বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রিটিশ কূটনীতিকদের চোখে ১৯৭১-এর মার্চ

🗓 শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

👁️ ২২৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

👁️ ২২৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৬ মার্চ) :: পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাতদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে নিজ রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে ‘মূল বিষয় হলো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও তার উপদেষ্টারা বিশ্বাস করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের দায়িত্ব এবং তা তাদের ক্ষমতার মধ্যেই আছে। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।’

তার বাস্তববাদী উপসংহার ছিল, ‘এই পর্যায়ে তাদের অন্যভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা সম্পূর্ণ নিষ্ফল হবে এবং এটি আমাদের (ব্রিটিশ) স্বার্থের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।’ ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষা পাবে যদি প্রধানমন্ত্রী থেকে ‘বোঝাপড়ার একটি ব্যক্তিগত বার্তা’ পাঠানো হয়।

শেষ পর্যন্ত পিকার্ড নিজেই সেই বার্তার খসড়া তৈরি করেন, যা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে পাঠান। সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে তাদের চা বাগান ও পাট উৎপাদনের ব্যবসা আছে।

তবে পাকিস্তানের আসন্ন সরকারি সহিংসতার বিষয়টি হাইকমিশনারের অজানা ছিল না। তাদের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের বিশেষজ্ঞরা মার্চের শুরুতেই সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি অনুমান করেছিলেন যে ‘স্বল্পমেয়াদে (ইয়াহিয়া খান) ও সেনাবাহিনী ব্যাপক রক্তপাত ঘটিয়ে কিছু সময়ের জন্য পূর্বাঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, কিন্তু তারা এ অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে ধ্বংস করার চেষ্টা ব্যর্থ হবেই।’

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২৫ মার্চের সেনা অভিযানের আগেই আওয়ামী লীগ ব্রিটিশদের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা গণহত্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। শেখ মুজিবের একজন জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টা (পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) কামাল হোসেন ঢাকায় থাকা ব্রিটিশ সরকারের প্রধান কূটনৈতিক প্রতিনিধি এফসিডি সার্জেন্টকে জানান যে তারা নিশ্চিত, ‘সেনাবাহিনী পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখতে চায়; এমনকি যদি তার জন্য অনেক বাঙালিকে হত্যা করতে হয়, তাহলেও তারা সেটি করবে।’

তিনি বার্তাটি এভাবে পাঠান, ‘এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব জনমতকে বোঝাতে চাইবে যে পাকিস্তানে “গণহত্যা” (তিনি জোর দিয়ে শব্দটি ব্যবহার করেন) ন্যায্য।’ হোসেন ব্রিটিশদের অনুরোধ করেন, ‘উন্নত দেশগুলোর উচিত বর্তমান পাকিস্তানি শাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে আসন্ন বিপর্যয় ঠেকানো যায়।’ তিনি মূলত বৈশ্বিক বাঙালি প্রবাসীদের উদ্বেগই প্রতিধ্বনিত করছিলেন; এরই মধ্যে সেনা অভিযানের এক সপ্তাহ আগে, ১৮ মার্চ—হংকংয়ের পাকিস্তানি কমিউনিটি জাতিসংঘে একটি টেলিগ্রাম পাঠায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়—

পাকিস্তানি সেনারা ইতিমধ্যেই নিরস্ত্র নিরীহ বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছে। পূর্ব পাকিস্তান এখন ভয়াবহ গণহত্যার চরম ঝুঁকির মুখে। মানবতাকে রক্ষার জন্য আমরা আপনাদের প্রভাব ও চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাই।

WhatsApp-Image-2026-03-25-at-5.22

এ ধরনের শত শত বার্তা জাতিসংঘে পাঠানো হয়েছিল। এর পরও মার্চে কূটনীতিকরা পরিস্থিতিকে গণহত্যার চেয়ে গৃহযুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তনের বিভিন্ন স্থানে দুই ধরনের সহিংসতার খবর নিয়মিত আসতে থাকে। এসব ছিল সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এবং পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যেই পারস্পরিক কিছু সংঘর্ষের খবর।

৯ মার্চের একটি পরিস্থিতির প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের সপ্তাহে জনতা ও সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৭২ জন নিহত ও ৩৫৮ জন আহত হয়েছে। যদিও এ সংখ্যা আরো বেশি বলে আওয়ামী লীগ দাবি করে। একই সঙ্গে তারা এ ঘটনার সঠিক তদন্তও দাবি করে। সেনাবাহিনীর প্রতি আওয়ামী লীগ ও সাধারণ জনগণের ক্ষোভ তীব্র হতে থাকে। জনসাধারণের ছোট ছোট আক্রমণ এবং ক্যান্টনমেন্টে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে এ ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছিল।

ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদের নিয়ে, ‘যারা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।’ ১০ মার্চ তারা রাজধানীতে চেকপোস্ট বসায়, যদিও পরে তা তুলে নিতে বাধ্য হয়। এরপর তারা ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবস এবং ইয়াহিয়ার ঢাকা সফরের সঙ্গে মিলিয়ে ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালনের আহ্বান জানায়। একই সময়ে তারা ঢাকায় ‘হাস্যোজ্জ্বল মিছিল’ করছিল, যেখানে কিছু সদস্য লাঠি, বর্শা এমনকি ‘থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল বহন করছিল। এসব ছাত্র ‘হুমকিস্বরূপ’ ছিল।

এ কাজে তারা চুরি করা যানবাহনসহ বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করছিল। এর আগেই জাতীয়তাবাদী ছাত্ররা এক ব্রিটিশ ভ্রমণকারীকে জানিয়েছিল, তারা ল্যাবরেটরি থেকে উপকরণ লুট করে অস্ত্র তৈরি করছে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে আসন্ন সংঘর্ষের জন্য ভবনগুলোকে সুরক্ষিত করছে। এসব উসকানির মুখেও সেনাবাহিনীর ‘সংযম’ লক্ষ করা এবং প্রশংসা করা হয়। ঢাকার রাস্তাঘাট নিয়ন্ত্রণ করছিল আওয়ামী লীগ, আর সেনাবাহিনী ছিল ব্যারাকে সীমাবদ্ধ। পরিস্থিতি ছিল বিস্ফোরক। তবে তা গণহত্যার চেয়ে গৃহযুদ্ধের মতোই মনে হচ্ছিল।

মার্চে বেসামরিক জনতার মধ্যকার সহিংসতাও এ ধারণাকে জোরদার করে। চট্টগ্রাম থেকে বিহারি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর আসছিল, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র; অগ্নিসংযোগও বেশি এবং কিছু ক্ষেত্রে বিহারিদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল, যা তারা আত্মরক্ষায় ব্যবহার করেছে। গ্রামাঞ্চলে ‘স্বাধীন বাংলা এবং পাঞ্জাবিদের মৃত্যুর’ দাবিতে মিছিল হচ্ছিল।

