কক্সবাংলা ডটকম(১২ মে) :: কারও নাম এখন কি আর ‘আকুল’ রাখা হয়? বোধহয় না। তবে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আকুল সরকার নামের কেউ একজন ছিলেন ১৮৯০ সালের দিকে। আরও ছিলেন একজন লতা ভদ্র। আকুল ছিলেন মুসলমান। কিন্তু হিন্দু ছিলেন লতা ভদ্র। অথচ তাদের মধ্যে প্রেম হয়েছিল! তারা দুইজনই চেয়েছিলেন, তাদের সেই প্রেম একটি ইতিবাচক গন্তব্যের দিকে যাত্রা করুক।
কিন্তু হিন্দু মেয়ের সঙ্গে হবে মুসলমান ছেলের বিয়ে! যেন আগুন জ্বলে উঠেছিল শাহজাদপুর থানাজুড়ে আর সেই আগুনের আঁচ স্পর্শ করেছিল মহকুমা শহর সিরাজগঞ্জকেও। সেখানে তখন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন ইংরেজ এফ ও বেল। সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেখা দিতে পারে, সেটা আঁচ করতে পেরে দ্রুত শাহজাদপুরে চলে এসেছিলেন এই তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট।
আকুল সরকারের বয়স তখন কত ছিল? কতই বা বয়স ছিল লতা ভদ্রের? সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থাই বা কেমন ছিল তাদের? কী করে প্রেম জন্ম নিয়েছিল তাদের ভেতর? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সহজে আর পাওয়া যাবে না।
এটাও আর জানা সম্ভব নয়, জীবনের বর্ণ-গন্ধ-সুধা তাদের কতটুকু স্পর্শ করেছিল, জীবনপথের উপান্তে তারা কেমন ছিলেন। এসব প্রশ্নের উত্তর না মিলুক, আকুল সরকার নামটি বেঁচে আছে, বেঁচে আছে লতা ভদ্রের নাম, বেঁচে আছে সেই আখ্যানের এই সারসংক্ষেপ যে, তারা দুজন একজন আরেকজনের প্রেমে পড়ে ঘর বেঁধেছিলেন।
হিন্দু আর মুসলমানের বিয়ে খুব সহজে হওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়েছিল, তা-ও ওই সময়ে। কারণ, এই পৃথিবীতে তখন আরও একজন মানুষ ছিলেন। যিনি ঠিক ওই সময়েই এসেছিলেন শাহজাদপুরে। সেটিই ছিল তার প্রথম শাহজাদপুরে আসা, বজরা নৌকা থেকে নদীপারে নেমে সিরাজগঞ্জের মাটিতে প্রথম পা ফেলা, এই নদীময় শ্যামল-সবুজ প্রান্তরকে দুচোখে মাখা।
এই মানুষটি রবীন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে তিনি শাহজাদপুরের জমিদারি দেখভালের দায়িত্ব পেয়েছিলেন পিতার কাছ থেকে। তারপর শাহজাদপুরে এসে পৌঁছেছিলেন পরের বছরের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এসেই তাঁকে পড়তে হয়েছিল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ভেতর—মুসলমান এক ছেলের প্রেমে পড়েছেন হিন্দু মেয়ে। তারা আবার চাইছেন ঘর বাঁধতে! ১৮৯০ সালের ২৭ জানুয়ারিতে শাহজাদপুরে থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি চিঠি ধরে রেখেছে সেই সময়ের ঘটনা-সংক্ষেপ। চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন আকুল সরকারের কাছে,
প্রিয় আকুল সরকার,
তোমার ব্যাকুলতা আমি উপলব্ধি করেছি, সিরাজগঞ্জ থেকে সাহেব এসেছিলেন, আমি তাঁকে তোমাদের বিষয়টি বিশেষভাবে বুঝিয়ে দিয়েছি, তুমি নিজের স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করনি, এইটে আমার ভালো লেগেছে। সাম্প্রদায়িকতাকে আমি ঘৃণা করি, মানুষের নিকট মানুষের মর্যাদার বড়ো আর কিছু নেই। নারী ও পুরুষের প্রেম এই শাসন মেনে চলে,—সে হৃদয়ের বশ, ধর্ম বা বর্ণের অনুশাসন তার বড়ো নয়, সমাজ প্রাচীর গড়ে কিন্তু হৃদয় অনায়াসেই সে প্রাচীর অতিক্রম করতে পারে। তোমাদের সাথে আলাপ করে আমি তেমনি দুটো হৃদয়ের সন্ধান পেয়েছি। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শাসনকে নিজের হাতে নেবার চেষ্টা করবে না। আশা করি তোমাদের উপর যে অত্যাচারের আশঙ্কা করা গিয়েছিল তা দূরীভূত হয়েছে। তোমরা আমার সাহায্য ও সহানুভূতি সর্বদাই লাভ করবে।
ইতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাজাদপুর
২৭ শে জানুয়ারি, ১৮৯০
আকুল সরকার ও লতা ভদ্র দুইজনের সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ আলাপ করেছিলেন, তাদের বিয়েতে মধ্যস্থতা করেছিলেন। এলাকায় যাতে কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেখা না দেয়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হয়েছিল তাঁকে। অনুমান করি, আকুল সরকার শিক্ষিতই ছিলেন, না হলে এই পত্রযোগাযোগ ঘটার কথা নয়। আর ভদ্র পদবিই বলে দিচ্ছে, লতা ছিলেন কায়স্থ কন্যা। এমন দুইটি হৃদয়কে একত্র করা কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলার নদীবিধৌত প্রান্তরে আসা তরুণ এক জমিদারের জন্যে ছিল এক কঠিন পরীক্ষা।
তখনো তাঁর ২৯ বছর বয়স পূর্ণ হয়নি, কিন্তু হৃদয়ের ভাষা তাঁর চেয়ে ভালো করে কে আর বুঝতে পারে, কে আর পারে তার চেয়ে বিস্ময়াচ্ছন্ন চোখ চারপাশে মেলে ধরতে, কে আর পারে তার মতো শুদ্ধতম চাওয়ার আঘ্রাণ ছড়াতে! জমিদারি করতে এসেই তাঁকে এমন একটি কঠিন সাম্প্রদায়িকতামুখর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু তিনি ব্যাপক ঝুঁকি থাকার পরও দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের হৃদয়ের লেনাদেনার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার আগুনও নিভিয়ে ছিলেন।
যদিও বাস্তবতা হলো, এই রবীন্দ্রনাথকে কেউ কেউ এখনো সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই উপস্থাপনের চেষ্টা করে চলেছেন। প্রাসঙ্গিকতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে এখনো তাঁর বিভিন্ন লেখার খণ্ডিত বাক্য কিংবা সংলাপ তুলে ধরে তারা তাদের সাম্প্রদায়িক কূটকচাল চালিয়ে যেতে চাইছেন। অনেকে সেই কূটকচালের ফাঁদে ঝাঁপও দিচ্ছেন।
তবে লেখাই বাহুল্য, বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক বিকাশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্মের বিশেষ সংযোগ ও অবদান থাকার সূত্রে তিনি প্রবল এক রাজনৈতিক চরিত্রেও পরিণত হয়েছেন; অন্যভাবে বলতে গেলে, তাঁকে একটি রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণতও করা হয়েছে। আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে ক্রিয়াশীল যেকোনো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিরই আক্রমণের মূল লক্ষ্য বস্তু তাই এখনো রবীন্দ্রনাথ।

অস্বীকার করার উপায় নেই, যে ভাষা আমাদের এই জনপদের মানুষকে একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে সংহত ও ঐক্যবদ্ধ করেছে, সাংস্কৃতিক করে তুলেছে এবং আবেগের ধারাপাতে সম্পৃক্ত করেছে, সেই বাংলা ভাষাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতে গেলে একাই একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। সেটি করতে গিয়ে তাঁকে ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করতে হয়েছে।
এ রকম ঘটেছিল-কেননা ভাষা হিসেবে বাংলার সঙ্গে উর্দু কিংবা অন্য কোনো ভাষার বিরোধ নেই, এমন কথা যতই বলি না কেন আর তত্ত্বগতভাবে তা যত সঠিকই হোক না কেন, ইতিহাসের কালানুক্রম বলে, বাঙালি মুসলমানের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার একটি সচেতন প্রয়াস রাজনৈতিকভাবে মুসলিম লীগের যাত্রা শুরুর সময় থেকেই ছিল।
আরও পেছনের দিকে তাকালেও দেখা যাবে, অন্ত্যজ বাঙালির এই ভাষাকে অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করার অপপ্রয়াস বরাবরই ছিল; কিন্তু অন্ত্যজ বাঙালি যেমন অচ্ছুৎ ছিল, তার ভাষাও ছিল অচ্ছুৎ-তাই সে পল্লবিত হয়েছে আপনার মতো করে, কুৎসিত হাঁসের ছানা থেকে সুন্দর রাজহাঁস হয়ে উঠে একদিন অবাক করে দিয়েছে সবাইকে।
যাই হোক, এ নিয়ে আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় বলতে গেলে, প্রথমে কংগ্রেস ও পরে মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশের পর ভাষার প্রশ্নে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল দ্বিধাবিভক্তি, দেখা দিয়েছিল বিতর্ক। বিশেষত ওই সময় বাংলার মুসলিম সমাজেও উর্দুভাষী মুসলমানরাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানে থাকায় বাঙালি মুসলমানদের এই সংশয় আর দ্বিধাবিভক্তি আরও বেড়েছিল। এমন সংশয়, দ্বিধাবিভক্তি ও বিতর্কের মধ্যেই ১৩১০ সনের পৌষ মাসে (১৯০৩ সালের ডিসেম্বরের শেষার্ধ থেকে ১৯০৪ সালের জানুয়ারির প্রথমার্ধে) বাঙালি মুসলমানদের ‘নবনূর’ নামের সাহিত্য পত্রিকায় ‘মাতৃভাষা ও বঙ্গীয় মুসলমান’ শীর্ষক নিবন্ধে লেখা হয়েছিল,
‘যাহারা জোর করিয়া উর্দুকে বঙ্গীয় মুসলমানের মাতৃভাষার আসন প্রদান করিয়া সমস্ত ভারতে মুসলমানদের একই ভাষা করিতে চান, তাহারা কেবল অসাধ্য সাধনের প্রয়াস করেন মাত্র।’ ১৯১৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির উদ্যোগের তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলন। সেখানে মোহাম্মদ আকরাম খানকে আমরা বলতে শুনি,
‘আমাদের দলের চরমপন্থীরা এখন বলিতে আরম্ভ করিয়াছেন, বাঙ্গালা শুধু আমাদের মাতৃ ভাষা নহে, উহা আমাদের জাতীয় ভাষাও বটে। আমাদের ক্ষুদ্র বিবেচনায় এই মত একেবারে অযৌক্তিক এবং সমাজের পক্ষে অত্যন্ত ভয়াবহ। মুসলমানের জাতীয়তা সম্পূর্ণ ধৰ্ম্মগত। বিশ্বের সকল মুসলমান মিলিয়া এক অভিন্ন ও অভেদ্য জাতি। কোন মহাদেশের, কোন দেশের বা কোন প্রদেশের মুসলমানদিগের দ্বারা কথিত ভাষা সেই সকল স্থানীয় মুসলমানের জাতীয় ভাষা বলিয়া গৃহীত হইতে পারে না। মুসলমানের জাতীয় ভাষা যে আরবী এ কথা ভুলিলে মুসলমানের সর্বনাশ হইবে।’
এমনকি মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর মতো প্রাজ্ঞ লেখকও সাময়িকভাবে বিভ্রান্তির শিকার হন, অবাঙালি উর্দুভাষীদের ভাষাসংক্রান্ত মতাদর্শে প্রভাবিত হন। ১৩২৫ সনের মাঘ মাসে (১৯১৯ সালের জানুয়ারির শেষার্ধ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে) ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার ১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যায় ‘বাঙলা ভাষা ও মুসলমান সাহিত্য’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে তিনি তখন লিখেছিলেন যে,
‘আরবী এবং উর্দুকে বাদ দিয়া বাঙলায় বাঙ্গালী মুসলমানের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যাইবে না। মুসলমানের মনে নেশন শব্দ জাগিয়া উঠিলে সে কখনো আপনাকে বাঙলার অধিবাসী বলিয়া মনে করিতে পারে না।… বাঙ্গালা আমাদের জাতীয় ভাষা হইলে আমরা আনন্দিত হইতাম, কিন্তু শ্রেয়কে প্রেয়র উপরে স্থান দিতেই হইবে। বাঙ্গালা তাহা হইলে আমাদের মাতৃ ভাষা-জাতীয় ভাষা নহে।’
অবশ্য মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী পরবর্তী সময়ে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং ভাষাসম্পর্কিত এমন ধারণা ত্যাগ করেন। তবে বাঙালি মুসলমানের একাংশের মধ্যে এ রকম বিভ্রান্তিকর ধারণার পালে বাতাস লাগার কারণ বোধ করি এমন ধর্মবাদী রাজনৈতিক অপপ্রচার যে, অবাঙালি মুসলমানরা যে ফারসি ও উর্দু ভাষায় কথা বলে, তা ইসলামসম্মত; অথচ তারা এই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে চাননি যে, একই বিবেচনায় তো বাঙালি মুসলমানের কথা বলার ভাষা বা বাংলা ভাষাও ইসলামসম্মত।
লক্ষ করার বিষয়, বছরের পর বছর এই বিতর্ক চলেছে-তৎকালীন বাঙালি মুসলমানদের একাংশ বাংলা ভাষাকে অস্বীকার করার পথে পা বাড়িয়েছিলেন, অন্যদিকে আরেকটি অংশ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেমেছিলেন।
ভাষা প্রসঙ্গ যে বিশেষত বাঙালি মুসলমানের জন্যে একটি বড় সংকটের বিষয় হয়ে উঠছে, রাজনীতির বিষয়ে পরিণত হচ্ছে এবং ভাষিক সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দিতে চলেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা উপলব্ধি করেছিলেন এবং একপর্যায়ে এই বিষয়ে তিনি কলমও ধরেছিলেন। বাঙালি মুসলমানের বাংলা ভাষার ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াসের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এক অভিভাষণে বলেছিলেন,

(পরে এই অভিভাষণটি ‘সাহিত্যসম্মিলন’ শিরোনামে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছাপা হয় এবং গ্রন্থভুক্তও হয়)
‘সম্প্রতি হিন্দুর প্রতি আড়ি করিয়া বাংলা দেশের কয়েকজন মুসলমান বাঙালি-মুসলমানের মাতৃভাষা কাড়িয়া লইতে উদ্যত হইয়াছেন। এ যেন ভাইয়ের প্রতি রাগ করিয়া মাতাকে তাড়াইয়া দিবার প্রস্তাব। বাংলা দেশের শতকরা নিরানব্বইয়ের অধিক-সংখ্যক মুসলমানের ভাষা। সেই ভাষাটাকে কোণঠাসা করিয়া তাহাদের উপর যদি উর্দু চাপানো হয়, তাহা হইলে তাহাদের জিহ্বার আধখানা কাটিয়া দেওয়ার মতো হইবে নাকি। চীনদেশে মুসলমানের সংখ্যা অল্প নহে, সেখানে আজ পর্যন্ত এমন অদ্ভূত কথা কেহ বলে না যে, চীনভাষা ত্যাগ না করিলে তাহাদের মুসলমানির খর্বতা ঘটিবে। …বাংলা যদি বাঙালি-মুসলমানের মাতৃভাষা হয়, তবে সেই ভাষার মধ্য দিয়াই তাহাদের মুসলমানিও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ হইতে পারে।’
