বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজারে মাদক চোরাচালান বন্ধে শিগগিরই জেলার শীর্ষ মাদক কারবারি, গডফাদার ও তাদের সহযোগীদের তালিকা হালনাগাদ করা হবে।
তালিকা তৈরির পর চিহ্নিত মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের হিল ডাউন সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে একই স্থানে অনুষ্ঠিত জেলা মাদক প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নসংক্রান্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সভায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, জেলা প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক চোরাচালানের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে দেশে প্রবেশ করা মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে বিশেষ করে তরুণ সমাজের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘মাদক চোরাচালান রোধে শিগগিরই শীর্ষ মাদক চোরাচালানকারী, গডফাদার ও সহযোগীদের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও বাড়বে নজরদারি
সভায় উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরকে ঘিরে মাদক চোরাচালানের অভিযোগ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আশ্রয়শিবিরের ভেতরে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো পুনঃস্থাপন ও কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ক্যাম্পের প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং মাদক পাচারের সম্ভাব্য রুটগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
সীমান্তবর্তী উখিয়া-টেকনাফের যেসব এলাকা দিয়ে মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থানে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প বা চৌকি স্থাপনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সীমান্ত, পাহাড়ি এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থলপথের পাশাপাশি সাগর-নদীপথেও কঠোর নজরদারি
কক্সবাজারের মাদক পাচারের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো স্থলপথের পাশাপাশি সমুদ্র ও নদীপথের ব্যবহার। এ কারণে নৌপথে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিশেষ করে নাফ নদী, উপকূলীয় এলাকা এবং সীমান্তসংলগ্ন নৌপথে নজরদারি বাড়ানো হবে। পাশাপাশি মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংস্কারের বিষয়েও বৈঠকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এসেছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জেলা টাস্কফোর্স কমিটির মাদক নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তগুলোও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মাদক ও অপহরণ চক্রের যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে
সভায় কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানান।
বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বাহারছড়ার পাহাড়ে মানুষ অপহরণ, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। আমরা জেনেছি, অপহরণের সঙ্গে মাদক চোরাকারবারিদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। হয়তো লেনদেনের বিষয়ও থাকতে পারে।’
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পৃথক ক্যাম্প স্থাপন করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপহরণ ও সশস্ত্র অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সমন্বিত অভিযানের ওপর জোর
কক্সবাজারের মাদক পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পৃথক অভিযান নয়, সব আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সভায়।
সীমান্তে বিজিবির নজরদারি, সমুদ্র ও নদীপথে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল, স্থলভাগে পুলিশ-র্যাবের অভিযান এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদক কারবারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের মতে, মাদক চোরাচালানের মূল হোতাদের শনাক্ত করা এবং তাদের অর্থ ও সহযোগী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া গেলে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মাদক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত করা সম্ভব হবে।
দুই দিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে রাত ৮টার দিকে তিনি হিল ডাউন সার্কিট হাউসের সভায় যোগ দেন।
সেখানে জেলা মাদক প্রতিরোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।