ঢাকায় নিযুক্ত উপহাইকমিশনার মন্তব্য করেন, ‘আওয়ামী লীগ এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছে, যাতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষটাই বেশি গুরুত্ব পায়।’ বরিশালে পরিস্থিতি খারাপ ছিল, এমনকি পশ্চিমা লোকেরাও শত্রুতার শিকার হচ্ছিল। ঢাকার মিরপুরে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা তাদের ঘরে ওড়ানো বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উর্দুভাষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

মার্চের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ ও পাকিস্তানি নেতাদের মধ্যে আলোচনা ভেঙে যায়। ২৫ মার্চ রাত ও ২৬ মার্চ ভোরে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় কূটনীতিকরা বিস্মিত হন। কয়েকদিন পরিস্থিতি ও সহিংসতার মাত্রা পরিষ্কার ছিল না। গুলিবর্ষণের মধ্যে অফিসে সীমাবদ্ধ থেকে তারা মূলত সাংবাদিকদের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছিল এভাবে, ‘প্রেস জানাচ্ছে গত রাতে আবার গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের মতে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর ঠাণ্ডা মাথায় সেনা হত্যাকাণ্ড, আর সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সেনা ব্যবহৃত হচ্ছে।’

হাইকমিশনার পিকার্ড ‘বড় আকারের রক্তপাতের’ আশঙ্কা করেন এবং বলেন, ‘আমাদের প্রথম বিবেচ্য বিষয় হতে হবে আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা।’ ঢাকার উপহাইকমিশনার পরদিন এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহিংসতার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তাকে জানানো হয়, প্রথম রাতেই প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে এবং অনুরোধ করা হয় ‘বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তোলা হোক, বিশেষ করে গণহত্যার বিষয়টি যেন তুলে ধরা হয়।’ আওয়ামী লীগের ওই ব্যক্তি আরো বলেন, তাদের সহকর্মীরা গ্রামাঞ্চলে চলে গিয়ে সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করবে।

ক্র্যাকডাউন শুরু হওয়ার দুইদিন পর হাইকমিশনার ঢাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান। রাজধানীর বাইরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার অভিযানের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষও আক্রান্ত হচ্ছিল। হাইকমিশনার টেলিগ্রাম করে জানান—

…কাঁচা ঘর ও ছোট দোকানের পুরো এলাকা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং মালিকদের মেশিনগান দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আজ পুরান ঢাকার আরেকটি এলাকায় এবং রাতে গুলশান এলাকার বাইরের গ্রামগুলোতে একই ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে যে এ অভিযান জনগণের শত্রুদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। পুলিশের বড় অংশকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত রাতের ইপিআর সদর দপ্তরের গুলিবর্ষণ থেকে বোঝা যায়, অন্তত কিছু সদস্য এখনো প্রতিরোধ করছে। মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৫,০০০। …ইঙ্গিতগুলো দেখাচ্ছে যে সেনাবাহিনী একটি সন্ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে এবং এতে তারা এখন পর্যন্ত বেশ সফল।

একই দিনে আরেকটি টেলিগ্রামে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে হত্যার কথা জানান এবং কাছাকাছি ব্রিটিশ কাউন্সিল অফিস বন্ধ করার পরামর্শ দেন।

কয়েক দিনের মধ্যেই সহিংসতার ব্যাপ্তি স্পষ্ট হয়, কিন্তু তা তখনো গণহত্যার চেয়ে গৃহযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছিল। অথবা বিচ্ছিন্নতা ঠেকাতে কঠোর সরকারি পদক্ষেপ। পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ ও রেজিমেন্টের ওপর হামলা হয়। ছাত্রদের ওপরও আক্রমণ হয়; যাদের কাছে অস্ত্র ছিল বলে ধারণা করা হয়।

তাছাড়া পিকার্ড মার্চের আলোচনা ব্যর্থতার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকেই দায়ী করেন, যাকে তিনি দুর্বল নেতা মনে করতেন। তিনি আপসহীন সমর্থকদের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও সেনাবাহিনীর কাছে অতিরিক্ত দাবি তুলেছিলেন। সেনাবাহিনী ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের বলেছিল, তারা কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে। যদিও কূটনীতিকরা মনে করতেন, তারা আওয়ামী লীগের জনসমর্থনকে অবমূল্যায়ন করছে।

সামরিক গভর্নর টিক্কা খান গণহত্যার অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দেন এভাবে: ‘প্রেসে গণহত্যার কথা বলে প্রায় সবই বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করা হচ্ছে। অথচ সেনাবাহিনী মাত্র ২৭ জনকে হত্যা করেছে, তাও অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে।’ পাকিস্তানের প্রচলিত অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, ‘সমস্যা হলো সাংবাদিকরা দিল্লিভিত্তিক, যেখানে তারা কেবল ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রহণ করে।’

আওয়ামী লীগের নেতা পাকিস্তানের ওপর হস্তক্ষেপের যে আবেদন করেছিল তা ব্রিটিশ হাইকমিশনারের কাছে গুরুত্ব পায়নি। কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা, যা নির্ভর করছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর। পিকার্ড সহিংসতা সম্পর্কে জানতেন। তবে তিনি এটিকে মূলত রাজনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বলে মনে করতেন, নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নয়। তার মতামত—

কিছু পশ্চিম পাকিস্তানির প্রতিক্রিয়া আরো উদ্বেগজনক। পাঞ্জাবি ও পাঠানদের মধ্যে বাঙালিদের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পাচ্ছে এবং তাদের শিক্ষা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনগুলো থেকে স্পষ্ট যে সেনাবাহিনী মানবজীবনের প্রতি উদাসীনতা দেখাচ্ছে এবং বাঙালিদের দমাতে সহিংস কৌশল ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক নেতাদের খুঁজে বের করে হত্যা করা হচ্ছে (পাকিস্তানের ইতিহাসে যার নজির নেই) এবং আমি মনে করি আওয়ামী লীগের অনেক নেতৃত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

তার দৃষ্টিভঙ্গি ঢাকায় আমেরিকান কূটনীতিকদের মতো নয়। তিনি সংঘাতটিকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হিসেবেই দেখতেন, গণহত্যা হিসেবে নয়। এ বার্তাই লন্ডনে পৌঁছানো হয় এবং জনসাধারণকে জানানো হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব অ্যালেক ডগলাস ২৬ এপ্রিল পার্লামেন্টে বলেন, ‘পাকিস্তানে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তাতে আমরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি—কিন্তু এ ধরনের ঘটনা গৃহযুদ্ধেই ঘটে থাকে।’

ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস (এফসিও) কর্মকর্তাও জানত যে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জিতে পাকিস্তানের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের ম্যান্ডেট পেয়েছে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত দমন-পীড়ন ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে ক্রমেই অবাস্তব করে তুলছে। রাজনৈতিক সমাধানের আশায় ব্রিটিশরা ইয়াহিয়াকে বেসামরিক সরকারে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে এবং আওয়ামী লীগের সহনশীল নেতাদের সমর্থন নিতে পরামর্শ দেয়। মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর তারা নিয়মিত তার নিরাপত্তার বিষয়ে চাপ দেয়। তারা আরো জানায় যে উন্নয়ন সহায়তা পূর্ব পাকিস্তানের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। তারা সহিংসতা পছন্দ করে না।

ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান ছিল স্বার্থপরতা, রাষ্ট্রের বৈধতা ও হস্তক্ষেপ না করার নীতির মধ্যে লুকানো অসংগতিতে ভরা। তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুর্বল মনে করত এবং ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষার জন্য এর ভাঙন ঠেকাতে চাইত। স্থিতিশীলতাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে তারা বিশ্বাস করত পশ্চিম পাকিস্তান ‘বাঙালি প্রতিরোধকে’ পরাজিত করতে পারবে না। আশঙ্কা করত শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিজে নিজেই ভেঙে পড়বে।

এর মানে হলো কার্যত অরাজকতা এবং ব্রিটিশ অর্থনৈতিক স্বার্থের ধ্বংস। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এফসিও ও কনজারভেটিভ সরকারের নীতির মধ্যে প্রাধান্য ছিল। তাছাড়া ব্রিটিশ নাগরিকদের সরিয়ে নিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। এ কারণে ঢাকার হাইকমিশনার ২৯ মার্চ বার্তা পাঠান

এ সময় পাকিস্তান সরকারের আচরণের কোনো সমালোচনা করলে এখানে ব্রিটিশ কমিউনিটির জন্য গুরুতর পরিণতি হতে পারে; বিশেষ করে যখন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ বাড়ছে। এমন কাজ সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ করবে। আর তাদের সঙ্গেই আমাদের সর্বোত্তম সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

ফলে তারা পাকিস্তানের সামরিক সহিংসতার নিন্দা করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদরা বলেন, সহায়তা বন্ধ করে পাকিস্তানের ওপর চাপ দেয়ার কোনো লাভ নেই। কারণ ইয়াহিয়া কেবল বন্ধুদের পরামর্শই শোনেন।

এ পর্যায়ে ব্রিটিশরা অনুমান করতে পারেনি যে মে ও জুনে শরণার্থী সংকট তৈরি হবে। যেখানে প্রধানত হিন্দু বাঙালিরা গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীর দমন অভিযান থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে যায়। এ শরণার্থী সমস্যা, যা সাংবাদিক, মানবিক সংস্থা ও ভারতের সফররত রাজনীতিবিদদের কারণে ব্যাপক প্রচার পায়, অনেক ক্ষেত্রে সেনা সহিংসতার চেয়েও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। ভারতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলায় এটি সংঘাতকে আন্তর্জাতিক করে তোলে এবং পাকিস্তান-ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে; অথচ এতদিন এটি কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

[অপর্ণা সুন্দর ও নন্দিনী সুন্দর সম্পাদিত ‘সিভিল ওয়ার ইন সাউথ এশিয়া-স্টেট, সভরেইনটি, ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক গ্রন্থে প্রকাশিত আ ডার্ক মসেসের ‘সিভিল ওয়ার অর জেনোসাইড? ব্রিটেন অ্যান্ড দ্য সিসেশন অব ইস্ট পাকিস্তান ইন ১৯৭১’ নিবন্ধের অংশবিশেষ। ভাষান্তর: বাশার খান]

ব্রিটিশ তারবার্তায় পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান সংকট, ১৯৬৬-৭১

পাকিস্তানে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বাসভবন | ছবি: হিস্টোরিক ইংল্যান্ড

১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বর। পাকিস্তান থেকে লন্ডনে পাঠানো একটি গোপন বার্তায় তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার সিরিল স্ট্যানলি পিকার্ড অত্যন্ত বিষণ্ন সুরে লিখলেন, আইয়ুব খানের সরকার গভীর সংকটে পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ‘বিচ্ছিন্ন এবং স্বৈরাচারী’ হয়ে পড়েছেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের ভুল হিসাবনিকাশ সরকার সম্পর্কে জনমনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতা গুটিকয়েকের হাতে কুক্ষিগত, আর পাঞ্জাবের বাইরের অঞ্চলগুলো মনে করছে তারা ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না।

তবু পিকার্ডের মত ছিল স্পষ্ট, ‘পশ্চিমের স্বার্থেই প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের টিকে থাকা উচিত।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, বিগত দশকের গণতন্ত্র তৎকালীন পাকিস্তানে কেবল অস্থিতিশীলতাই বয়ে এনেছে। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে তার দুই ডেপুটি বার্ট্রাম ফ্ল্যাক ও রয় ফক্সের চেয়ে তিনি ছিলেন কিছুটা বেশি আশাবাদী। কিন্তু ১৯৬৮ সালের নভেম্বরের শেষে ফক্স সতর্ক করে লিখলেন, ‘বিদ্যমান পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে সামান্য একটি প্রভাবক বা স্ফুলিঙ্গ বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে।’

ঠিক সেই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টোর ক্রমবর্ধমান প্রচারণার সঙ্গে বাঙালিদের ‘মোহভঙ্গের’ ঢেউ মিলে গেল। রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি দেখে পিকার্ড হতাশ হয়ে পড়লেন। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে লন্ডনকে তিনি লিখলেন যে গত ২০ বছর ধরে বিশ্বের এ অংশের ঘটনাবলি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য যে ‘ক্রিস্টাল বল’ তিনি ব্যবহার করতেন, তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।

সংকটের গতি এত তীব্র ছিল যে প্রতিবেদন তৈরির চাপ পিকার্ডের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক দপ্তরের (এশিয়া) উপসহকারী সচিব স্যার জন জনস্টোন তাকে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের নিয়ম মনে করিয়ে দিয়ে লিখলেন, ‘ব্রিটিশ পদ্ধতিতে আমরা সকল উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ, সারসংক্ষেপ ও নির্যাস বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট পদ বা দায়িত্বের ওপর নির্ভর করি। আমেরিকানরা সাধারণত যাচাই-বাছাই না করেই বিপুল পরিমাণ তথ্য ও মন্তব্য ওয়াশিংটনে পাঠিয়ে দেয় এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক বিশাল কর্মী বাহিনী তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। এটি কোনো ভালো ব্যবস্থা নয়। এটি কেবল জনবলই অপচয় করে না, বরং ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তির বিচার-বিবেচনা ব্যবহারের সুযোগ দেয় না— যে বিচার-বিবেচনা অনেক সময় যুক্তিতর্কের চেয়েও অন্তর্দৃষ্টিনির্ভর হতে পারে।’

জনস্টোনের এ বার্তার মাত্র ১১ দিন পর আইয়ুব খান পদত্যাগ করে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। জনস্টোন কিছুটা বিরক্ত হয়ে পিকার্ডকে জানালেন, ‘সংকটকালে চিঠিপত্র অত্যন্ত ধীরগতিসম্পন্ন… আপনার কোনো চিঠিই আমার কাছে পৌঁছতে ৪ দিনের কম সময় নেয়নি। বেশকিছু চিঠি পৌঁছতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগেছে।’ তিনি আরো বললেন, ‘অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় দাপ্তরিক চিঠি দ্রুত বণ্টনের জন্য কম উপযোগী।’

