মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস : স্মৃতি, জবাবদিহি ও প্রত্যাবাসনের কঠিন বাস্তবতা

🗓 মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৬ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

👁️ ৬ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৫ আগস্ট) :: আজ ২৫ আগস্ট, রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস। নবমবারের মতো কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দিবসটি পালন করছে। গণহত্যার বিচার, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

তবে ২৫ আগস্ট কেবল একটি বার্ষিক স্মরণ দিবস নয়। রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় এক দশকের বাস্তবতায় এটি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক জবাবদিহি, মানবাধিকার, কূটনীতি এবং প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা পর্যালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আইনি জবাবদিহি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমছে, বাড়ছে মানবিক ঝুঁকি

ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য ও সুদানের মতো একাধিক নতুন বৈশ্বিক সংকটের ভিড়ে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় আগের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর তহবিল সংকটও প্রকট হচ্ছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সংকট যেন ‘বিস্মৃত সংকটে’ পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইও অব্যাহত রয়েছে। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলার অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় আইনি ও তথ্যগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীনতা ও মানবাধিকারের মৌলিক অঙ্গীকার যেন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে উপেক্ষিত না হয়, সে বিষয়েও নাগরিক নজরদারি জরুরি।

ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ

রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর পরিচালিত কয়েকটি প্রকল্পে অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং তহবিল ব্যবহারে নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উখিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ ডলার ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ভাসানচরে সৌর সরঞ্জাম ও এক্স-রে মেশিনসহ ২০ শয্যার একটি চিকিৎসাকেন্দ্র অব্যবহৃত পড়ে ছিল। ভাসানচরে সরকারের পূর্বনির্মিত সৌর স্থাপনা থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫২৮ ডলারের একটি পৃথক জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্যও উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য খাতেও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে ডায়রিয়া, কলেরা, হেপাটাইটিস সি ও খোসপাঁচড়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে মেয়াদোত্তীর্ণ সুঁচের তারিখ পরিবর্তনের অভিযোগ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের চুক্তি দেওয়া, ৪২ লাখ ডলারের আশ্রয় সামগ্রী ও ৮ লাখ ডলারের চিকিৎসাসামগ্রী একাধিকবার কেনা এবং ভ্যাট ছাড়ের সুযোগ না নেওয়ায় ৬৫ লাখ ডলারের আর্থিক ক্ষতির মতো বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তুলনায় তাৎক্ষণিক ত্রাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোট তহবিলের ৬৭ শতাংশ তাৎক্ষণিক ত্রাণে ব্যয় হলেও শরণার্থী ক্ষমতায়নে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ।

ক্রয় ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাতেও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে নির্মাণকাজ দেওয়া, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত এলপিজি কেনা, একই এলাকায় অতিরিক্ত পানির নেটওয়ার্ক ও পাম্প স্টেশন স্থাপন এবং নকশাগত ত্রুটির কারণে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হাতির ওয়াচ টাওয়ার অকার্যকর হয়ে পড়ার মতো তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ক্যাম্পের অনিশ্চয়তায় বাড়ছে পাচারের ঝুঁকি

দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কারণে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা দালালদের মাধ্যমে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে। এতে সংকটটি শুধু শরণার্থী শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তসীমান্ত মানব পাচার ও নৌপথে প্রাণহানির আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।

প্রত্যাবাসনে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানকে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটির নির্বাচনি ইশতেহার ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক রূপরেখায় রোহিঙ্গাদের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও আন্তর্জাতিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দলটির পক্ষ থেকে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসনের নজির তুলে ধরে বলা হয়েছে, এবারও কোনও ধরনের জোরপূর্বক বা অনিরাপদ প্রত্যাবাসন নয়; বরং জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি রাখাইনে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, মৌলিক মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দখলকৃত জমি ও বসতভিটা ফেরত এবং জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিষয়গুলো সামনে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন বা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

আশ্রয়শিবিরের প্রবীণ, নারী ও তরুণ নেতৃত্বের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ, শিক্ষা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করাও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ আরও জটিল করেছে প্রত্যাবাসন

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। বিমান হামলা, ভারী কামানের গোলাবর্ষণ এবং বিভিন্ন পক্ষের সংঘাতে বেসামরিক মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগ এবং সীমান্তকেন্দ্রিক আন্তসীমান্ত অপরাধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কারণ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা এখনও নেই। পাশাপাশি যেসব এলাকায় প্রত্যাবাসনের কথা বলা হচ্ছে, রাখাইনের বড় একটি অংশ বর্তমানে জান্তা সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যকার সংঘাত, রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ এবং অনির্দিষ্ট ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’—সব মিলিয়ে অদূর ভবিষ্যতে নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিবেশ এখনও অনিশ্চিত।

আরাকান আর্মি ও আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ যথেষ্ট নয়। রাখাইনের মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রক আরাকান আর্মির অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি চীন, ভারতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীজনের সঙ্গে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

রাখাইনে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক করিডোরের স্বার্থ এবং ভারতের ‘কালাদান মাল্টি-মডাল ট্রানজিট প্রজেক্ট’ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা স্বার্থও প্রত্যাবাসনের আঞ্চলিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক আইনের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

রোহিঙ্গাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো রোহিঙ্গাদের নিজেদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রত্যাবাসন কিংবা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত যেন কেবল উচ্চপর্যায়ের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একপাক্ষিক ও বিদ্বেষমূলক বয়ান থেকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ক্যাম্পে মাদক, মানব পাচার বা অপরাধের ঘটনা ঘটলে পুরো জনগোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা সংকটের প্রকৃত কারণকে আড়াল করে। কোনও জাতিগোষ্ঠী জন্মগতভাবে অপরাধপ্রবণ নয়; দীর্ঘস্থায়ী অধিকারহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

তাই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি পুরো জনগোষ্ঠীকে দায়ী করার প্রবণতা থেকেও বিরত থাকা জরুরি।

স্থানীয় বাংলাদেশিদের স্বার্থও সুরক্ষিত করতে হবে

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে কক্সবাজার ও টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপের মুখে পড়েছে। ভূমি, বন, ভূগর্ভস্থ পানি, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চাপ স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করেছে।

তাই রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। উন্নয়ন বরাদ্দের সুষম বণ্টন এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ যেন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষে রূপ না নেয়, সেটিও রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজকে নিশ্চিত করতে হবে।

স্মরণ থেকে জবাবদিহির পথে

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কেবল জরুরি ত্রাণনির্ভর ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা ঘাটতি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত মধ্যমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। এর আওতায় ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, জীবিকা ও চলাচলের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও ‘নিরাপদ’, ‘স্বেচ্ছামূলক’, ‘মর্যাদাপূর্ণ’ ও ‘টেকসই’—এই চারটি শর্তকে মূল ভিত্তি করতে হবে। নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, জাতিগত স্বীকৃতি, ভিটেমাটি ফেরত, মৌলিক অধিকার এবং জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা ছাড়া কেবল সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়া কোনও প্রত্যাবাসন হতে পারে না।

২০১৭ সালের গণহত্যা, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, যৌন সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় তা যথাযথভাবে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস থেকে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মুছে ফেলার যে প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তার বিরুদ্ধে তথ্য, নথি ও আইনি জবাবদিহির লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।

প্রতি বছর ২৫ আগস্ট তাই কেবল শোক ও স্মরণের দিন নয়। এটি রোহিঙ্গাদের অধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায় পুনর্বিবেচনার দিন।

শোকের স্মৃতিকে যদি জবাবদিহির দাবি, মানবিক অবস্থান এবং বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দেওয়া না যায়, তাহলে রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসও একসময় নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই এই দিনটির প্রকৃত তাৎপর্য হলো—গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা।

ইইউ ও ১৫ দেশের বিবৃতি

বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিজেদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে রাখাইনে সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে এবং মানবিক সংকটও তীব্র হচ্ছে। বেসামরিক অবকাঠামোয় বিমান হামলা এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ত্রাণ ও বাণিজ্যে বাধা মানবিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাচ্ছে

মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির নয় বছর পূর্তিতে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ১৫টি দেশ। সেখানে বলা হয়েছে, এখনো মিয়ানমারে এ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি।

বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশন আজ অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে। ইইউ ছাড়াও বিবৃতিতে আরো রয়েছে কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, কসোভো, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।

সেখানে বলা হয়েছে, প্রায় নয় বছর ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখনো বাংলাদেশে রয়েছেন। চলমান বাস্তুচ্যুতি ও নানা সংকটের মধ্যেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দৃঢ়তা, সাহস ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। একইসঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিজেদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে রাখাইনে সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে এবং মানবিক সংকটও তীব্র হচ্ছে। বেসামরিক অবকাঠামোয় বিমান হামলা এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ত্রাণ ও বাণিজ্যে বাধা মানবিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাচ্ছে।

এতে আরো বলা হয়, এই অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশে এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে আরো রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ নেই।

প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করতে বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ মোকাবেলা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরি এবং মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কৌশলগত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সফল প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়াও জরুরি— যাতে তারা রাখাইনে নিজেদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও সম্প্রদায় পুনর্গঠন করতে পারেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে। ততদিন বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা হবে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়া হবে।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখাই যথেষ্ট নয়, সহায়তা দেয়ার পদ্ধতিও উন্নত করতে হবে বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা এবং সহায়তা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশি ও শরণার্থী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগকে সমর্থন করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামতকে কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, সংকট দশম বছরে প্রবেশ করায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে যেন বিশ্ব ভুলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের কণ্ঠ আরো জোরালোভাবে তুলে ধরা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বৈশ্বিক সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের এক অংশকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলাপ দেখা যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে এমন তথ্য একটি দিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ও মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে মিয়ানমারের নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান একাধিক অধিকার গোষ্ঠী।

মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, নিপীড়ন ও রাষ্ট্রহীনতার শিকার। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। প্রতিবেশী বাংলাদেশের পাশাপাশি বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে অনেকে পৌঁছে গেছেন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায়।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর