কক্সবাংলা ডটকম(১২ আগস্ট) :: চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানিতে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কমানো হলেও বাজারে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জুনের শেষার্ধ ও জুলাইয়ে দেশের পাইকারি বাজারে নিত্যপণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও আগস্টের শুরু থেকেই প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়া, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বুকিং দর বেড়ে যাওয়া এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের পাইকারি বাজারে। আর পাইকারিতে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুচরা বাজারেও নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
চলতি বছরের জুনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় সরকার প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানিতে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। ব্যবসায়ীদের মতে, অগ্রিম আয়কর কমানোর ফলে আমদানিকারকদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমার কথা এবং এর সুফল ভোক্তাদের পাওয়ার কথা ছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন-পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই সুবিধা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অগ্রিম আয়করসহ আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় পণ্যের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে। ফলে বাজেটে এআইটি কমানোর কারণে ব্যবসায়ীদের আর্থিক সাশ্রয় হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত ৮ থেকে ১০ দিনে গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মোটা মসুর, বিভিন্ন মসলা, রসুন ও পেঁয়াজসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেড় মাস আগেও পাইকারি বাজারে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) পাম অয়েলের দাম ছিল ৬ হাজার ২৫০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা। বর্তমানে একই মানের খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ টাকায়। সুপার পাম অয়েলের দামও ১০০ থেকে ১২০ টাকা বেড়ে প্রতি মণ ৬ হাজার ৫৫০ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৫০ টাকা; বর্তমানে প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৪০০ টাকায়।

ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে ভোজ্যতেলের বুকিং দর কিছুটা বেড়েছে। সরকারিভাবে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় না করা হলেও এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে।
চিনির বাজারেও দেখা দিয়েছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। দীর্ঘদিন চাহিদা কম থাকায় প্রতি মণ চিনি ৩ হাজার ৪৫০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩ হাজার ৬৬০ টাকায় উঠেছে। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারিতে চিনির দাম বেড়েছে প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা।
এদিকে কয়েক মাস ধরে প্রতি মণ গমের দাম ১ হাজার ২৮০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে ছিল। গত দুই সপ্তাহে তা বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। সর্বশেষ কয়েক দিনে প্রতি মণ গম ১ হাজার ৪৩০ থেকে ১ হাজার ৪৩৫ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। গমের দাম বাড়ায় ফ্লাওয়ার মিলগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে আটা ও ময়দার দামও কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশ্ববাজারেও গমের দামে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক খাদ্যশস্যের বাজারে অস্থিরতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে সংঘাত তীব্র হওয়ায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য রফতানির ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলে বিশ্বের মোট গমের চাহিদার প্রায় ২৮ শতাংশ সরবরাহ করে। ফলে এ দুই দেশের সংঘাত দীর্ঘায়িত বা তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে গম উত্তোলন মৌসুম শুরু হওয়ায় রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় অনেক দেশ বিকল্প উৎস থেকে আগাম গমের বুকিং নিশ্চিত করতে চাইছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বিশ্ববাজারে গমের দাম বাড়ার এক মাসও হয়নি। কিন্তু দেশে গম আমদানি করতে কয়েক মাস সময় লাগে। এর মধ্যেই দেশের বাজারে গমের পাশাপাশি আটা-ময়দার দাম বেড়ে গেছে। বর্ষাকালে শাকসবজির সরবরাহ কমে গেলে ডালজাতীয় খাদ্যের চাহিদা বাড়ে। সরকার বাজেটে খাদ্যপণ্য আমদানিতে সুবিধা দেওয়ায় কিছুদিন বাজার স্থিতিশীল ছিল। এখন যুদ্ধ ও চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে আমদানিকারক ও পাইকারি পর্যায়ে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, গমের দাম বাড়ায় দেশের বাজারে আটা-ময়দার দামও বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের আটা-ময়দার দাম ৪ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা সাদা আটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, প্যাকেটজাত আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, খোলা ময়দা প্রায় ৬০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৬৫ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানেও আটা-ময়দার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মধ্যে খোলা আটার দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, প্যাকেটজাত আটার দাম ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, খোলা ময়দার দাম ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
টিসিবির সহকারী পরিচালক (মার্কেট ডেটা) শতদল মণ্ডল বলেন, টিসিবি নিয়মিত প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। কোনো পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে, সে বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) লেনদেন হওয়া এসআরডব্লিউ গমের ফিউচার দরও ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে প্রতি বুশেল (২৭ দশমিক ২২ কেজি) গমের দাম প্রায় ৬ দশমিক ৮১ মার্কিন ডলার। সেপ্টেম্বর সরবরাহের গমের ফিউচার দর ৬ দশমিক ৫৯ ডলার, ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ৭৬ ডলার, ২০২৭ সালের মার্চে ৬ দশমিক ৯১ ডলার এবং মে মাসে ৬ দশমিক ৯৮ ডলারে উঠেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে গম উত্তোলন মৌসুম চললেও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার পরিবর্তে বেড়েছে। ফিউচার মার্কেটে গমের দাম দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি বাজারেও পড়তে পারে।
খাদ্যশস্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের উৎপাদিত গম বিশ্ববাজারের মোট চাহিদার এক-চতুর্থাংশের বেশি সরবরাহ করে। যুদ্ধ শুরুর পর বিভিন্ন কৌশলে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হলেও নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য রফতানি ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে শিপিং চার্জ ও বিমা ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সংকটও বৈশ্বিক খাদ্যশস্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে গমের পাশাপাশি ভুট্টা ও ডালজাতীয় খাদ্যপণ্যের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি বুশেল গমের দাম ৫ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৬ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে মে মাস থেকে উৎপাদনকারী দেশগুলোতে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা, শুষ্ক আবহাওয়া এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে রফতানি ঝুঁকি বাড়তে থাকে। জুনে দাম আরও বাড়ে। জুলাইয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত তীব্র হলে গমের আন্তর্জাতিক বাজার দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, বিশ্ববাজারে গমের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে প্রতি টন ২৬০ ডলারে যে গম কেনা হয়েছিল, বর্তমানে একই পণ্যের দাম বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এ মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি আমদানিকারকদের ফ্রেইট খরচও বেড়েছে। বিশ্বের খাদ্যশস্য সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় এ অঞ্চলের সংঘাত আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে বাজেটে নিত্যপণ্যের আমদানিতে কর সুবিধা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে বাজার স্থিতিশীল হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বাড়ায় ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে পাইকারি বাজারের এ চাপ দ্রুত খুচরা বাজারে আরও বিস্তৃত হলে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।