জনস্টোন তিন-স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থার নির্দেশ দিলেন: প্রথমত, তারবার্তা বা টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত সিটরেপ (Sitreps) পাঠিয়ে পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক তথ্য; দ্বিতীয়ত, সংকটের বিকাশ ও কারণ নিয়ে সাধারণ বর্ণনা (যা প্রচারিত হবে না); তৃতীয়ত, সংকটের শেষে বা কোনো চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি সামগ্রিক বার্তা, যা পুরো বিষয়ের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে।

পিকার্ড এরপর থেকে এ পদ্ধতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে শুরু করলেন। কিন্তু সংকট থামল না। ইয়াহিয়া সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিয়ে আরেকটি ভুল হিসাব করলেন। তার ধারণা ছিল, এতে একটি ‘ঝুলন্ত পার্লামেন্ট’ তৈরি হবে যা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বাস্তবে দেখা গেল, দেশের দুই অংশের মধ্যে ভয়ংকর মেরুকরণ— পশ্চিমে ভুট্টোর পিপিপি ও পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পেল। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে পিকার্ড লন্ডনকে জানালেন, ‘পাকিস্তান উন্নতির দিকে যাত্রা শুরু করবে নাকি দ্রুত ধ্বংসের দিকে নামবে, তা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদরা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছেন কিনা তার ওপর।’

পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিষদের অচলাবস্থা নিরসনে ব্যর্থতার দিকে ফিরে তাকিয়ে পিকার্ড লিখলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের সাফল্যই তাকে এক অর্থে তার নিজ দলের চরমপন্থীদের কাছে বন্দি করে ফেলেছিল; আর পশ্চিমে ভুট্টোর তুলনামূলক কম সাফল্য তাকে এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি করেছিল, যে সাংবিধানিক সমাধানের চেয়ে মুজিবকে ধ্বংস করে ক্ষমতা দখলেই বেশি আগ্রহী।’

১৯৭১ সালের ২৭ থেকে ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় মুজিবের সঙ্গে ভুট্টোর আলোচনা হলো। কোনো অগ্রগতি ছাড়াই ভুট্টো সাংবিধানিক বিষয়ের চেয়ে মন্ত্রিত্বের ভাগাভাগির ওপর বেশি জোর দিলেন। ইয়াহিয়া যখন তাকে রাওয়ালপিন্ডিতে তলব করলেন, ভুট্টো ঘোষণা করলেন যে পিপিপিকে ছাড়া সংবিধান তৈরি করা হবে ডেনমার্কের রাজপুত্রকে ছাড়া হ্যামলেট নাটক মঞ্চস্থ করার মতো। পিকার্ড লন্ডনকে জানালেন, ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদ স্থগিত করার সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল ‘উত্তেজনা প্রশমন ও ফলপ্রসূ আলোচনার সুযোগ দেয়া।’

১৯৭০ সালের নভেম্বরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের দিকে আন্তর্জাতিক নজর পড়ল। ডেইলি এক্সপ্রেসে ইয়ান ব্রোডি ও মিররে জন পিলজারের প্রতিবেদন টেলিভিশন-রেডিওতে ছড়িয়ে পড়ল। বিবিসির প্রতিনিধি এবিএম মূসার সঙ্গে যোগ দিলেন সিঙ্গাপুর থেকে আসা ব্রায়ান ব্যারন। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা, বাঙালিদের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ— সবকিছু বিবিসি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করল। পিকার্ড এ প্রতিবেদনের ‘বস্তুনিষ্ঠতার’ প্রশংসা করলেন ঠিকই, কিন্তু লন্ডনকে জানালেন যে উর্দু সংবাদপত্রগুলো একে ‘উসকানিমূলক পূর্বাভাস’ বলে সমালোচনা করছে।

ইয়াহিয়ার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সংকট এক পর্যায়ে গৃহযুদ্ধে রূপ নিল। হোয়াইট হলে বিবিসির সমালোচনা হলো— তবে তা ‘পক্ষপাতের’ জন্য নয়, বরং ব্রিটিশ নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়ার জন্য। স্যার লরেন্স পামফ্রে কড়া ভাষায় বিবিসির বিরুদ্ধে ‘ভারতের পক্ষে’ সংবাদ প্রচারের অভিযোগ তুললেন।

ঢাকায় ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাবলি থেকে তখন পিকার্ড দূরে ছিলেন। লন্ডনের কাছে সঠিক চিত্র পৌঁছে দিচ্ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার ফ্রাঙ্ক সার্জেন্টের তারবার্তাগুলো।

৫ মার্চ ফ্রাঙ্ক সার্জেন্ট আরেকটি বিস্তারিত তারবার্তায় জানালেন, ঢাকার বাইরের যোগাযোগ ব্যবস্থা ‘বিপর্যস্ত’। চট্টগ্রাম, খুলনা ও ছোট শহরগুলোতে ‘ব্যাপক’ বিশৃঙ্খলা ঘটেছে।

অপারেশন সার্চলাইট শুরুর আগেই ইয়াহিয়া বিদেশী সাংবাদিকদের বহিষ্কার করলেন ও কূটনৈতিক বেতার যোগাযোগ নিষিদ্ধ করলেন। তখন ঢাকার ব্রিটিশ মিশন জরুরি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে গোপন যোগাযোগ শুরু করল। লন্ডন জানতে পারল, সেনাবাহিনী একটি ‘ত্রাসের রাজত্ব’ শুরু করেছে। ফ্রাঙ্ক সার্জেন্টের বার্তায় ঢাকায় সেনাবাহিনীর আক্রমণে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারানোর ভয়াবহ বর্ণনা ছিল। ইকবাল হল ও জগন্নাথ হল ছিল প্রধান লক্ষ্য। ‘দুইদিন পরেও পোড়া ঘরগুলোতে মরদেহ জ্বলছিল। বাইরে ছড়িয়ে ছিল মৃতদেহ। পাশের লেকেও ভাসছিল আরো অনেক মরদেহ।’ সেনাবাহিনীর অভিযানে পাশের ব্রিটিশ কাউন্সিল অফিস ও লাইব্রেরিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাঙালিদের প্রতিরোধ তীব্র হওয়ায় ঢাকার বাইরে ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠল। চট্টগ্রাম ও সিলেটের চা-বাগানে থাকা ব্রিটিশদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিল। যারা ঢাকায় পৌঁছতে পেরেছিল, তারা ভয়াবহ বর্ণনা দিল। কলকাতায় পৌঁছানো শরণার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ক্যাবিনেট ইন্টেলিজেন্স অফিসে পাঠানো হলো। এক প্রত্যক্ষদর্শী বললেন, সেনাবাহিনী ঢাকা থেকে হিন্দুদের ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করছে। আরেকজন জানালেন, ‘চট্টগ্রামে অন্তত দুই-তিন হাজার মানুষ মারা গেছে। রাস্তায় অনেক মরদেহ পড়ে আছে, যা কুকুর ও শকুনে খাচ্ছে।’

ঢাকার ব্রিটিশ মিশন তাদের কর্মী জ্যাক লংকে চট্টগ্রামে পাঠাল। ৪ এপ্রিল তিনি অন্য কূটনীতিকদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রহরায় সেখানে পৌঁছালেন। সেনাবাহিনী তখন সদ্য ‘বিদ্রোহী’ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের কাছ থেকে বন্দর নগরীটি পুনর্দখল করেছে। লং দুই সপ্তাহ ধরে সেখানে থেকে ব্রিটিশদের সরিয়ে নিলেন ও তথ্য সংগ্রহ করলেন। তিনি জানালেন, ‘পুরো শহর চরম আতঙ্কে ছিল। ব্যাপকভাবে লুটপাট চলছিল। ধর্ষণের খবরও পাওয়া যাচ্ছিল।’

২৮ এপ্রিল সার্জেন্ট সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য লংয়ের সঙ্গে যোগ দিলেন। পথ পরিষ্কার হলে লং ও ইউনাইটেড কিংডম অ্যাসোসিয়েশন অব পাকিস্তানের সদস্যরা চট্টগ্রামের বাইরের ব্রিটিশ মালিকানাধীন জুট মিলগুলো পরিদর্শন করলেন।

অন্যদিকে কিছু ব্রিটিশ নাগরিককে বীর হিসেবে দেখা হয়। চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলী পেপার মিলের দুই ম্যানেজার বাঙালি রাইফেলস ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণের সময় প্রায় ২০০ অবাঙালি নারী ও শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

চট্টগ্রামের এ বিবরণগুলো ঢাকার চিত্রের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফ্রাঙ্ক সার্জেন্ট তখন পিকার্ডকে জানালেন, চট্টগ্রামের ব্রিটিশরা মনে করছেন বেলুচ সৈন্যদের দুটি কোম্পানি তাদের আওয়ামী লীগ, ছাত্র ও অন্যান্য বিশৃঙ্খলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তিনি লিখলেন, ‘তারা সেনাবাহিনীকে তাদের জীবন ও সম্পদের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখছেন…ফলে তারা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ও বিবিসির কঠোর সমালোচনা করছেন।’

পিকার্ড লন্ডনকে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নেয়ার পরামর্শ দিলেন। এপ্রিলে তিনি লিখলেন, ‘আমার মতে আমাদের নীতি হওয়া উচিত দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতো— বর্তমান সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থনও না করা, আবার একতরফাভাবে এর প্রকাশ্য বিরোধিতাও না করা।’

কিন্তু যুক্তরাজ্যে টেলিভিশন ও সংবাদপত্র বাঙালি দাবির পক্ষে জনমত তৈরি করে ফেলেছিল। নির্বাসিত রাজনৈতিক কর্মীরা সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তাদের মধ্যে আবু সাঈদ চৌধুরী জেনেভায় মানবাধিকার কমিশন থেকে পদত্যাগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে লন্ডনে চলে এলেন। প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বুঝে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিতভাবে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দিল। কিন্তু ফল হলো উল্টো।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস স্বতন্ত্র অনুসন্ধান চালিয়ে ১৩ জুন ‘সানডে টাইমস’-এ তিন পৃষ্ঠার কঠোর প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করলেন। প্রতিবেদনটি ব্রিটিশ জনমনে তীব্র ক্ষোভের ঝড় তুলল। পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের ‘ইন-ট্রে’ এমপিদের চিঠি, সাধারণ মানুষের পিটিশন ও তারবার্তায় ভরে গেল। সবাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি জানালেন। লেবার পার্টির এমপি জন স্টোনহাউস পার্লামেন্টে ‘আর্লি ডে মোশন’ জমা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সহিংসতাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য হুমকি’ বলে অভিহিত করলেন।

ব্রিটিশ সরকার তখন পূর্ব পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের ও ব্রিটিশ শরণার্থীদের দেয়া তথ্যগুলো ব্যবহার করা সুবিধাজনক মনে করে। এসব তথ্যে প্রমাণিত হয় যে সহিংসতা কেবল একতরফা ছিল না।

পাকিস্তানে থাকা ব্রিটিশ মিশন সহিংসতার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দিলেও সামরিক পদক্ষেপের পরিণতি নিয়ে তাদের মূল্যায়ন ছিল নির্মম। ফ্রাঙ্ক সার্জেন্ট লিখলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি ‘বিজয় অভিলাষী দখলদার বাহিনীর’ মতো আচরণ করছে। এপ্রিলের শেষে পিকার্ডও একমত হলেন যে এ কর্মকাণ্ড বাঙালিদের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি এমন ঘৃণার জন্ম দিয়েছে, যা আর কখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দেবে না।

পরের মাসে তিনি নিরাশ হয়ে বললেন, ‘১৯৪৭ সালের দেশভাগের পুরো ভিত্তি ও যৌক্তিকতা এখন সন্দেহের মুখে।’ এর কিছুদিন পর নতুন হাইকমিশনার লরেন্স পামফ্রে সামরিক হস্তক্ষেপকে ‘ভয়াবহ ভুল’ বলে আখ্যা দিলেন। তিনি অনুমান করলেন যে ইয়াহিয়া পরাজয় স্বীকার করার চেয়ে লড়াই করে ধ্বংস হওয়াকেই বেছে নেবেন।

শেষ পর্যন্ত বাস্তব রাজনীতি বা ‘রিয়েলপলিটিক’ লন্ডনের মনোভাবকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর করে তোলে। ১৯৭১ সালের আগস্টের মাঝামাঝি দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী প্রধান এইচ সি বাইয়াট লিখলেন, ‘আমরা একটি নতুন পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি যেখানে আমাদের ভবিষ্যতের স্বার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা হয়তো এ সিদ্ধান্তে পৌঁছব যে ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই আমাদের মূল স্বার্থ।’ এ ‘টিল্ট’ বা ঝোঁক শুধু ইসলামাবাদ নয়, ওয়াশিংটনের সঙ্গেও সম্পর্ককে প্রভাবিত করল। কারণ প্রেসিডেন্ট নিক্সন ছিলেন কট্টর ইয়াহিয়াপন্থী। ব্রিটিশ হাইকমিশন তখন দ্বিমুখী চাপে পড়ল— একদিকে পাকিস্তানে গোলাগুলির মধ্যে ব্রিটিশ নাগরিকদের উদ্ধার, অন্যদিকে কূটনৈতিক টানাপড়েন।

[ইয়ান ট্যালবটের ‘দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাসি ইন পাকিস্তান’ গ্রন্থের রিপোর্টিং ফ্রম পাকিস্তান অংশের অনুবাদ।]

ভাষান্তর: মিনহাজুল আবেদীন

২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর ঢাকার ব্রিটিশ উপহাইকমিশন থেকে লন্ডনে যে বার্তা পাঠানো হয়

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা চালায়। হলের ভবনে শেলিং ও আগুনের চিহ্ন | ছবি: ফরেন সার্ভিস জার্নাল, জানুয়ারি ১৯৮০

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পরিকল্পিত ও সমন্বিত সামরিক হামলা চালায়। সেই রাতেই শুরু হয় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। বিভিন্ন গবেষণা ও বিবরণ অনুযায়ী, শুধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ১৫ হাজার মানুষ নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। তবে ব্রিটিশ সরকারি নথিতে ওই রাতের মোট নিহতের সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ উপহাইকমিশন থেকে লন্ডনে পাঠানো সরকারি টেলিগ্রামগুলোতে বলা হয়, রাজধানীতে প্রায় পাঁচ হাজার এবং চট্টগ্রামে আরো তিন হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ হিসাব দেশের অন্যান্য জেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলের বাস্তব চিত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে না। একই সঙ্গে লন্ডনে পাঠানো প্রায় প্রতিটি বার্তায় সেনাবাহিনীর অভিযানের ধরনকে ‘নির্মম’ ও ‘শাস্তিমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

ব্রিটিশ কূটনীতিকদের গোপনীয় প্রতিবেদনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার একটি সুস্পষ্ট ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো দ্রুত সেনাবাহিনী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। রেডিও পাকিস্তানের প্রতিবেদনে ২৬ মার্চ ঢাকা দখলের কথা ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্মঘট ও অবরোধ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশী নাগরিক বা বিদেশী মিশনকে লিফলেট বিতরণের সুযোগ দেয়া হয়নি।

যুক্তরাজ্যের ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের (এফসিও) অধীন সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট (এসএডি) বিভাগ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করত। ঢাকা থেকে পাঠানো টেলিগ্রামের ভিত্তিতে তারা সে সময় একটি বিস্তারিত পরিস্থিতি প্রতিবেদন তৈরি করে। এসব বার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন সহকারী সামরিক উপদেষ্টা মেজর কক্স এবং এফসিডি সার্জেন্ট, যা ঘটনাপ্রবাহের একটি প্রত্যক্ষ ও তাৎপর্যপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, ২৬ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয় এবং রাস্তায় বের হলেই গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয়। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ বেতার যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এমনকি কূটনৈতিক টেলিগ্রাম আদান-প্রদানও অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যা পরিস্থিতির তীব্রতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার কঠোরতা নির্দেশ করে।

কূটনীতিকদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, সেনাবাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল দুর্বল। ফলে তারা নির্বিচারে হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণের মতো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় ব্রিটিশ উপহাইকমিশন ভবনে সরাসরি হামলা না হলেও সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের নিরস্ত্র করে সরিয়ে দেয়া হয়। একই সময়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের উপপ্রতিনিধির ব্যবহৃত একটি গাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

এফসিডি সার্জেন্ট তার মূল্যায়নে উল্লেখ করেন, ‘সেনাবাহিনী একটি সন্ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে এবং তা অনেকাংশে সফল হয়েছে।’ লন্ডনে পাঠানো অধিকাংশ টেলিগ্রামেই একই ধরনের মূল্যায়ন পাওয়া যায়, যা পুরো অভিযানের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়।

ব্রিটিশ কূটনীতিকরা ২৫ মার্চের রাতের ঘটনাগুলো সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। একজন ব্রিটিশ সাংবাদিকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের একজন কর্মচারীর অস্ট্রিয়ান স্ত্রী ২৯ মার্চ পায়ে হেঁটে শহরের পরিস্থিতি দেখতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে ফিরিয়ে দেয়। তিনি দেখেন, রাস্তায় নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের লাশগুলো ফেলার আগে এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হচ্ছে।

আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন একজন ইংরেজিভাষী চেক নাগরিক। সে সময়ে তিনি চট্টগ্রামের একটি পাটকলের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি ২৯ মার্চ সেখান থেকে বের হয়ে ৩০ মার্চ সামরিক বিমানে পাকিস্তানের করাচিতে পৌঁছান। তিনি জানান, কয়েকদিন ধরে গুলিবর্ষণ চলছিল, কিছু ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

এ ঘটনাকে ‘নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে ঢাকায় দায়িত্বরত ব্রিটিশ কূটনীতিক এফসিডি সার্জেন্ট লিখেছেন—

আমার স্থানীয় কর্মীদের একজনের বাড়ি লুট হয়ে গেছে এবং এখন তার গায়ে শুধু পরনের কাপড় ছাড়া কিছু নেই। আরো চৌদ্দজন (যাদের মধ্যে কয়েকজন হিন্দুও আছেন) নিখোঁজ। … সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনের ফ্ল্যাটে থাকা সব শিক্ষক ও তাদের পরিবারকে হত্যা করেছে। দরজার তালা গুলি করে ভেঙে ভেতরে থাকা সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। নিউ মার্কেটে দোকানে ঘুমিয়ে থাকা কসাইদেরও ঘুমন্ত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং যারা এ ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তারা তাদের স্মৃতিকথায়ও একই ধরনের বিবরণ দিয়েছেন।

পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাঠানো এক বার্তায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার সিরিল পিকার্ড উদ্বিগ্ন হয়ে লিখেছিলেন—

২৫ মার্চ মধ্যরাতে সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। একের পর এক বিস্ফোরণের পর সারা রাত ধরে বন্দুকযুদ্ধ চলে এবং পরদিনও তা কম মাত্রায় চলতে থাকে। ঢাকা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ইঙ্গিত থেকে বোঝা যাচ্ছে, সেনাবাহিনী একটি সন্ত্রাসের শাসন কায়েম করার পরিকল্পনা করেছে এবং এখন পর্যন্ত তাতে অনেকটাই সফল হয়েছে। … পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানুষের জীবনের প্রতি নির্মম উদাসীনতা দেখাচ্ছে এবং বাঙালিদের দমন করতে সন্ত্রাসী কৌশল গ্রহণ করছে। রাজনৈতিক নেতাদের খুঁজে বের করে হত্যা করা হচ্ছে (পাকিস্তানের ইতিহাসে যার কোনো নজির নেই) এবং আমি মনে করি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের বড় অংশই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী হত্যার বর্ণনাতেও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সার্জেন্ট লিখেছেন—

আমার এক কর্মী, যিনি গত শনিবার সেখানে গিয়েছিলেন, তাকে ভবনের সামনে বুলডোজারের চিহ্নসহ একটি গণকবর দেখানো হয়। শহরের বেশির ভাগ এলাকায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে এবং প্রধান সড়কগুলোতে অসংখ্য লাশ পড়ে ছিল। নদীতে ভাসছিল মৃতদেহ। ৯টি ট্রাকে করে লাশ এনে পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ে সমাহিত করা হয়েছে।

পাঞ্জাবি সেনারা হিন্দুদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। বিহারিরা (১৯৪৭ সালের পর ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসা উর্দুভাষী মানুষ) এবং স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্যান্য লোকজন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে বাঙালিদের দমন করার সুযোগ নেয়। বেশকিছু টেলিগ্রামে কূটনীতিকরা বাঙালিদের ওপর বিহারিদের লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ এবং মারধরের কথা লেখেন। তারা আরো উল্লেখ করেন, ঢাকার পল্লবী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং আরো অনেক এলাকায় বিহারিরা এসব অভিযান চালিয়েছিল। মার্চের ঘটনার পরও বিহারিদের এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।

