শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার্থীর সংখ্যায় শীর্ষে, তবু আন্তর্জাতিক মানে পিছিয়ে

🗓 শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৮৬ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৮৬ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১ আগস্ট) :: দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও আন্তর্জাতিক একাডেমিক মানদণ্ডে এখনো উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কিউএস (QS) প্রকাশিত ২০২৬ সালের বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের ৫৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেলেও কলা ও মানবিক বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় জায়গা পায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯ লাখ ৮ হাজার ৮৩৯ জন বা মোট শিক্ষার্থীর ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশ কলা ও মানবিক অনুষদভুক্ত বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ ধারা স্পষ্ট। মোট ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩৯ হাজার ২১৫ জন (১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ) কলা ও মানবিক বিষয়ে অধ্যয়নরত।

দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) মোট ২৭টি বিভাগের মধ্যে বাংলা বিভাগসহ কয়েকটি মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ভর্তি আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সামাজিক বিজ্ঞানভুক্ত বিষয়গুলোর জন্য বরাদ্দ রয়েছে। দেশের অন্যান্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই প্রবণতা দেখা যায়।

তবে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি উচ্চশিক্ষা খাতের গবেষণা ও একাডেমিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

কিউএস র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে একাডেমিক সুনাম, নিয়োগকর্তাদের মূল্যায়ন, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি (সাইটেশন), আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করা হয়। ২০২৬ সালের কলা ও মানবিক বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে এশিয়ার ১৩১টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে চীনের ২৬টি, জাপানের ১৪টি, মালয়েশিয়ার ১০টি, হংকংয়ের ৮টি, ভারতের ৫টি এবং সিঙ্গাপুরের ২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, আর এশিয়ার মধ্যে সেরা অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর।

শিক্ষাবিদদের মতে, গবেষণায় বিনিয়োগের ঘাটতি, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার সীমাবদ্ধতা, গবেষণাবান্ধব পরিবেশের অভাব, পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নে ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে সীমিত সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের কলা ও মানবিক শিক্ষাকে পিছিয়ে রাখছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ অপ্রতুল এবং যে বরাদ্দ রয়েছে তার বড় অংশই বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় ব্যয় হয়। তিনি বলেন, কলা অনুষদে গবেষণা হলেও মানসম্মত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রকাশনার সংখ্যা তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার ক্ষেত্রেও অনেক মানবিক বিষয় পিছিয়ে রয়েছে।

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, কলা ও মানবিক বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বড় অংশ বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৮৯ শতাংশ, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এ অনুষদভুক্ত।

অন্যদিকে দেশের শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কলা অনুষদের শিক্ষার্থী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২২ শতাংশ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী কলা অনুষদে অধ্যয়ন করছেন।

তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা ও দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল ও বিজ্ঞানসহ কয়েকটি বিষয়ে কিউএস র‍্যাংকিংয়ে স্থান পেলেও কলা ও মানবিক বিষয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং মূল্যায়নে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও প্রকাশনাকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া অনেক শিক্ষক নিয়মিতভাবে গবেষণা-প্রোফাইল ও একাডেমিক তথ্য হালনাগাদ না করায় র‍্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসেনের মতে, বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের গবেষণার ধরন ভিন্ন হওয়ায় একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন সবসময় যথাযথ হয় না। কলা অনুষদের গবেষণার বড় অংশ বই বা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়, যা আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের সূচকে সবসময় প্রতিফলিত হয় না।

একই মত প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানের অনেক গবেষণা স্থানীয় বা বাংলাদেশকেন্দ্রিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ ও উদ্ধৃতির সুযোগ তুলনামূলক কম। ফলে গবেষণার মান ভালো হলেও আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে তার প্রভাব সীমিত থাকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত গবেষণাও আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এসব গবেষণা অধিকাংশ সময় আন্তর্জাতিক সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, গবেষণা প্রকাশনায় উৎসাহ এবং মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা কঠিন হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও গবেষণা ও একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনই এখন দেশের কলা ও মানবিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বিভাগ এর আরো খবর

আইনজীবী সহকারী পরিষদ, উখিয়া’র আত্মপ্রকাশ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর