রবিবার ২৩ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেয়ারবাজারে অনিয়ম-জালিয়াতি থামছে না, গ্রাহকের শত কোটি টাকা নিয়ে ব্রোকারেজ হাউসের আত্মসাত

🗓 রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১১ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১১ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৩ আগস্ট) :: শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা উদ্যোগের পরও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম থামছে না। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে।

গত দুই বছরে অন্তত ২৫টি ব্রোকারেজ হাউসের কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট বা সিসিএ থেকে শত শত কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া কিংবা ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে।

শুধু গ্রাহকের অর্থ নিয়ে অনিয়ম নয়, বড় ধরনের জালিয়াতি, অর্থ পাচার, গ্রাহকের অর্থ ফেরত না দেওয়া, সিসিএ ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে অন্তত ২২টি ব্রোকারেজ হাউস বন্ধ হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু ব্রোকারেজ হাউসের যোগসাজশে শেয়ারবাজারে গুজব ছড়িয়ে কারসাজিও করা হয়।

ভুক্তভোগী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এমনকি তাদের আজীবনের জন্য শেয়ারবাজারে নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বিভিন্ন পরিদর্শনে একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের সিসিএ ঘাটতি ধরা পড়েছে। চলতি আগস্টে হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে একাধিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পায় বিএসইসি।

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট থেকে নগদ টাকা উত্তোলন, একই ই-মেইল, মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে একাধিক বিও অ্যাকাউন্ট খোলা এবং সিসিএতে ২ কোটি ৯ লাখ টাকার বেশি ঘাটতির অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসইসি।

ডিএসই সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সালতা ক্যাপিটালের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিএসইসির তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ কোটি টাকা নগদ অর্থ এবং প্রায় ৭২ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৪ হাজার গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

এনআরবিসি সিকিউরিটিজের গ্রাহক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (সিসিবিএ) ৫২ কোটি টাকা ঘাটতি ধরা পড়ে বিএসইসির পরিদর্শনে।

পরে প্রতিষ্ঠানটি মূল কোম্পানি এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ৫৫ কোটি টাকা এনে ঘাটতি পূরণ করে।

কিন্তু কয়েক দিন পর বিএসইসির আকস্মিক পরিদর্শনে দেখা যায়, আগের দিন জমা দেওয়া ওই অর্থ আবার ব্যাংকে ফেরত নেওয়া হয়েছে। ফলে গ্রাহকের ৫২ কোটি টাকার কোনো সন্তোষজনক হিসাব দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি মশিহর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে। তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ১৬১ কোটি টাকা মূল্যের গ্রাহকের নগদ অর্থ ও শেয়ার ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা নগদ অর্থ এবং ৯২ কোটি টাকার বেশি মূল্যের শেয়ার রয়েছে।

বিএসইসির পরিদর্শনে সিসিএ ঘাটতির তালিকায় রয়েছে পিএফআই সিকিউরিটিজ, সিনহা সিকিউরিটিজ, ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস ও ধানমন্ডি সিকিউরিটিজ।

২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সিসিএ ঘাটতি প্রায় ১২৩ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে পিএফআই সিকিউরিটিজের ঘাটতি ছিল প্রায় ২৮ কোটি ১৮ লাখ, সিনহা সিকিউরিটিজের ৮ কোটি ৪৯ লাখ, ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডসের ১০ কোটি ৮ লাখ এবং ধানমন্ডি সিকিউরিটিজের ৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

এর আগে ২০২০ সালে গ্রাহকদের ১২৬ কোটি টাকা নিয়ে জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ এবং তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তারা জামিনে বের হয়ে যান। ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর গ্রাহকদের প্রায় ১৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তামহা সিকিউরিটিজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

গ্রাহকের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে সিলনেট সিকিউরিটিজ, মোহররম সিকিউরিটিজ, সিলেট মেট্রো সিটি সিকিউরিটিজ, ট্রেন্ডসেট সিকিউরিটিজ ও ফার্স্টলিড সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধেও।

পুরোনো বড় কেলেঙ্কারির মধ্যে রয়েছে তামহা সিকিউরিটিজ, ব্যাংকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ ছাড়া গ্রাহকের হিসাবে অননুমোদিত লেনদেন, ভুয়া পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট তৈরি, গ্রাহকের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন, সিসিএ ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ না করার মতো অভিযোগও পাওয়া গেছে। ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ, এনবিএল সিকিউরিটিজ, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ ও প্রুডেনশিয়াল ক্যাপিটালের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি। এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানাও করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিএসইসি মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, গত কয়েক বছরে কিছু ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিএসইসির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে কেউ অনিয়ম করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। যারা লুটপাট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ব্রোকারেজ হাউসের মালিকদের কেউ কেউ নানা অনিয়মে জড়িত ছিলেন এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এসব ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা দরকার। তাদের কারণে কয়েক হাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং শেয়ারবাজারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে।

তিনি বলেন, ডিএসই ও সিএসইর উচিত নিয়মিতভাবে সব ব্রোকারেজ হাউস পরিদর্শন করা। গ্রাহকদের নিরাপদ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর পরিদর্শন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর