কক্সবাংলা ডটকম(৭ জানুয়ারি) :: যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনের ক্ষেত্রে ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানতের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এ তালিকায় বাংলাদেশসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নাম যুক্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভিসা বন্ডের নতুন তালিকা প্রকাশ করে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড বাড়ানোর তথ্য জানানো হয়।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভিসা বন্ডের সর্বোচ্চ পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২২.৩১ টাকা হিসাবে)।
ভিসা বন্ড কী
ভিসা বন্ড মূলত একটি আর্থিক জামানত ব্যবস্থা।
নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে সাময়িক ভিসা দেওয়ার আগে এই জামানত নেওয়া হয়, যাতে তারা ভিসার শর্ত—বিশেষ করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দেশ ত্যাগ—যথাযথভাবে পালন করেন।
প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী, পর্যটক ও কর্মী অস্থায়ী নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় প্রবেশ করেন।
এসব ভিসার মেয়াদ কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে।
কোনো নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাধারী যদি অনুমোদিত সময় অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন, তবে সেটিকে ভিসা ওভারস্টে হিসেবে ধরা হয়।
অধিকাংশ দেশ ভিসা আবেদনের সময় আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ চাইলেও ফেরতযোগ্য জামানতের বিনিময়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার নিয়ম চালু করেনি।
একসময় নিউজিল্যান্ড ওভারস্টে কমাতে ভিসা বন্ড ব্যবস্থা চালু করেছিল, তবে পরে তা বাতিল করা হয়।
একইভাবে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্য কিছু তথাকথিত ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা বন্ড চালুর পরিকল্পনা নিলেও শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
কাদের জামানত দিতে হবে
বাংলাদেশি কেউ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য এই দুই ধরনের ভিসার আবেদন করলে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে ভিসা বন্ড নীতির আওতায় পড়বেন।
যখন কেউ বি১/বি২ ভিসা পাওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হবেন তখন তাদের জামানত হিসেবে ৫ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১৫ হাজার ডলার জমা দিতে হবে।
কাকে কত ডলার জামানত দিতে হবে তা নির্ধারিত হবে ভিসা সাক্ষাৎকারের সময়।
বুধবার দুপুরে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৩১ পয়সা।
সে হিসেবে কারও ১৫ হাজার ডলার জামানত ধার্য হলে জমা দিতে হবে প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে ভিসা বন্ড নীতির আওতাভুক্ত দেশের তালিকা।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘স্টাডি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ’ ক্যাটাগরির তথ্য অনুযায়ী, পড়াশোনার জন্য কেউ যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইলে ভিসার ধরন হয় ‘এফ’ বা ‘এম’।
ভিসা বন্ড সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দুই ধরনের ভিসার কথা উল্লেখ নেই। অর্থ্যাৎ, শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনকারীরা জামানত দেওয়ার বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়বেন না।
ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের একটি সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কেন জামানতের বাধ্যবাধকতা
গত বছরের ১৬ জুলাই মার্কিন কংগ্রেসে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই প্রতিবেদন তাদের ওয়েবসাইটেও আছে।
এর পরের মাসেই (আগস্ট) কয়েকটি দেশের তালিকা প্রকাশ করে স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
তখন বলা হয়, তালিকাভুক্ত দেশের পাসপোর্টধারীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর ভিসার মেয়াদ শেষেও দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান (ওভারস্টে) করেন।
এই উচ্চ হার কমানোর লক্ষ্যে ভিসা বন্ড বা জামানত আদায় করা হবে। প্রাথমিকভাবে তখন বি১ ও বি২ ধরনের ভিসাকে এই নিয়মের আওতায় আনা হয়।
মঙ্গলবার নতুন করে যেসব দেশ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে, সেগুলোর পাসপোর্টধারীদেরও যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত সময় বসবাসের হার বেশি।
বাংলাদেশসহ বর্তমানে তালিকাভুক্ত দেশের সংখ্যা ৩৮টি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আছে ভুটান ও নেপাল। বাকিগুলো আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের।
বাংলাদেশ কেন তালিকায়
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ওভারস্টের হার সবচেয়ে বেশি ব্যবসা ও ভ্রমণ ভিসাধারীদের।
ধারণা করা হচ্ছে, এই দিকটি বিবেচনায় বাংলাদেশকে ভিসা বন্ড নীতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গত বছর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ উচ্চ হারের ওভারস্টে সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেটির তথ্য ২০২৪ অর্থবছরের।
সেখানে বলা হয়, ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৮ হাজার ৫৯০ বাংলাদেশি বি১/বি২ ভিসাধারীদের প্রস্থানের কথা ছিল।
তাদের মধ্যে ২ হাজার ১৬২ জনের প্রস্থানের কোনো তথ্য নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া ৫১ জন অন্য দেশে চলে গেছেন। মোট ওভারস্টে ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
এই ধরনের ভিসা নিয়ে ২০২৩ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৪১ বাংলাদেশির প্রস্থানের কথা থাকলেও মোট ওভারস্টের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৯৩ জন।

যুক্তরাষ্ট্রে ওভারস্টে নিয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য।
ব্যবসা বা ভ্রমণ ভিসায় সবচেয়ে বেশি ওভারস্টের হার মিয়ানমারের ৩৮ দশমিক ১৫। কিন্তু তাদের প্রত্যাশিত প্রস্থানকারীদের সংখ্যা কম- ৫ হাজার ৪৫৫। ওভারস্টে করেন ২ হাজার ৮১ জন।
ভিসা বন্ড তালিকাভুক্ত দেশে তাদের নাম নেই।
একই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা নন-ইমিগ্র্যান্ট (অস্থায়ী অভিবাসী) বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটরদের (এফ, এম, জে ভিসাধারী) ওভারস্টের মোট হার ছিল ৯ দশমিক ০৯।
সাত হাজার ৪১৩ জনের প্রস্থানের কথা থাকলেও সন্দেহভাজন বসবাসকারী ছিল ৬১১ জন। অন্যান্য ধরনের ভিসাধারীদের মধ্যে সন্দেহভাজন বসবাসকারী ছিল ৮৭ জন।
জামানত দিলেই কি ভিসা মিলবে
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, বন্ড জমা দিলেই ভিসা মিলবে এমন নিশ্চয়তা নেই। যদি কোনো কারণে কারও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদন প্রত্যাখান হয় তাহলে বন্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এবং ওই ব্যক্তি অর্থ ফেরত পাবেন।
ভিসা পাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ না করলে কিংবা নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে দেশটি থেকে চলে এলেও জামানত ফেরত দেওয়া হবে।
তবে কেউ কনস্যুলার অফিসারের নির্দেশ ছাড়া জামানত জমা দিলে তা ফেরত পাওয়া যাবে না।
ভিসা আবেদনকারীকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ফর্ম আই-৩৫২ জমা দিতে হবে।
শর্ত মেনে বন্ডের অর্থ জমা দিতে হবে ডিপার্টমেন্ট অব দ্য ট্রেজারির অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পে ডট জিওভি (Pay.gov) ব্যবহার করে। তৃতীয় পক্ষের কোনো ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যাবে না।
বন্ডের মাধ্যমে ভিসা পাওয়া ব্যক্তিরা কেবল তিনটি বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে পারবেন।
সেগুলো হলো- ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এবং ওয়াশিংটনের ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
এগুলোর বাইরে অন্য কোনো বিমানবন্দর ব্যবহারের চেষ্টা করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।













