শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেয়ার কারসাজি কী, কীভাবে কাজ করে এই চক্র? কেন ক্ষতিগ্রস্ত হন বিনিয়োগকারীরা

🗓 বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

👁️ ১৩০ বার দেখা হয়েছে

🗓 বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

👁️ ১৩০ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৯ জুলাই) :: পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এখানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য স্বাভাবিকভাবে নির্ধারিত হওয়ার কথা বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে।

কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থা, মুনাফা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, লভ্যাংশ ঘোষণা কিংবা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শেয়ারের দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

কিন্তু যখন ব্যক্তি বা কোনো সংঘবদ্ধ চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য, গুজব, কৃত্রিম লেনদেন অথবা গোপন তথ্যের অপব্যবহার করে বাজারের স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তখন তাকে বলা হয় ‘শেয়ার কারসাজি’ বা ‘মার্কেট ম্যানিপুলেশন’।

এ ক্ষেত্রে বাজারে যে মূল্য দেখা যায়, তা প্রকৃত ব্যবসায়িক বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা একটি মূল্য।

এই কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যপতনের সুযোগ নিয়ে কারসাজিকারীরা বিপুল মুনাফা অর্জন করে, আর শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

কেন উদ্বেগের বিষয়?

বিশ্বের প্রায় সব পুঁজিবাজারেই কোনো না কোনো সময় কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। তবে উন্নত বাজারগুলোতে কঠোর নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণে এসব অনিয়ম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও অতীতে একাধিকবার শেয়ার কারসাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে ১৯৯৬ এবং ২০১০-১১ সালের বাজার ধসের পর গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর নানা কৌশলের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

কীভাবে কাজ করে কারসাজির চক্র?

বাজার-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কারসাজি চক্র সাধারণত কয়েকটি ধাপে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

প্রথম ধাপে তারা এমন একটি কোম্পানি বেছে নেয়, যার বাজার মূলধন কম, অবাধে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা সীমিত অথবা কোম্পানিটির মৌলভিত্তি দুর্বল। এরপর ধীরে ধীরে কম দামে বিপুল পরিমাণ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

পরবর্তী ধাপে শুরু হয় কৃত্রিম চাহিদা তৈরির খেলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক গ্রুপ, ইউটিউব চ্যানেল, অনলাইন ফোরাম, মেসেজিং অ্যাপ কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানা গুঞ্জন।

কখনও বলা হয় কোম্পানিতে বড় বিনিয়োগ আসছে, কখনও নতুন প্রকল্প, উচ্চ লভ্যাংশ, বিদেশি অংশীদারিত্ব কিংবা ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের খবর ছড়ানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব তথ্যের কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না।

গুজবে প্রভাবিত হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে শুরু করলে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। দাম যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন কারসাজি চক্র নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে বিপুল মুনাফা নিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর কৃত্রিম চাহিদা শেষ হয়ে গেলে শেয়ারের দাম দ্রুত পড়ে যায় এবং ক্ষতির ভার বহন করতে হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

সবচেয়ে পরিচিত কৌশল ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’

বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত কারসাজির কৌশল হলো ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে ওই শেয়ার নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটি কেনার জন্য উৎসাহিত হন।

যখন দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং বাজারে নতুন ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন কারসাজিকারীরা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যায়। পরে বিক্রির চাপ বাড়লে শেয়ারের দাম ধসে পড়ে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অতীতের অনেক আলোচিত ঘটনার সঙ্গে এই কৌশলের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

ওয়াশ ট্রেডিং: নিজেরাই কেনেন, নিজেরাই বিক্রি করেন

কারসাজির আরেকটি পরিচিত পদ্ধতি হলো ‘ওয়াশ ট্রেডিং’ বা ‘সার্কুলার ট্রেডিং’।

এ ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কোনো মালিকানা পরিবর্তন হয় না। একই ব্যক্তি বা একই সিন্ডিকেটের সদস্যরা একাধিক বিও হিসাব ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যেই একই শেয়ার বারবার কেনাবেচা করেন।

ফলে বাজারে লেনদেনের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, শেয়ারটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই ভুয়া চাহিদা দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার কেনা শুরু করেন।

কিন্তু বাস্তবে বাজারে যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তার বড় অংশই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা।

ইনসাইডার ট্রেডিং: গোপন তথ্য দিয়ে মুনাফা

শেয়ারবাজারে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মগুলোর একটি হলো ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’।