রবীন্দ্রনাথের কথা বাঙালি মুসলমানকে নিশ্চয়ই উদ্দীপ্ত করেছিল! কিন্তু তার পরও ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে বাঙালি মুসলমানের বাংলা ভাষাকে রুদ্ধ করার এবং তার ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার সচেতন বেসরকারি রাজনৈতিক প্রয়াস কখনোই থামেনি। সে কারণেই দেখি, ১৯৩৭ সালে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ প্রস্তাবই করে বসেন যে, উর্দুকে মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা করা হোক। শেরেবাংলা এ কে এম ফজলুল হকের তীব্র বিরোধিতার মুখে জিন্নাহ তার ওই প্রস্তাব থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। এ ঘটনাই বলে দেয়, ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় এসে জিন্নাহ যে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা ছিল পুরোপুরিই একটি সুচিন্তিত ঘোষণা, তা ছিল তার দীর্ঘদিনের লালিত-পালিত দুঃস্বপ্ন।
বাঙালি মুসলমানের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার অবস্থানকে চিহ্নিত করতে গিয়ে ‘সাহিত্যসম্মিলনী’তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও লিখেছিলেন, ‘কেহ কেহ বলেন, মুসলমানের ভাষা বাংলা বটে, কিন্তু তাহা মুসলমানি বাংলা, কেতাবি বাংলা নয়। স্কটল্যান্ডের ভাষাও তো কেতাবি ইংরেজি নয়, স্কটল্যান্ড কেন, ইংল্যান্ডের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের প্রাকৃত ভাষা সংস্কৃত ইংরেজি নয়। কিন্তু, তা লইয়া তো শিক্ষাব্যবহারে কোনোদিন দলাদলির কথা শুনি নাই। সকল দেশেই সাহিত্যিক-ভাষার বিশিষ্টতা থাকেই। সেই বিশিষ্টতার নিয়মবন্ধন যদি ভাঙিয়া দেওয়া হয়, তবে হাজার হাজার গ্রাম্যতার উচ্ছৃঙ্খলতায় সাহিত্য খানখান্ হইয়া পড়ে।’
লক্ষ্যণীয়, রবীন্দ্রনাথ কেতাবি ভাষার বাইরের ভাষাকে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু এ-ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, সব দেশেই সাহিত্যিক-ভাষার বিশিষ্টতা রয়েছে, যার নিয়মবন্ধন ভেঙে দেওয়ার অর্থ হলো গ্রাম্যতার উচ্ছৃঙ্খলতায় (গ্রামীণতার নয়) সাহিত্যকে তছনছ করে ফেলা। এখন থেকে একশ’ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছিলেন, বিস্ময়কর হলেও তা এখনো সত্য। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্বেই মাঝেমধ্যে আমরা এমন গ্রাম্যতার উচ্ছৃঙ্খলতার আছর লক্ষ করি। হয়তো ভবিষ্যতেও এমন আছর অব্যাহত থাকবে।

তারপরও রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই বলতে হয়,
‘… বাঙালিকে তাহার সাহিত্যই যথার্থভাবে ভিতরের দিক হইতে মানুষ করিয়া তুলিতেছে। যেখানে তাহার সমাজের আর-সমস্তই স্বাধীন পন্থার বিরোধী, যেখানে তাহার লোকাচার তাহাকে নির্বিচার অভ্যাসের দাসত্ব পাশে অচল করিয়া বাঁধিয়াছে, সেখানে তাহার সাহিত্যই তাহার মনকে মুক্তি দিবার একমাত্র শক্তি।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই দৃষ্টিভঙ্গিই বলে দেয়, কেন তিনি এখনো এত প্রাসঙ্গিক, এত অনিবার্য। কেন তাঁর কাছে আমাদের বারবার ফিরে আসতে হয়। আর কূপমণ্ডুক, সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীলরাই বা কেন বারবার তাঁকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, তাঁকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণের হাস্যকর খেলায় নামে।














