রাণ গ্রাহক সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যেতে অনাগ্রহী হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপদ শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের বিকল্প খুঁজছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকবিমুখতা বাড়লে তা দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনো রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ২৭৩ দিন মেয়াদি ইজারা সুকুক বন্ডের নিলাম আয়োজন করলে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়ে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আগ্রহ ও আস্থারই প্রতিফলন।
সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি দেশের মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু কয়েকটি ব্যাংকের দুরবস্থা ও অনিয়মের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় গ্রাহকদের একটি বড় অংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হলো বেনামি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অনিয়ন্ত্রিত ঋণগ্রহণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নিরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তীব্র হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৭০০টি শাখা রয়েছে। এছাড়া প্রচলিত ধারার ১৭টি ব্যাংক ৪৯টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এবং ২১টি ব্যাংক ৯৭৬টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক সেবা দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং ও ইসলামিক ফাইন্যান্স খাত এখনো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে বৈশ্বিক ইসলামিক ফাইন্যান্স সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২৮ সালের মধ্যে ৭ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। মুসলিমপ্রধান দেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, চীন, হংকংসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তির দেশেও ইসলামিক ফাইন্যান্স পণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।














