কক্সবাংলা ডটকম :: বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহারের পর সদস্য দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়েছে ফিফা।
একই সঙ্গে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত এক সংকটকালীন বৈঠকে প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে সংস্থাটির নেতৃত্ব।
খবর রয়টার্স।
বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় গতকাল। এতে ইনফান্তিনোসহ মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম ও ফিফার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে ফিফা এক বিবৃতিতে জানায়, ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) সংক্রান্ত প্রস্তাবটি যেভাবে উপস্থাপন ও পরিচালনা করা হয়েছিল, তা ভিন্নভাবে করা উচিত ছিল।
ফিফা জানায়, ফিফা কাউন্সিলের সদস্য এবং ২১১টি সদস্য ফুটবল সংস্থার কাছে আলাদা চিঠি পাঠিয়ে ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
সংস্থাটি আরো বলেছে, প্রস্তাবটি যেহেতু প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাই এখন থেকে ফিফার সততা, সুশাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো ধরনের আক্রমণ বরদাশত করা হবে না। প্রয়োজনে সংস্থার সুনাম রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।
গত সপ্তাহে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দেয় ফিফা। পরিকল্পনা ছিল, ওই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হবে। এ অর্থ বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করার কথা ছিল।
প্রস্তাবটি শুরুতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে এতে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফাসহ বিভিন্ন পক্ষ ফিফার বিরুদ্ধে দুর্বল সুশাসন এবং সদস্যদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ না করার অভিযোগ তোলে।
২০১৬ সালে ফিফার সভাপতি হওয়ার পর এটিই ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও সমালোচকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। উয়েফা অভিযোগ করেছে, ইনফান্তিনো ‘ফুটবলের মূল চেতনা বিক্রি’ করতে চেয়েছেন এবং তার নেতৃত্বের ওপর আর আস্থা রাখে না।
এ বিতর্ক আগামী মার্চে মরক্কোয় অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদে পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনার ওপরও ছায়া ফেলেছে। দুই মাস আগেও তার পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে এরই মধ্যে কয়েকটি ইউরোপীয় ফুটবল ফেডারেশন তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।
এদিকে মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় পুরো ঘটনাকে ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ব্যক্তি, অস্থির সময় কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা আসে-যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও বিশ্ব ফুটবলের প্রতি অঙ্গীকার অটুট থাকে।
ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুরও গত সপ্তাহে বলেন, পরিকল্পনাটি ছিল ‘একজন ব্যক্তির প্রকল্প’ এবং এ নিয়ে কর্মীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো এ ঘটনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন। ফিফার বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়ন বিভাগের প্রধান আর্সেন ভেঙ্গার জানান, প্রস্তাবটি তৈরির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না এবং এটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ‘একেবারেই প্রয়োজনীয়’ ছিল।
ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন সাবেক পর্তুগিজ তারকা লুইস ফিগো। আর উয়েফার সহসভাপতি লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেছেন, এই বিতর্ক ফিফা সভাপতির নেতৃত্বকে চরম সংকটে ফেলেছে।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ইনফান্তিনো গত এক সপ্তাহ ধরে মরক্কোতে অবস্থান করছেন। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ মরক্কোর ফুটবল ফেডারেশন এরই মধ্যে তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে।
এই বৈঠককে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জোরদার এবং আগামী মার্চের নির্বাচন পর্যন্ত তার অবস্থান শক্ত রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, অন্তত ৪৩টি সদস্য সংস্থা লিখিতভাবে দাবি জানালে একটি বিশেষ কংগ্রেস ডাকা যেতে পারে।
এদিকে কাতার, কুয়েত, লেবানন, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। আফ্রিকার অনেক ফুটবল প্রশাসকও তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যদিও আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি।
ইউরোপিয়ান লিগস ইউরোপের ১ হাজার ৩০০টির বেশি ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা বলেছে, ফিফাকে আর একতরফাভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া যায় না, এটি ক্লাব, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তারা ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৪৮ থেকে ৬৪-এ বাড়ানোর প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য মাত্র চার সপ্তাহ সময় দেয়ারও সমালোচনা করেছে।
সব বিতর্কের মধ্যেও ইনফান্তিনোর একটি বড় সুবিধা হলো, আগামী মার্চের নির্বাচনে এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী প্রার্থী সামনে আসেননি।
তবে জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন অভিযোগ করেছেন, ইনফান্তিনোকে সমর্থন দিলে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে ফিফা ‘চাপ’ সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ‘আগেও আমরা তাকে সমর্থন করিনি, এখনো করব না।’
অন্যদিকে, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজনের বিষয়ে ইনফান্তিনো কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—এমন খবরও নাকচ করেছে ফিফা। সংস্থার একজন মুখপাত্র বলেন, এ ধরনের দাবি ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’ এবং যথাসময়ে ফিফাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।














