শুক্রবার ১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আঞ্চলিক স্বার্থে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ : তৎপর বাংলাদেশ

🗓 শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

👁️ ১৬ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

👁️ ১৬ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১ মে) ::ভারত-পাকিস্তান দুই নিকটতম প্রতিবেশীর বৈরিতায় গত এক যুগ ধরে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা সার্কের (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের আঞ্চলিক স্বার্থে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা খুবই জটিল এবং কঠিন। সময়ই বলে দেবে যে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিগত ২০১৪ সালের পর সার্কের শীর্ষ সম্মেলন না হওয়ায় সংস্থাটি অনেকাংশে স্থবির। বিগত দিনগুলোতে এবং বর্তমানেও নেপাল চেয়ার হিসেবে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও সম্প্রতি সার্ক পুনরুজ্জীবনের ওপর জোর দিয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তাদের ইশতাহেরও সার্ক পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা দিয়েছে এবং এরই মধ্যে একাধিক আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মেও এই ঘোষণা দিয়েছে।

ঢাকার কূটনীতিকরা নীরবে এই ইস্যুতে কাজ করে যাচ্ছেন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে তাদের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার এই সংস্থাটি পুনরুজ্জীবিত করা বিষয়ে আলাপ করেছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে বাংলাদেশ সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করে কাজে লাগাতে চায়। যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় চলমান থাকে শান্তি ও সমৃদ্ধির সুবাতাস।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বার্ষিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হওয়া সম্ভব। যেখানে বর্তমানে এই সংস্থাটির আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ২৩ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে বাংলাদেশ চায় যে অব্যবহৃত ৪৪ বিলিয়ন ডলারকে বাস্তবে কাজে লাগাতে, যাতে এই অঞ্চলের মানুষের উপকার হয়।

অন্যদিকে জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন এবং সার্কের গবেষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনার পরিমাণ ১৭০ বিলিয়ন ডলার।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক এই সংস্থাটির সনদ অনুসারে, এর প্রধান উদ্দেশ্য দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। যৌথ আত্মনির্ভরশীলতা জোরদার করা। পারস্পরিক আস্থা, বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে সক্রিয় সহযোগিতা।

এ ছাড়া সার্ক সনদের অন্যতম নীতি অনুযায়ী, এই সংস্থাটি দ্বিপক্ষীয় বিতর্কিত ইস্যু এড়িয়ে চলে। সার্কের বর্তমান চেয়ারম্যান নেপাল। সার্কের চেয়ারম্যানশিপ সাধারণত শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনকারী দেশের প্রধানমন্ত্রী/রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে থাকে।

কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় (১৮তম সম্মেলন নেপালে হয়েছিল এবং ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন গত ২০১৬ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ওই বছর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার উচ্চ কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সীমান্ত সন্ত্রাসবাদজনিত পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত হয়) নেপাল এখনও চেয়ারম্যানশিপ ধরে রেখেছে। মূলত নেপালের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে এই চেয়ারম্যানশিপের প্রতীকী নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ঢাকার কূটনীতিকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বড় দুইটি রাষ্ট্রের মধ্যে অমিল থাকায় সার্ক পূর্ণ মাত্রায় সচল না। কিন্তু সার্কের শীর্ষ সম্মেলন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ছাড়া বাকি কাজগুলো কমবেশি হচ্ছে।

সার্কের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন ২০১৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ২০১৬ সালে নেপালের পোখারায় এবং সার্কের স্ট্যান্ডিং কমিটির (পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের) বৈঠক ২০১৬ সালে নেপালের পোখারায় অনুষ্ঠিত হয়। শীর্ষ সম্মেলন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক ছাড়াও সার্কের স্ট্রাকচারে আরও ৪ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের বৈঠক কথা বলা আছে।

শীর্ষ সম্মেলন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক ছাড়াও সার্কের স্ট্রাকচার অনুযায়ী, বাকি কর্মকাণ্ডগুলো চলমান। যেমন গত ২৯ এপ্রিল ঢাকায় সার্কের কৃষি বিষয়ক ‘ডেভেলপমেন্ট পার্টনারস অ্যান্ড ইনভেস্টরস’ শীর্ষক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, সার্ককে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। কৃষি এ অঞ্চলের অর্থনীতির মূলভিত্তি এবং এর টেকসই উন্নয়নে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ব্যাপারে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবন্ধ। তারই অংশ হিসাবে সার্কের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

মালদ্বীপের মালেতে দ্বিতীয় সার্ক ইন্টার-গভর্নমেন্টাল এক্সপার্ট গ্রুপ মিটিং অন পোভার্টি অ্যালিভিয়েশন শীর্ষক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকটি সার্কের সদস্য দেশ মালদ্বীপ হোস্ট করে এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয়। সভা শেষে একটি প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়। এই বৈঠকে প্রথমবারের মতো ‘শেপিং দ্য ফিউচার টুগেদার ফর এ রিজিলিয়েন্ট সার্ক’ শীর্ষক সার্ক ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট (এসডিআর ২০২৫) চূড়ান্ত করা হয়। খুব শিগগির এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে সার্কের প্রোগ্রামিং কমিটির ৬২তম বৈঠক নেপালের চেয়ারম্যানশিপে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ২০২৬ সালের সার্ক সেক্রেটারিয়েটের বাজেট, কার্যক্রমের ক্যালেন্ডার অনুমোদন এবং ভবিষ্যৎ বৈঠকের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে সংস্থাটির মহাসচিব মো. গোলাম সরওয়ার সার্ককে আরও গতিশীল করার আহ্বান জানান।

এ ছাড়া গত বছরের ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিলে নেপালে সার্কের প্রোগ্রামিং কমিটির (যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিব বা মহাপরিচালক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শীর্ষ সম্মেলন না হলেও সার্কের যে বার্ষিক চাঁদা দেওয়ার নিয়ম সদস্য রাষ্ট্রগুলো তা নিয়মিত পরিশোধ করছেন। সার্ক সচিবালয় নেপালে অবস্থিত।

এর বাইরে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতে সার্কের ৫টি আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত সার্কের এনার্জি কেন্দ্র বাদে বাকি কেন্দ্রগুলোর কর্মকাণ্ড চলছে। ইসলামাবাদে অবস্থিত সার্কের এনার্জি কেন্দ্র নিয়ে ভারতের আপত্তি থাকায় তা থমকে আছে।

ঢাকার কূটনীতিকরা আরও বলছেন, সার্ককে যদি যথাযথভাবে সচল রাখা যেত তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী হতো। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিও অনেক ভালো হতো। বর্তমান বৈশ্বিক যুগে ক্ষমতাধর দেশগুলোর যে দাপট, সেখানে সার্ক সচল থাকলে এই আঞ্চলিক সংগঠন সহজেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ এশিয়ার পক্ষে একটা শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারত। অথচ ভারত-পাকিস্তান দুই দেশের বৈরিতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার গোটা অঞ্চলকেই এর দায় বহন করতে হচ্ছে।

পাকিস্তানের এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগের একজন কূটনীতিক বলেন, ২০২৬ সালে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। যা এখনও বাকি আছে। সবার আগে ইসলামাবাদের ডিউ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে হবে। তারপর সার্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।

ভারতের সাউথ ব্লকের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানান, পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। তাদের সঙ্গে কীভাবে পথচলা সম্ভব। ভারত সন্ত্রাস ইস্যুতে জিরো টলারেন্সে বিশ্বাস করে। পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি সম্ভব নয় বলেই ভারত বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন) গঠন করেছে এবং এই সংস্থাকেই দিল্লি এগিয়ে নিতে চায়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, সার্ক একটা নন-স্টার্টার। সার্ক অঞ্চলের দেশগুলো নিজ নিজ পররাষ্ট্রনীতিতে এত বিচিত্র পথ অবলম্বন করছে যে এখানে নিজেদের মধ্যে মিলিতভাবে আঞ্চলিক কোনো মোর্চা করে অগ্রসর হওয়া কঠিন। বর্তমান সরকার হয় এসব না বুঝেশুনে করছে, নয় অন্য দেশগুলোকে বিব্রত করতে করছে।

উভয় ক্ষেত্রে নিজেকে খেলো করা ছাড়া ভিন্ন কোনো ফায়দা নেই। আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে ওঠে এবং ফলপ্রসূ হয় যখন ওই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক থাকে, নেতৃত্বের মধ্যে আস্থা ও শ্রদ্ধা থাকে এবং সম্মিলিতভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় থাকে, দর্শন থাকে। সার্ক অঞ্চলে এসবের কোনোটিই নেই। ফলে সরকারের অ্যাজেন্ডা বালখিল্য মাত্র।

ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রাধা দত্ত বলেন, এখন সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। এর আওতায় সাব-রিজিওনাল কার্যক্রমগুলো চলতে পারে। কিন্তু শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার মতো কোনো উপাদান এখন এই অঞ্চলের রাজনীতিতে বিদ্যমান নেই। কেননা সার্কের দুই প্রভাবশীল রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে কোনো ফরমেটেই কোনো সংলাপ বা আলোচনায় বসে না। যেমন ভারত ও চীনের মধ্যে বৈরিতা থাকলেও এই দুই দেশ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপ করে।

কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একেবারেই সংলাপ বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে শীর্ষ সম্মেলন বা সার্ক পুনরুজ্জীবন সম্ভব না। সার্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বাবার মূল অবদান ছিল, সে জন্য হয়তো বাংলাদেশ এখন সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হবে তা জানি না বলেও এ সময় উল্লেখ করেন তিনি।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর