বিশেষ প্রতিবেদক ::কক্সবাজারে ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। এরপর প্রায় দুই বছর নয় মাস পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যায়নি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন।
ফলে প্রায় ২১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রেলওয়ে স্টেশনের অবকাঠামো, আসবাব ও বিভিন্ন সরঞ্জাম দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্টেশনটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হলেও দরপত্র প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। ফ্যাব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচারে নির্মিত ছয়তলা স্টেশন ভবনটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার শুরু করা না গেলে রক্ষণাবেক্ষণেও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রেলওয়ের পর্যাপ্ত জনবল এখনো নিয়োগ দেয়া হয়নি। সীমিত জনবল দিয়ে স্টেশন পরিচালনা করায় নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় স্টেশনসংলগ্ন রেললাইন ও বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির অভিযোগও উঠেছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় স্টেশনের বিভিন্ন ফিটিংস, আসবাব ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে।
উপকূলীয় শহর কক্সবাজারের আর্দ্র ও লবণাক্ত পরিবেশের কারণে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় থাকা স্টেশনের পাইপ, বাথরুম ও পানি সরবরাহের লাইনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে এসব অবকাঠামো সচল রাখতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব আছমা সুলতানা ও উপসচিব আবিদা সুলতানা দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ও কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করেন। গত ১৩ থেকে ১৫ মে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি, অবকাঠামো, যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্ভাব্য রাজস্ব আয় নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও দর্শনার্থী স্টেশনে আসেন। স্টেশনের শপিং সেন্টার, হোটেল, মাল্টিপারপাস হল ও রেস্টুরেন্ট চালু করা গেলে যাত্রী ও দর্শনার্থীদের জন্য সেবার পরিধি বাড়বে। একই সঙ্গে এসব বাণিজ্যিক স্থাপনা চালু হলে স্টেশন থেকে সরকারের রাজস্ব আয়েরও সুযোগ তৈরি হবে।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। এ পথে ৩৮টি সেতু ও নয়টি স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে এ রুটে ট্রেন চলাচল করলেও কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনে এখনো তীব্র জনবল সংকট রয়েছে।
প্রায় ৬০ একর জমির ওপর নির্মিত স্টেশনটির ছয়তলা ভবনে রয়েছে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ প্ল্যাটফর্ম। স্টেশন ভবনের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার, ডরমিটরি, রেস্ট হাউজ ও পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় ওয়েটিং রুম ও শপিং সেন্টার, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় উন্নতমানের হোটেল, পঞ্চম তলায় অফিস এবং ষষ্ঠ তলায় মাল্টিপারপাস হলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গেলে স্টেশনে কর্মরত রেলকর্মীরা বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, সীমিত জনবল দিয়ে স্টেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সেগুলো কীভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় পুরো স্টেশনটি উন্মুক্ত করা যাচ্ছে না।
যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য কিছু অংশ উন্মুক্ত করা হলেও পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাকর্মীর অভাবে স্টেশনটি প্রায়ই অপরিচ্ছন্ন থাকছে। পুরো স্টেশন প্রাঙ্গণ যথাযথভাবে মনিটরিং করা সম্ভব না হওয়ায় বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রকল্পের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, জনবল সংকটের কারণে স্টেশনের শুধু নিচতলা সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনা ঘটায় টয়লেট, লকার রুম, ওয়েটিং রুমসহ অন্যান্য সুবিধা পুরোপুরি উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় এসব যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় নষ্ট হচ্ছে অবকাঠামো ও সরঞ্জাম
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু করা এখন রেলওয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৬০ একর জমিতে নির্মিত এত বড় অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) ২ হাজার ৬৯৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকল্প সহায়তা ৮ হাজার ৬৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এদিকে, দোহাজারী-কক্সবাজার রুটে এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ট্রেন সার্ভিস চালু করতে পারেনি রেলওয়ে। প্রতিদিন প্রায় ৩১ জোড়া ট্রেন পরিচালনার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে।
কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনে বর্তমানে চারজন স্টেশনমাস্টার, চারজন বুকিং সহকারী, পাঁচজন টিকিট কালেক্টর (টিসি), তিনজন পোর্টার, ১২ জন পিম্যান ও ছয়জন গেটকিপার কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া স্টেশনের নিরাপত্তায় আটজন জিআরপি ও প্রায় ১২ জন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকৌশল বিভাগেও সীমিত পরিসরে জনবল রয়েছে। বৃহৎ এ স্টেশনের প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমান জনবল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে স্টেশনের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেয়ার উদ্যোগেও দীর্ঘসূত্রতা
কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেয় রেলওয়ে। তবে দরপত্র প্রক্রিয়ায় আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব জমা না দেয়ায় পুরো প্রক্রিয়া থমকে যায়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রথম দরপত্রে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শিডিউল কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ দরপত্র জমা দেয়নি। পরে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কিছু শর্ত শিথিল রেখে নতুন করে দরপত্রের কাজ শুরু করা হয়েছে। নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হলে চলতি বছরের মধ্যেই স্টেশনটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
জানা গেছে, ‘ইনভাইটেশন ফর প্রপোজাল ফর ইন্টিগ্রেটেড ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অপারেশন অব কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন’ শীর্ষক পরিকল্পনায় দেশি-বিদেশি আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাব জমা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। গত ২৫ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হলেও নির্ধারিত সময় ৬ এপ্রিলের মধ্যে আগ্রহী আটটি প্রতিষ্ঠানের কেউই দরপত্র জমা দেয়নি।
এরপর ৯ এপ্রিল রেল ভবনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পোস্ট-প্রপোজাল মিটিং করে রেলওয়ে। সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দরপত্রের ৫ কোটি টাকা অফেরতযোগ্য অগ্রিম ও ১৫ কোটি টাকা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি দেয়ার শর্ত শিথিল করা, বিলম্বে ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জরিমানার হার কমানো, চুক্তি বাতিলের ধারা নমনীয় করা এবং চুক্তির মেয়াদ ১২ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করার মতো বিভিন্ন প্রস্তাব দেয়া হয়।
তিন বছরেও স্টেশনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনায় দেয়া সম্ভব না হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ট্রেন সার্ভিস চালু হলেও কক্সবাজার স্টেশন কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করা হলেও শিডিউল ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তাব জমা দেয়নি। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দরপত্রের বেশ কিছু বিষয় পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রেলওয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, ঝিনুকের আকৃতিতে নির্মিত ছয়তলা স্টেশন ভবনটিতে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য রয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৭ বর্গফুট জায়গা। এ বিশাল বাণিজ্যিক স্পেস পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা গেলে স্টেশনটি শুধু যাত্রীসেবার কেন্দ্রই নয়, রেলওয়ের অন্যতম রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, এত বড় অবকাঠামো পরিচালনায় রেলের অতীত অভিজ্ঞতা নেই। এ কারণে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেসরকারি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখায়নি। এখন নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে দ্রুত স্টেশনটি চালু করতে বাণিজ্যিক বিভাগ কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারে ট্রেন সার্ভিস চালুর পরও আইকনিক স্টেশনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়া রেলওয়ের জন্য একটি বড় ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতি। দ্রুত জনবল সংকট দূর করে নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু করা গেলে একদিকে যেমন বিপুল বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যাবে, অন্যদিকে যাত্রীসেবার মানও বাড়বে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় রাখার পরিবর্তে দ্রুত স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন তারা।













