কক্সবাংলা ডটকম(১৮ মে) :: কোনো একটি গোষ্ঠীকে রাজনীতি থেকে নাই করে দেওয়ার মনোবাসনা যে খুব কাজের কথা নয়, সেটা ইতিহাস ঘাঁটলেও স্পষ্ট হয়।
রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হয়। চর্চার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই শুধু অগণতান্ত্রিক শক্তিকে রোধ করা সম্ভব
চিন্তার দিক থেকে বাংলাদেশে বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর একটা বিশৃঙ্খলা চলছে। যে দলগুলো প্রগতিশীল ও মার্ক্সবাদী বলে নিজেদের দাবি করে, তাদের চিন্তাধারা বর্তমান সময়ের নিরিখে সুশৃঙ্খল নয়। এক ধরনের আবেগ থেকে আগেকার মার্ক্সবাদীদের চিন্তাধারাতেই তারা এখনো পরিচালিত হচ্ছেন।
কিন্তু আগের মার্ক্সবাদীদের চিন্তায় ভুল থাকায় নিজেরা টিকতে পারেনি, উন্নতি করতে পারেনি। একটা ভুল চিন্তাধারায় যদি পরবর্তী প্রজন্ম অগ্রসর হয়, তাহলে তারাও চলে যায় ভুল পথে।
এদিক থেকে দেখলে প্রগতিশীল দলগুলো ভুল পথেই অগ্রসর হচ্ছে। অতীতের বামপন্থিরা মনে করতেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বিলুপ্ত হয়ে যাবে বা সেদিকেই নিয়ে যেতে হবে; কিন্তু বাস্তবতা হলো, ধর্মভিত্তিক দলগুলো চাইলেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। যদিও তাদের মধ্যে নানা বিরোধ ও মতপার্থক্য রয়েছে। যেমন— তাবলিগ জামাত মনে করে, ‘জামায়াতে ইসলামীর ইসলাম-সম্পর্কীয় ধারণা ভুল।’
আর জামায়াতে ইসলামী তাবলিগ জামাত সম্পর্কে মনে করে, ‘ওরা ইসলাম বোঝে না, কেবল ইবাদত-বন্দেগি বোঝে।’ এখানে বুঝতে হবে বামপন্থিদের, ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে থাকতে দিতে হবে; কারণ, বিষয়টা তো চিন্তার ও আবেগের। ইসলাম তো শুধু ইবাদত-বন্দেগি নয়, এটার রাজনৈতিক দিক রয়েছে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) কেবল ধর্মীয় নেতা নন; তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান, মদিনা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তার মৃত্যুর পর আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী (রা.) ছিলেন; তারাও করেছেন রাজনীতি। তারা একদিকে রাষ্ট্রপ্রধান, অন্যদিকে ছিলেন ইমাম। তাদের জীবন ভালো করে দেখলে দেখা যাবে যে তারা মনে করতেন, শুধু ইবাদত-বন্দেগি নয়; রাজনীতির জায়গাটিও ইসলামসম্মত হতে হবে, তাহলে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এ সময়ের ধর্মভিত্তিক দলগুলোও এভাবেই ভাবে, কখনো কখনো তা প্রকাশ্যেও তারা বলে।
ফলে ধর্মীয় শক্তিকে বিলুপ্ত করা কঠিন। তবে গণতন্ত্রী বা সমাজতন্ত্রীরা যদি বাস্তবতার নিরিখে জনগণের সামনে উন্নততর চিন্তাধারা উপস্থাপন করতে পারে এবং তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলেই ধর্মীয় শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। তারা জনসমর্থন পাবে না। তা ছাড়া ‘আমরাই থাকব’, ‘ওদের বিলুপ্ত করতে হবে’— এ ধারণা সঠিক মনে হয় না, ইতিহাসের দিকে তাকালেও এটি সঠিক বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। একদিকে ধর্ম যেমন মানুষের মর্মগত বিষয়, অন্যদিকে ধর্ম অবলম্বন করে রাজনীতি চালিয়ে নিতে চাওয়া কিছু না কিছু লোক থেকেই যাবে।
বাংলাদেশের মানুষের যে সাংস্কৃতিক মূল ভিত্তি, তা কিন্তু অনেক শক্তিশালী। হাজার বছরের সেই ভিত্তিটা উপড়ে ফেলা এত সহজ নয়। সাময়িকভাবে মানুষকে উত্তেজিত করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না
এখন রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের প্রকাশ্য কোনো সম্পর্ক নেই ইউরোপে কিংবা আমেরিকায়। ধর্ম হলো গির্জায় আর ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু ইসলামে ধর্ম ও রাষ্ট্র একসঙ্গে, অবিচ্ছেদ্য। বলা হতো যে, ধর্ম যদি ব্যক্তিগত বিষয় হয় আর রাজনীতি যদি সমাজ-রাষ্ট্র চালায়, তবে তো ইসলাম এবং এই আধুনিক রাজনীতি হবে সাংঘর্ষিক। একসময় দ্বন্দ্ব হয়েছেও, কিন্তু ইসলামিস্টরা এটা মেনে নেয় না। তারা মনে করে, রাষ্ট্র ও ধর্ম একসঙ্গে।
এখন আমাদের দেশের রাজনীতিতে ইসলামিস্টদের এ ধারণাটা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে খুব আবেদন সৃষ্টি করে। কারণ তারা মনে করে, রাষ্ট্র যদি ইসলামিক হয় তাহলে চুরি, ডাকাতি, জেনা, ব্যভিচার এগুলো সব দূর হয়ে যাবে, সমাজ সুন্দর হবে। অথচ ইতিহাস বলে যে, ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্র এবং সমাজকে ভালো করা যায় না। মানুষের মধ্যে জাগিয়ে দিতে হয় নৈতিকবোধ। সেই নৈতিকবোধ ধর্ম দিয়ে একরকম জাগ্রত করা যায়, আবার জাগ্রত করা যায় যুক্তি-চিন্তা দিয়েও।
আমরা যদি শুধু ধর্ম দিয়ে মানুষকে নীতিবান করতে চাই, তাহলে তা হবে একদেশদর্শী এবং শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, যারা পরধর্মাবলম্বী কিংবা যুক্তি-চিন্তার ধারক, তাদের সহ্য করা হচ্ছে না। সহনশীলতা থাকবে না। আর সহনশীলতা না থাকলে সেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকতে পারে না।
বাংলাদেশে এখন ইসলামিস্টদের একটা জাগরণ দেখা যাচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ উঠছে মাথাচাড়া দিয়ে। ভারতে হিন্দুত্ববাদ, ইউরোপে উগ্র ডানপন্থি, যারা মূলত খ্রিস্টান মূল্যবোধের কথা বলে আর মুসলিম বিশ্বে তো আছেই। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে তারা রাজপথে সরব; কারণ, দীর্ঘদিন তারা কথা বলতে পারেনি।
তবে তারা মূলধারার শক্তি হতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে তাদের কাজের ওপর এবং যারা তথাকথিত গণতান্ত্রিক দল, যেমন— বিএনপি বা অন্যান্য যারা আছে তারা জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য, বিকল্প উপস্থাপন করতে পারে তার ওপর। জনগণ যদি দেখে যে, সাধারণ গণতান্ত্রিক দলগুলো ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তারা বিকল্প হিসেবে ইসলামভিত্তিক দলের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে। তবে ইসলামিস্টদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো— তাদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে তাদের চিন্তার সামঞ্জস্যের ঘাটতি।
গত কয়েক দশকের কথা যদি ধরি তাহলে দেখব যে, এখানে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ছিল সবচেয়ে বেশি অগ্রসর। তারা ইংরেজি শিক্ষা এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার সরাসরি বিরোধিতা করেনি। তা ছাড়া অন্য যেসব ইসলামভিত্তিক দল, সেগুলোর চিন্তাভাবনা অনেক দুর্বল। তাদের চিন্তারও অগ্রগতি নেই, দলেরও অগ্রগতি নেই। এমন অবস্থাও হতে পারে, জামায়াত শক্তি সঞ্চয় করে ক্ষমতায় চলে আসতে পারে; কিন্তু ক্ষমতায় এলেও তাদের দীর্ঘস্থায়ী ধারাবাহিকতা থাকবে না।
কারণ, তাদের যে চিন্তাভাবনা একটা পর্যায় পর্যন্ত অগ্রসর এবং সেটা কৌশলগত, তারা পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তা ছাড়া তাদের যে বাঙালিবিরোধী মনোভাব, সেটাও আসলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা। কারণ, যারা আত্মসমালোচনা করে না, তারাই প্রকৃত অপরাধী।
গণতন্ত্রীদের ব্যর্থতা ও দুর্বলতাই ধর্মীয় শক্তির পুনরুত্থানের মূল কারণ। এখানে গণতন্ত্রীরা মনে করেছেন, ধর্মীয় শক্তি ওদের কিছু করতে পারবে না এবং কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে পারবে না। আশির দশকে যে গণতন্ত্রীরা এসেছেন, তাদের কথা বলার প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। ধর্মীয় শক্তি জেগেছে আঘাত পেয়ে।
এমনিতে এরা ঘুমন্ত শক্তির মতো ছিল; কিন্তু যখন তাদের কথা বলা হয়েছে আক্রমণ করে, তখনই তারা নড়াচড়া করে উঠেছে। শেখ মুজিবের মতো নেতা এরকম কথাবার্তা বলতেন না। ভাসানীও ওইরকম কথাবার্তা বলেননি, কিন্তু আশির পরের গণতন্ত্রীরা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ।
হাসিনা, খালেদার আমলে তাদের দলের যারা নেতাকর্মী ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ কথা বলেছেন ধর্মের বিরুদ্ধে। সেগুলো খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা তেমন একটা চেষ্টা করেননি থামিয়ে রাখার। ‘ওরা বলছে বলুক না’— এরকম মনোভাব ছিল হাসিনার। আর ভোটের সময় এলে আবার ওদের সঙ্গে কিছু নেগোসিয়েশনের লাইন নিয়েছে। গণতন্ত্রীদের দ্বারা ইসলামিস্টরা যেভাবে নেগলেক্টেড হয়েছে, তার সব রাগ গিয়ে পড়েছে বামদের ওপর। কারণ, কমিউনিস্টরা যুক্তি দিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরোধিতা করেছে। এ জন্য তারা মূলত কমিউনিস্টদেরই টার্গেট করেছে প্রধান শত্রু হিসেবে।
অবশ্য মোটাদাগে ধর্মীয় শক্তিগুলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ সমর্থন করে না। বাঙালি শব্দটাই চায় না তারা মানতে। জাতীয়তাবাদ বলতে তারা স্বীকার করে মুসলিম জাতীয়তাবাদ, ইসলামি জাতীয়তাবাদকে। এর বাইরে অন্য কোনো জাতীয়তাবাদ তারা স্বীকার করে না। মুসলিম জাতীয়তাবাদ বা বাঙালি মুসলমানের জাতীয়তাবাদ বললে তারা বিরোধিতা করে না; কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ বললেই তারা বিরোধিতা করে। তবে পরিস্থিতির চাপে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে তারা স্বীকার করে মুখে মুখে।
একাত্তরে আমাদের মূল ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এখন যারা এ ভিত্তিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বা এগুলোকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো পরিচয় আনতে চাইছে সামনে, তারা আসলে তৈরি করছে একধরনের শূন্যতা।
২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় দলগুলো একটা জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছে তাদের কর্মী বাহিনী দিয়ে। তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সচেতন। তারা হয়তো সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে তারা নিজেদের পরিচয় এবং অস্তিত্বের প্রশ্নে আপস করবে না এবং করেওনি। বাংলাদেশের মানুষের যে সাংস্কৃতিক মূল ভিত্তি, তা কিন্তু অনেক শক্তিশালী। হাজার বছরের সেই ভিত্তিটা উপড়ে ফেলা এত সহজ নয়। সাময়িকভাবে মানুষকে উত্তেজিত করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না।
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় ধর্মকে উপেক্ষা করে কথাবার্তা বলার বাস্তবতা এখন নেই। তাতে সমর্থন পাওয়া যাবে না। ধর্মের প্রতি কোনোভাবেই অশ্রদ্ধা না করে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে হবে গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের। একটা জিনিস পরিষ্কার, আমরা চাই বা না চাই, ধর্মীয় শক্তি এই পৃথিবীতে এবং আমাদের বাংলাদেশেও থাকবে। তবে তারা কতটুকু প্রভাবশালী হবে, তা নির্ভর করবে যারা প্রগতিশীল বা গণতান্ত্রিক রাজনীতি করেন, তাদের সফলতার ওপর। এখন যে বিশৃঙ্খলাটা দেখা যাচ্ছে, এটা অনেকটা দীর্ঘদিনের চাপা পড়া ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ইতিহাস বলে, মানুষকে শেষ পর্যন্ত একটা যুক্তিবাদী এবং মানবিক ব্যবস্থার দিকেই ফিরে আসতে হয়।
লেখক-আবুল কাসেম ফজলুল হক : প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ













