কক্সবাংলা ডটকম(৬ আগস্ট) :: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন বাতিলের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্তের কারণে দেশের জ্বালানি খাত নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩১টি প্রকল্প, তৃতীয় ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির চুক্তি বাতিলের ফলে বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে তাদের অভিমত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে জ্বালানি খাত আগে থেকেই দুর্বল অবস্থায় ছিল।
তবে ক্ষমতায় এসে সংস্কারের নামে অন্তর্বর্তী সরকার যেসব চুক্তি একযোগে বাতিল করে, সেগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাদের মতে, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো পুনরায় দরকষাকষির (রিনেগোশিয়েশন) মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে চলতি বছর প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
পাশাপাশি ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক সক্ষমতার তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালও চলতি বছরের অক্টোবরে চালু হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বর্তমান গ্যাস সংকট অনেকটাই প্রশমিত হতো এবং লোডশেডিং মোকাবিলায়ও বড় ভূমিকা রাখত।
বর্তমানে দেশে স্বাভাবিক সময়েই দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এরই মধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও সিএনজি খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও ব্যাহত হয়েছে।
ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর সরকারের সঙ্গে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়, যার আওতায় চলতি বছরের জুন থেকেই গ্যাস আমদানি শুরু হওয়ার কথা ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এফএসআরইউ নির্মাণে সাধারণত ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। ফলে পুরোনো চুক্তি বাতিলের পর বিকল্প উদ্যোগ নিলে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই নতুন টার্মিনাল নির্মাণ সম্ভব ছিল। কিন্তু সে ধরনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট কোনো একদিনের সৃষ্টি নয়; এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে। তার মতে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি বাতিল না করে পুনঃআলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে সাময়িকভাবে অনেক সংকট দূর করা সম্ভব হতো।
অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বাতিল হওয়া ৩১টি প্রকল্পের মধ্যে ২৮টিতেই বিদেশি বিনিয়োগ ছিল, যার বেশির ভাগই চীনা প্রতিষ্ঠান।
কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই এসব প্রকল্প বাতিল করায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা গেছে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম গ্যারান্টির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
তার মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চলতি বছর অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে লোডশেডিং অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গত দেড় দশকের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে কোনো পৃথক কমিশন গঠন করা হয়নি।
একই সময়ে রাজনৈতিক সংস্কার ও সাংবিধানিক বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেলেও দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাত প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। এ ছাড়া সে সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষ থেকেও ভবিষ্যৎ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিগত পরামর্শ বা রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদ শেষে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
স্পট মার্কেটে এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি আমদানিতে অনিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে দেশের গ্যাস খাত আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
তাদের মতে, বছরের পর বছর পরিকল্পনাহীনতা, দুর্নীতি এবং নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তের ফলে জ্বালানি খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নতুন বিনিয়োগ এবং বাস্তবসম্মত নীতিগত সংস্কারের বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমান গ্যাস সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের স্থগিত প্রকল্পগুলো দ্রুত সমাধান করে কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার চেষ্টা চলছে।