কোম্পানির পরিচালক, উদ্যোক্তা, কর্মকর্তা, অডিটর বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনেক সময় মূল্য সংবেদনশীল তথ্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগে জানতে পারেন। যেমন—বড় লভ্যাংশ ঘোষণা, নতুন বিনিয়োগ, একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ, বড় চুক্তি, লোকসান বা উৎপাদন সম্প্রসারণ সংক্রান্ত তথ্য।

যদি এসব তথ্য প্রকাশের আগেই তারা নিজেরা বা তাদের ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা করেন, তাহলে তা ইনসাইডার ট্রেডিং হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাজারের স্বচ্ছতা নষ্ট করে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।

ভুয়া অর্ডারের ফাঁদ: স্পুফিং ও লেয়ারিং

আধুনিক পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর কারসাজির অন্যতম কৌশল হলো ‘স্পুফিং’ এবং ‘লায়ারিং’।

এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের শেয়ার কেনা বা বিক্রির ভুয়া অর্ডার দেওয়া হয়, যাতে অন্য বিনিয়োগকারীরা মনে করেন বাজারে বড় ধরনের চাহিদা বা বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।

বাজারে কাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওই ভুয়া অর্ডার বাতিল করে দেওয়া হয়। ফলে বাজারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হন।

কেন টার্গেট হয় দুর্বল কোম্পানি?

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কারসাজিকারীরা সাধারণত শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানির পরিবর্তে দুর্বল বা লোকসানি কোম্পানিকেই বেশি টার্গেট করে।

বিশেষ করে জেড ক্যাটাগরির কোম্পানি, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠান, ধারাবাহিক লোকসান করা কোম্পানি কিংবা স্বল্প মূলধনি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার তুলনামূলক সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কারণ এসব কোম্পানির বাজারে অবাধে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা কম থাকে। ফলে তুলনামূলক কম অর্থ দিয়েই একটি চক্র বাজারে কৃত্রিম সংকট বা চাহিদা তৈরি করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দীর্ঘদিনের লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও বাজারে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়িক অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যে এসব শেয়ারের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঘটনা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে।

কারসাজির কিছু সাধারণ লক্ষণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বিষয় দেখলেই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হওয়া উচিত—

  • কোম্পানির মৌলভিত্তিতে পরিবর্তন ছাড়াই হঠাৎ শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়া।
  • স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়া।
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত প্রচারণা।
  • কোম্পানির পক্ষ থেকে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকা সত্ত্বেও শেয়ারের দর বাড়া।
  • দীর্ঘদিন লোকসানি বা উৎপাদন বন্ধ কোম্পানির শেয়ারে হঠাৎ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া।
  • একই ধরনের গুজব একযোগে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা

পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) নিয়মিতভাবে লেনদেন পর্যবেক্ষণ করে থাকে।

অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা লেনদেনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া, তদন্ত পরিচালনা, জরিমানা আরোপ, লেনদেন স্থগিত কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর।

তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, কারসাজি প্রতিরোধে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো কৌশল, নতুন রূপ

বিশেষজ্ঞদের মতে, শেয়ার কারসাজির ধরন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও মূল কৌশল একই রয়ে গেছে।

আগে গুজব ছড়ানো হতো মুখে মুখে কিংবা সীমিত পরিসরে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গ্রুপ, ইউটিউব চ্যানেল এবং মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তেই হাজারো বিনিয়োগকারীর কাছে তথ্য—বা অপতথ্য—পৌঁছে যায়।

কখনও দাম আগে বাড়ে, পরে কোম্পানি কোনো ইতিবাচক তথ্য প্রকাশ করে। আবার কখনও তথ্য প্রকাশের আগেই একটি নির্দিষ্ট চক্র সেই তথ্যের সুবিধা নিয়ে অবস্থান তৈরি করে ফেলে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই তথ্য ও সময়—উভয় ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকেন।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, শেয়ারবাজারে দ্রুত লাভের প্রলোভন যতদিন থাকবে, ততদিন কারসাজির ঝুঁকিও থাকবে। তাই বিনিয়োগের আগে গুজব নয়, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, লভ্যাংশ ইতিহাস এবং মৌলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

এই বিভাগ এর আরো খবর

আইনজীবী সহকারী পরিষদ, উখিয়া’র আত্মপ্রকাশ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর