কক্সবাংলা ডটকম(৭ নভেম্বর) :: বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সাল ছিল গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সংকটে পরিপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, যখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো, সামরিক বাহিনীর ঐক্য, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আজও একটি মৌলিক প্রশ্ন ইতিহাসের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লব সংঘটিত না হলে এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে ফিরে আসার সুযোগ না পেলে বাংলাদেশের পরিণতি কী হতে পারত? ইতিহাসে বিকল্প পরিস্থিতির নিশ্চিত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধি করা যায়, বাংলাদেশ আরও গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এমনকি সামরিক সংঘাত থেকে গৃহযুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াও অসম্ভব ছিল না। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তখন সত্যিই এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামোর ধ্বংস, প্রায় এক কোটি মানুষের ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং উৎপাদনব্যবস্থার বিপর্যয় সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ফেলে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ঋণাত্মক ৫ দশমিক ৪৮ ও ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ব্যাপক দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতার সুফল, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সেই প্রত্যাশার বিপরীত। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা ছিল সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র নিয়ে দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও বিভাজন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এমন এক সংকটময় সময়ে ৭ নভেম্বর সৈনিক বিদ্রোহ এবং জনতার অংশগ্রহণে রাষ্ট্রক্ষমতার বিদ্যমান বিন্যাসে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে তাঁর অবস্থান সুসংহত হয়। এই ঘটনা শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তার মুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে সৈনিকদের অসন্তোষ, জাতীয় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।
৭ নভেম্বরের গুরুত্ব উপলব্ধির জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হচ্ছে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের ১০ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখের কূটনৈতিক বার্তা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত ফরেন রিলেশনস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস সংকলনে সংরক্ষিত ওই বার্তায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার প্রতিষ্ঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে ব্যাপক প্রাণহানি এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ ব্যবধানে গৃহযুদ্ধ এড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। ভারতের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সমসাময়িক বিদেশি কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের পরিস্থিতির এমন চিত্র উঠে আসা প্রমাণ করে, সংকট কতটা গভীর ছিল। ফলে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে নিছক ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সোয়াসে সংরক্ষিত ‘মার্শাল ল ইন বাংলাদেশ, ১৯৭৫-১৯৭৯’ শীর্ষক গবেষণায়ও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে ধারাবাহিক অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহের বিবরণ পাওয়া যায়। গবেষণাটি দেখায়, ৭ নভেম্বরের পরও সামরিক অস্থিরতা পুরোপুরি দূর হয়নি। অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সুসংহত করা এবং দেশকে অনিশ্চয়তার বৃত্ত থেকে বের করে আনা।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে শিক্ষণীয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্যাট্রিক ম্যাকগোয়ানের গবেষণায় ১৯৫৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সাহারা-নিম্ন আফ্রিকার ৪৮টি দেশে ৮০টি সফল সামরিক অভ্যুত্থান এবং ১০৮টি ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণায় সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে বারবার অভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাইজেরিয়ার ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সালের গৃহযুদ্ধ রাজনৈতিক বিভাজন, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় ঐক্যের সংকটের ভয়াবহ পরিণতির উদাহরণ। এসব আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের সংকটের গুরুত্ব অনুধাবনে সহায়তা করে।
জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক অবদান শুধু সংকটকালে তার রাজনৈতিক উত্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, স্বনির্ভরতা এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। গ্রাম সরকার, খাল খনন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন কর্মসূচি তার উন্নয়ন দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর একটি হচ্ছে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সমন্বয়ে নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা ঘটে। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ভাষা, স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় পরিচয় গড়ে তোলা।
১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জিয়াউর রহমান সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য। মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের ফলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এই ঘটনা সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক দায়িত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
মূলত সার্বভৌমত্ব শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয় নয়। নিজস্ব ভূখণ্ডের ওপর কার্যকর কর্তৃত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যেই সার্বভৌমত্বের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের সংকটে এসব ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সামরিক বাহিনীর বিভাজন দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়লে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বহিরাগত শক্তির প্রভাব বিস্তারের সুযোগও সৃষ্টি করতে পারত।
সুতরাং, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা যথার্থ। সিপাহি জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে তার উত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। তিনি দেশকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, বহুদলীয় রাজনীতির কাঠামো এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বের ফলে বাংলাদেশ সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ পেয়েছিল, যদিও পরবর্তী সময়েও নানা সংকট ও বিতর্ক অব্যাহত ছিল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনৈতিক দর্শন ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব অপরিসীম। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং স্বনির্ভর উন্নয়নের ধারণাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে তার অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।
• ড. খালিদুর রহমান: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক













