মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া :: কক্সবাজারের পেকুয়ার আলোচিত পৈতৃক জমি ও পিতৃ পরিচয়ের দাবি নিয়ে থানায় গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়ে জেলে যাওয়া সেই কলেজ পড়–য়া মেয়ে জুবাইদা জন্নাত (২৩) ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে জামিন দিয়ে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো.শাহিদুল আলম।
শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত জেল ম্যাজিস্ট্রেট মো.শাহিদুল জামিনের আদেশ দেন।
এদিন বিকালে জামিনের আদেশ জেলা কারাগারে পৌছালে সন্ধ্যায় তারা কারাগার থেকে বের হন।
জানা গেছে, কলেজ পড়–য়া জুবাইদা জন্নাত (২৩) কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাবেক গুলদি এলাকার বাবা মৃত নুরুল আবছার ও মা রেহেনা মোস্তফা রানু দম্পতির মেয়ে।
জুবাইদার বয়স তখন ১ বছর বা তারও কম বেশি হবে। এরমধ্যে তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।
জুবাইদার বাবা যৌতুক চেয়ে তার মাকে নির্যাতন করেছিল বলে এই বিচ্ছেদ হয়েছিলো বলে জানা গেছে।
বিচ্ছেদের পরে মা জুবাইদাকে নিয়ে তার বাবার বাড়ি ফিরে আসেন।
অন্যদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করে নতুন সংসার করেন তার বাবা। জুবাইদার মাও সংসারী হন। তার ঘরে আনে রুবেল নামের আরেক ছেলে সন্তান।
তবে ছেলে ও মেয়েকে পড়ালেখা করাতে সংগ্রাম করেন রানু। পেছনে।
২০১৩ সালের ২৩ মে জুবাইদার বাবা নুরুল আবছারের মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর জুবাইদা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার স্থাবর সম্পত্তির দাবিদার।
কিন্তু জুবাইদার চাচারা জুবাইদাকে অস্বীকার করে বসে। বাবার উত্তরাধিকার পেতে যুদ্ধে নামে জুবাইদা ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানু।
জানা গেছে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ম অনুযায়ী স্ব-স্ব ইউনিয়নের বাসিন্দাদের ওয়ারিশ সনদ প্রদান করে থাকে।
জুবাইদা পেকুয়ার সদর ইউনিয়ন পরিষদে যয় ওয়ারিশ সনদ তুলতে। কিন্তু ওয়ারিশ সনদ প্রদান করতে অস্বীকার করেন ইউনিয়ন পরিষদ।
যাবতীয় ডকুমেন্টস জমা দেওয়ার পরেও ইউনিয়ন পরিষদ জুবাইদাকে পিতৃ পরিচয় দিতে রাজি হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, ওয়ারিশ সনদ প্রদানে বাধাগ্রস্থ করার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেন স্থানীয় মহিলা মেম্বার বিজু।
সম্পর্কে তিনি জুবাইদার আপন ফুফু। জুবাইদার বাপের বাড়ি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের সরকারি ঘোনা এলাকায়।
পরে সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন।
আদালত উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) অর্থাৎ এসিল্যান্ড তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
কিন্তু এসিল্যান্ড অফিসেও দীর্ঘ এক বছর তদন্ত প্রতিবেদন না দিয়ে আদেশটি ফেলে রাখে।
পরে ভুক্তভোগী তরুনী জুবাইদা আবারও আদালত গিয়ে মামলা তদন্তভার এসিল্যান্ড থেকে ফিরিয়েস নেয়ার আবেদন করেন।
বাদির আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত পেকুয়া থানাকে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষকে দায়িত্ব দেন তদন্ত করার জন্য।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ২০ হাজার টাকা ঘুষ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নারাজ।
তখন জুবাইদার খালা নিজের স্বর্ণের আংটি বন্ধক রেখে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার পরেও জুবাইদার বিপক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দেন থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষ।
গত বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) জুবাইদা তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে নিয়ে থানায় যায়।
কেন তাকে বঞ্চিত করা হল জানতে চাইলেন এসআই পল্লবের কাছে। সাথে ফেরত চাইলেন ঘুষের বিশ হাজার টাকা।
টাকা ফেরত চাইতেই পুলিশ চড়াও হলেন মা-মেয়ের উপর। মহিলা পুলিশ দিয়ে তাদের মারধর করা হয়।
তারপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলমকে ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ১ মাসের সাজা লিখিয়ে নিয়ে মা-মেয়েকে পাঠিয়ে দেয়া হয় জেলা কারাগারে।
এঘটনার পরে জেলা জুড়ে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকাসহ বিভিন্ন অনলাইনে ব্যাপক লেখালেখি হয়। পুলিশ প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে গেলে শনিবার(৭ মার্চ) দুপুরে জামিন শুনানি করেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো.শাহিদুল আলম। পরে জেলা কারাগারে থাকা কলেজ পড়–য়া মেয়ে জুবাইদা জন্নাত (২৩) ও মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে জামিন দেন।
পরবর্তীতে জামিনের আদেশ নামা জেলা কারাগারে পৌছালে তাদের মুক্ত করে দেন। বর্তমানে মা ও মেয়ে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে ছোট ভাই রুবেল নিশ্চিত করেছেন।