ঢাকায় ব্রিটিশ উপহাইকমিশনার তখন তার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন—

সশস্ত্র বিহারি মিলিশিয়ারা সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে; তারা বাঙালিদের ওপর ত্রাস সৃষ্টি করছে এবং হিন্দুদের নির্বিচারে হত্যা করছে। আমি এ বার্তা লেখার সময়ও প্রতিদিন আমার কাছে খবর আসছে যে বড় আকারে হত্যাকাণ্ড চলছে, গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে এবং সবখানে ব্যাপক লুটতরাজ চলছে।

ঢাকার মতো বরিশাল, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, মধুপুরের মতো গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও একই ধরনের আক্রমণ হয়। কূটনীতিকরা সেসব তথ্যও সংগ্রহ করেছিলেন। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এক সংবাদ সম্মেলনে এফসিও কর্মকর্তারা জানান, যদিও নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তবুও সিঙ্গাপুর হয়ে এবং সে সময় চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানরত ‘দ্য ক্ল্যান ম্যাকনেয়ার’ জাহাজ ব্যবহার করে তাদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন আগ্রহের সঙ্গে পড়তেন। তিনি এফসিওকে নির্দেশ দেন, লন্ডনে পৌঁছানো প্রত্যাগতদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে। পাকিস্তানের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পড়ার পাশাপাশি যখন তিনি জানতে পারেন প্রত্যাগতরা আসছেন, তখন তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন পাকিস্তানে কী ঘটছে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংগ্রহ করতে।

[অধ্যাপক সাবিনা নার্গিস লিপির ‘মার্চ ১৯৭১ ইন ইস্ট পাকিস্তান ‍অ্যাজ সিন বাই ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাটস’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধের অংশবিশেষ।

ভাষান্তর: নীরব হাসান]

পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের যেভাবে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৯৭১ এর এপ্রিলের শুরুতে ক্ল্যান ম্যাকনেয়ার জাহাজে করে ১৩০ জনেরও বেশি ব্রিটিশ নাগরিক ও জাতিসংঘ কর্মীকে কলকাতায় যান | ছবি: দ্য ব্রিটিশ অ্যান্ড কমনওয়েলথ শিপিং কোম্পানি

মার্চ, ১৯৭১। ক্রমেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক উত্তেজনা গভীর হচ্ছিল। এর প্রথম চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ২৫ মার্চের গণহত্যা; পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। এ ঘটনার পর পর ব্রিটেন সরকার, গণমাধ্যম ও সে দেশের জনগণের মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, যার নজির মেলে হাউজ অব কমন্স সভায় বিষয়টি ঘিরে আলোচনা হলে।

২৫ মার্চ রাতে পূর্ব বাংলায় সংঘটিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পর ২৯ মার্চ হাউজ অব কমন্স সভায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক সচিব স্যার অ্যালেস ডগলাস হিউম সে ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তানকে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধের জন্য আহ্বান জানান।

পাশাপাশি তিনি পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়েও জোর দিয়েছিলেন। জানা যায়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় এক হাজার (বিভিন্ন তথ্যমতে ৯০৪ জন) ব্রিটিশ নাগরিকের বাস ছিল। তারা মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রাম এলাকা এবং চা বাগান অধ্যুষিত সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করতেন।

বিশেষ করে সেসময় শমশেরনগর, কুরমা, দলই ও সিলেটের চা বাগান মালিকরা মিলে একটি একক ব্রিটিশ কমিউনিটি গঠন করে। ফলে নানা ঘটনা পরিক্রমায় তৎকালীন পূর্ব বাংলার পরিবেশে অরাজকতা দানা বাঁধতে শুরু করলে এই কমিউনিটিসহ পুরো বাংলায় ছড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে ব্রিটিশ সরকার ও কূটনীতিকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়।

এর ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চ ইসলামাবাদে পাঠানো এক টেলিগ্রামে পাকিস্তানে ব্রিটিশ উপহাইকমিশনার সার্জেন্ট উল্লেখ করেন যে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ব্রিটিশ নাগরিক বা সম্প্রদায় নয়। তবুও ক্রমেই নাজুক হয়ে ওঠা পূর্ব বাংলার পরিস্থিতিতে তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হয়েছেন যে দ্রুত ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর নাম দিয়েছিলেন ‘স্টেজ ২ ইভাকুয়েশন’।

এ পরিকল্পনায় নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নারী ও শিশুদের সর্বাগ্রে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে এ টেলিগ্রামের দুইদিন পর তৎকালীন দিল্লিতে অবস্থিত ব্রিটিশ মিশনের হাইকমিশনার মরিস জেমসও জানিয়েছিলেন যে নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনার অনুরোধ করেছেন যেন ব্রিটেনের যেকোনো নিরাপদ স্থানান্তর পরিকল্পনায় নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মরিস জেমস এও নিশ্চিত করেন যে নিউজিল্যান্ড সরকার এর পেছনের ব্যয়ভারও বহন করতে সম্মত হয়েছে।

প্রতিউত্তরে ২২ এপ্রিল সার্জেন্ট উত্তর দেন এবং জানান যে নিউজিল্যান্ডের দুটি মিশনারি পরিবারকে এরই মধ্যে আরএএফ চার্টার্ড বিমানে ব্যাংককে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, নিউজিল্যান্ড ছিল কমনওয়েলথভুক্ত দেশ। যে কারণে পূর্ব বাংলায় বসবাসরত দেশটির নাগরিকদেরও ব্রিটিশের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম থেকে যুগোস্লাভিয়ার নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া সমীচীন কিনা তা নিয়ে পরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

সে সময় ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কৌশলটি ছিল ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধাকালীন নেয়া পরিকল্পনার অনুরূপ—সব নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তারা নিরাপত্তার খাতিরে অন্যত্র যেতে চায় কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া এবং জল ও আকাশপথে সরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের একত্রিত করা। এ লক্ষ্যে উপহাইকমিশনার সার্জেন্ট ঢাকার একজন স্টাফ সদস্যকে বরিশালে পাঠান এবং তিনি সেখানে বাকি ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের সঙ্গে দেখা করে নারী ও শিশুদের নিয়ে ছোট ছোট দলভুক্ত করেন। পরে তাদেরকে জলপথে স্টিমারে করে সরিয়ে নেন।

vvvv

২ এপ্রিল সিলেট থেকে ট্রেনে করে একদল ব্রিটিশ চা বাগান মালিকদের পরিবারের সদস্য এবং ব্রিটিশ ও নরওয়ের মিশনারি কর্মীরা ঢাকায় পৌঁছেন। তারা এই প্রথম নিশ্চিত তথ্য নিয়ে আসেন যে ব্রিটিশ বাগান মালিক এবং তাদের পরিবারগুলো নিরাপদ আছে। সার্জেন্ট ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসকে অনুরোধ করেন যেন তারা দুটি ব্যবস্থাপনা সংস্থা—জেমস ফিনলে অ্যান্ড কোম্পানি এবং ওয়াল্টার ডানকান অ্যান্ড গুডরিককে বিষয়টি অবহিত করে।

