সোমবার ২৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিনিয়োগে ধস,গড়ে উঠছে না নতুন শিল্প, বন্ধ কয়েক হাজার কারখানা; বেকার লাখো শ্রমিক

🗓 সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৫ বার দেখা হয়েছে

🗓 সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৫ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৪ আগস্ট) :: গত দুই বছরে দেশে কয়েক হাজার শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কাজ হারিয়েছেন লাখো শ্রমিক-কর্মচারী। বিনিয়োগে ধস নেমেছে, গড়ে উঠছে না নতুন শিল্প-কারখানা। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিক-কর্মচারীরা নতুন করে কাজও পাচ্ছেন না। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাদের অনেকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। তবে কবে নাগাদ এসব কারখানা চালু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের জুন থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হয়ে ওঠে। এর প্রভাব পড়ে শিল্প খাতে। লোকসানে পড়ে একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হতে থাকে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ কারখানার সংখ্যা আরও বাড়ে। দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিচার শেষ হওয়ার আগেই তাদের মালিকানাধীন শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

গত ১৫ ডিসেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে শ্রম ও ব্যবসায় পরিস্থিতি পর্যালোচনাসংক্রান্ত সভায় বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা বেকার হয়ে পড়েন।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও মাল্টিমোড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল মিন্টু সে সময় বলেছিলেন, কেউ অন্যায় করলে তার বিচার হবে। বিচারে দুর্নীতি প্রমাণিত হলে শাস্তিও হবে। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই কোনো প্রতিষ্ঠানের সব কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। এতে শ্রমিক-কর্মচারীরা বেকার হয়ে পড়েন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রম আইন সংশোধন, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভক্তিকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দেয়। এর সঙ্গে দফায় দফায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক আরোপের বিষয় যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দূরত্বও বাড়ে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ও রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই শিল্প খাতের অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে শুধু পোশাক খাত নয়, গোটা শিল্প খাতেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ের খরচ বেড়েছে। লোকসানে পড়ে অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে, আবার অনেক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়েছেন লাখের বেশি মানুষ। কাজ হারানো এসব মানুষ আবার কবে কাজ পাবেন, তা অনিশ্চিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত পোশাকশিল্প। পোশাক খাতের সমস্যা নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার জন্য সময় চেয়েও আমরা পাইনি।’

বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৯৯টি বিজিএমইএ সদস্য কারখানা, ২৩৫টি বিকেএমইএ সদস্য কারখানা, ১৬৬টি বিটিএমএ সদস্য কারখানা এবং ৫৯টি বেপজা-সংশ্লিষ্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর বাইরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শিল্পের অন্যান্য খাতের আরও এক হাজারের বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে।

শুধু বেসরকারি শিল্প নয়, সরকারি মালিকানাধীন কারখানাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আধুনিকায়নের পর পুনরায় চালু করার আশ্বাস দিয়ে ২০২০ সালে ৩৪টি সরকারি কারখানা বন্ধ করা হয়। এতে ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েন। কিছু কারখানা বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়ে চালু করা হলেও অধিকাংশ এখনো বন্ধ।

সরকারি বন্ধ পাটকল প্লাটিনাম জুট মিলের সাবেক শ্রমিক মোহাম্মদ আজাদ মিয়া বলেন, ‘২০২০ সালে মিল বন্ধ হলে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে আমিও কাজ হারাই। এখনো চাকরি পাইনি। পরিবার নিয়ে খাওয়া-পরা ও থাকার সবকিছুতেই কষ্ট। কখনো রিকশা চালাই, কখনো মাল টানি।’

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবেও দেশের শিল্প খাতে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে, বেড়েছে লোডশেডিং। আগস্টের শুরুতে গাজীপুরে গ্যাসসংকটের কারণে প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা তিন থেকে চার দিনের জন্য উৎপাদন বন্ধ অথবা ছুটি ঘোষণা করে। এতে সাময়িকভাবে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। এসব কারখানার অধিকাংশই গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারে অবস্থিত। ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলেও তীব্র গ্যাসসংকটে ২০টি কারখানার শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘শিল্পের বিভিন্ন খাতের কয়েক হাজার কারখানা স্থায়ী ও সাময়িকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বন্ধ আছে। এখন গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘ সংকটে ক্রয়াদেশ কমে যাচ্ছে। বেশির ভাগ কারখানার মালিক আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েছেন। ঋণ ও কর পরিশোধ করতে পারছি না। লাখের বেশি শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা বেকার হয়ে গেছেন। দেশের শিল্প খাতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ০.২৮ শতাংশ। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সময়ে শিল্প খাতে উৎপাদন কমেছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বন্ধ কারখানার সংখ্যার তুলনায় কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণ নিয়েও সংকট রয়েছে।

তিনি বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকা কারখানা পুনরায় চালু হতে পারে, আবার স্থায়ীভাবেও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এসব কারখানার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনিশ্চিত সময়ের জন্য বেকার হয়ে আছেন। গ্যাস, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল কিংবা ক্রয়াদেশের সংকটে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকা কারখানার সংখ্যাও কম নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের চাকরি টিকে থাকলেও আয় ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেক কারখানা চালু থাকলেও লোকসান কমাতে উৎপাদন কমিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেশের শিল্প খাত বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ না আসা, পুরোনো শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় শিল্প খাতে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। বন্ধ শিল্পকারখানা দ্রুত চালু করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর