কক্সবাংলা ডটকম(৫ মার্চ) :: ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বিমান হামলা বন্ধ এবং যে কোনো ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য কংগ্রেসের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে আনা একটি দ্বিপক্ষীয় প্রস্তাব রিপাবলিকানরা ভোটাভুটির মাধ্যমে আটকে দিয়েছেন।
৫৩-৪৭ ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবটি মূলত দলীয় লাইনেই বিভক্ত ছিল।
মার্কিন সিনেটের রিপাবলিকান সদস্যরা বুধবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান অভিমুখী সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বিমান হামলা বন্ধ এবং যে কোনো ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য কংগ্রেসের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে আনা একটি দ্বিপক্ষীয় প্রস্তাব তারা ভোটাভুটির মাধ্যমে আটকে দিয়েছেন।
৫৩-৪৭ ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবটি মূলত দলীয় লাইনেই বিভক্ত ছিল, যেখানে মাত্র একজন রিপাবলিকান বাদে বাকি সবাই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন এবং একজন ডেমোক্র্যাট বাদে অন্য সবাই এটি সমর্থনের পক্ষে ছিলেন।
খবর রয়টার্স।
এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা আর পাল্টা হামলার মধ্যেই এবার নতুন মোড় হয়ে সামনে এল বিরোধী কুর্দি বাহিনীর সঙ্গে মার্কিনদের আলোচনার তথ্য।
একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে বলছে, ইরানকে অস্থিতিশীল করতে এবং দেশটিতে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ উসকে দিতে কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানকে অস্থিতিশীল করার যে পরিকল্পনা ওয়াশিংটন বাস্তবায়ন করছে, কুর্দিরা তাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের বরাতে কাতারভিত্তিক বার্তা সংস্থা আল জাজিরা গতকাল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, অস্ত্র দেয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
তবে গতকাল পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে কিছু জানানো হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সম্প্রতি ইরাকি কুর্দিস্তানের রাজধানী এরবিলে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুর্দি নেতাদের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে তেহরানের বিরোধিতা করে আসছে কুর্দি বিদ্রোহীরা। তারা মূলত ইরাক-ইরান সীমান্ত এলাকাগুলোয় নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এখন পর্যন্ত ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশসহ অন্য পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোয় অসংখ্য হামলাও চালিয়েছে তারা।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত কয়েক দশকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচক সরকারগুলোকে বিপদে ফেলতে কিংবা উৎখাত করতে বিশ্বের অসংখ্য দেশে বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।
ইরাকে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও তাদের কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ। এছাড়া সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদবিরোধী যুদ্ধেও কুর্দি যোদ্ধাদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে ওয়াশিংটন।

যুক্তরাজ্যের বার্তা সংস্থা আইটিভি জানিয়েছে, গত বছর যুদ্ধের পর পশ্চিম ইরানে হাজার হাজার কুর্দি স্বেচ্ছাসেবীকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত করেছে ওয়াশিংটন।
ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এ বাহিনী কয়েকদিনের মধ্যে ইরানে স্থল অভিযান শুরু করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্দেশ্য সামনে রেখেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পশ্চিম ইরানের নিরাপত্তা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।
তাদের লক্ষ্য, ইরানের সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা দুর্বল করা এবং স্থল অভিযানের সক্ষমতা বাড়ানো।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, গত সপ্তাহের শেষ দিকে উত্তর ইরাকের ইরানি ও ইরাকি কুর্দি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এতে ইরানে স্থল অভিযান ও সশস্ত্র বিদ্রোহের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে আলোচনায় যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদের কেউ এ বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানাননি।
যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানে তাদের লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করছে, এর প্রমাণ মেলে হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটের বক্তব্যে।
তিনি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে এবং ইরানি প্রভাব দমন করতে বহু আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
আর মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেয়ার অনুরোধ বিবেচনা করছেন।
ট্রাম্প নিজেও এ-সম্পর্কিত ওয়াশিংটন পোস্টের একটি মতামত নিজের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে শেয়ার করেছেন।
বিশ্লেষণধর্মী ওই লেখায় বলা হয়েছে, মার্কিন সেনাদের স্থল অভিযান চালানোর প্রয়োজন নেই, কারণ ইরানিরা নিজেরাই ‘পায়ের ভূমিকায় থাকবে’ অর্থাৎ স্থল অভিযান পরিচালনা করবে।
এদিকে কুর্দি সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমগুলো এও বলছে, যখন এ স্থল অভিযান শুরু হবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বিমান সহায়তা দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন সে প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কিনা তা জানা যায়নি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষক নিল কুইলিয়ান আল জাজিরাকে বলেন, স্বভাবতই এটিকে ভুল পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এটি ইরানের অভ্যন্তরে আরো বেশি সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।
তার মতে, এ যুদ্ধে কুর্দিদের যুক্ত করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি অপরিপক্ব চিন্তা। বৃহত্তর কোনো লক্ষ্য অর্জনের মূল পরিকল্পনায় এর কোনো উল্লেখ ছিল না।
এটি প্রমাণ করে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি খুব একটা ভেবেচিন্তে করা হয়নি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কুর্দিরা ট্রাম্পের এ প্রস্তাবে রাজি হওয়া নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ দীর্ঘ ইতিহাস।
১৯৭৫ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের সময় থেকে শুরু করে সম্প্রতি সিরিয়ার কুর্দিদের (এসডিএফ) ওপর আসাদ বাহিনীর হামলা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বারবার তাদের বিপদে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিওপোল ল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা রামজি মারদিনি বলেন, কুর্দি নেতারা মার্কিন নেতাদের প্রতিশ্রুতিকে যদি ধ্রুব সত্য বলে মনে করেন, তাহলে তারা ভুল করছেন।
বর্তমান মার্কিন জনমত এ যুদ্ধের পক্ষে নেই, যা কুর্দিদের জন্য বড় সংকেত হওয়া উচিত।
কুর্দিদের এ বিদ্রোহ উসকে দিলে তেহরানের পাশাপাশি বাগদাদ ও আঙ্কারাও ক্ষুব্ধ হতে পারে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তারা ইরানের পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। বিশেষ করে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী পিজেএকে যদি আবারো লড়াই শুরু করে, তবে তুরস্ক নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে।
বিষয়টি নিয়ে ইরাকি কুর্দি নেতারাও বেশ চিন্তিত। তাদের মতে, তারা যদি ইরানবিরোধী তৎপরতায় সরাসরি অংশ নেন, তবে তেহরান সরাসরি তাদের ওপর আঘাত হানবে।
বিশেষ করে খোর মোর গ্যাস ক্ষেত্রের ওপর হামলার ঝুঁকি রয়েছে, যা ওই অঞ্চলের বিদ্যুতের প্রধান উৎস।
ইতালির রোমভিত্তিক গবেষক মারিয়া ফান্তাপ্পি বলেন, ইরাকি কুর্দি নেতারা তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে এখন অনেক বেশি সতর্ক।
এ মুহূর্তে বৃহত্তর কুর্দিস্তানের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার চেয়ে তারা নিজেদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।