২৫ মার্চের ঘটনায় ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এর কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিশেষত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলশান এলাকায় বসবাসরত ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের লুট করার প্রেক্ষাপটে ওই সার্জেন্ট ব্রিটিশ কাউন্সিল ভবন খালি করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এটি বলা যতটা সহজ ছিল, করা ততটা নয়। নথিপত্র ও দলিলগুলো হয় ঢাকা মিশনে সরিয়ে নিতে হতো অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হতো। এছাড়া ব্রিটিশ কাউন্সিলের ড্রাইভারদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ কোনো স্থানে চাকরির ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এছাড়া বকেয়া বিল পরিশোধ এবং স্থানীয়ভাবে নিযুক্ত কর্মীদের চাকরিচ্যুত করার জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রয়োজন ছিল। এসব ছিল সামগ্রিক স্থানান্তর প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে ‘অবশ্যই পূরণীয়’ কাজ।

ওয়াল্টার ডানকান অ্যান্ড গুডরিক লিমিটেডের একজন প্রতিনিধি চা বাগান অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের কর্মীদের পরিস্থিতি নিয়ে চিঠি লেখেন। সার্জেন্ট এর আগেই দিল্লি হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিশ্চিত করেছিলেন যাতে জরুরি ভিত্তিতে ত্রিপুরার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের সব কর্মী সরিয়ে নেয়া যায়। তবে এ আপৎকালীন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়নি, কারণ বাগানগুলোর পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত ছিল। ব্রিটিশ কর্মীদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্যের মজুদ ছিল। তবে একমাত্র সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শ্রমিকদের মজুরি দেয়ার জন্য নগদ টাকার অভাব। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের ব্রিটিশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করতে হয়নি। তবে সার্জেন্ট চট্টগ্রামের ব্রিটিশ সম্প্রদায় নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। আর তার চিন্তা আরো গভীর করে তুলেছিল জ্যাক লংয়ের একটি প্রতিবেদন।

লং তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসরত ব্রিটিশ পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করা ছিল লোমহর্ষক কাজ। প্রায় ১০ দিন ধরে জল ও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকা জনশূন্য রাস্তার পেছনের ঘরের কোণ থেকে পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করা হয়। তিনি আরো বলেন, ‘আমি যখন পৌঁছলাম, ব্রিটিশরা তখন বিপদসংকুল ১০টি দিন পার করেছে… তারা প্রথমে আওয়ামী লীগের হাতে এবং পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর শহরের মধ্যে অভিযান পরিচালনার সময় ভোগান্তির শিকার হয়েছে’। অর্থাৎ পাল্টাপাল্টিভাবে এ দুই পক্ষ চট্টগ্রামের ব্রিটিশ পরিবারগুলোকে বন্দুকের নলের সামনে রেখে তল্লাশি চালিয়েছে, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তৎকালীন আওয়ামী লীগের ধারণা ছিল যে ব্রিটিশ পরিবারগুলো পশ্চিম পাকিস্তানিদের অনেককে লুকিয়ে রেখেছিল, যাদের ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক মেরে ফেলা হতো। অন্যদিকে ব্রিটিশদের পাকিস্তানি সেনাদের কাছে অনুনয় জানাতে হয়েছিল, যাতে ব্রিটিশদের অধীনে কাজ করা বাঙালিদের গুলি করা না হয়। সেই সময় পাকিস্তানি সেনারা পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন পরিবারের ওপর চালানো নৃশংসতার কারণে ক্ষিপ্ত ছিল।

৩০ মার্চ সার্জেন্ট এবং মার্কিন কনসাল জেনারেল ঢাকায় সামরিক আইন প্রশাসনের মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে দেখা করে ব্রিটিশ নাগরিকদের স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ব্রিটিশদের সরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব ছিল জ্যাক লংয়ের। তিনি ইউনাইটেড কিংডম পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন। নৌপথে স্থানান্তরের জন্য যাত্রীরা ৪ এপ্রিল কারফিউ শুরু হওয়ার আগে ফিনলের কম্পাউন্ডে জড়ো হন। সে সময় ফিনলে কোম্পানি ছিল পাকিস্তানে অবস্থিত বৃহত্তম ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর একটি। এ কোম্পানির দ্বারা পরিচালিত হতো ১০৭টি ফার্ম, যার মধ্যে ৮৭টি ছিল ব্রিটিশ। পরদিন সকালে ক্ল্যান ম্যাকনেয়ার ১৩০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন। এর মধ্যে ব্রিটিশদের পাশাপাশি জাতিসংঘের কর্মীরাও ছিলেন। তবে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ১২ জন যুগোস্লাভীয়কে সে যাত্রায় নেয়া সম্ভব হয়নি।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলাস-হোম এ সহায়তার জন্য জাহাজ কোম্পানির চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানান। কিছু ব্রিটিশ নাগরিক নিজেদের যাতায়াতের ব্যবস্থা নিজেরাই করেছিলেন। একটি পরিবার ‘দ্য ডেল্টা পাইওনিয়ার’ নামের একটি স্টিমারে হংকং গিয়েছিল। এর ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন পাকিস্তান পাসপোর্টধারী ছয় চীনা নাগরিককেও সঙ্গে নিতে রাজি হয়েছিলেন। ক্ল্যান ম্যাকনেয়ার জাহাজ যাত্রা করার তিনদিন পর যুগোস্লাভীয়দের না নেয়া ঘিরে আবারো একটি বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে। তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি পিআইএ বিমান ভাড়া করা হয়েছিল, কিন্তু চট্টগ্রামে মাত্র দুটি বিমান অবতরণ করে।

জ্যাক লং শেষ ব্রিটিশ বাসিন্দাদের নিরাপদে বিদায় করার এক সপ্তাহ পর সার্জেন্ট চট্টগ্রাম সফর করেন। তিনি জানান যে সেখানে অবস্থানরত অবশিষ্ট ব্রিটিশ নাগরিকরা মোটামুটি মনোবল বজায় রেখেছেন, তবে তারা তখনো তাদের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা থেকে বের হতে পারছিলেন না। ২ এপ্রিল থেকে আরএএফ হারকিউলিস বিমানগুলো ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে ব্রিটিশদের নিয়ে যেতে শুরু করে। তিনদিনের মধ্যে ১২৭ জনকে বিমান ও নৌপথে সরিয়ে নেয়া হয়। ৪১ জন মানুষ বাণিজ্যিক পিআইএ ফ্লাইটে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। এর ফলে ঢাকায় মাত্র কয়েকজন ব্রিটিশ অবশিষ্ট ছিলেন। সার্জেন্ট লক্ষ করেন যে অবশিষ্ট ছয়টি শিশুর মধ্যে তিনজনের মা পাকিস্তানি এবং তাদের চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে স্থানান্তরের পর পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ২৩০ জন ব্রিটিশ নাগরিকের বসবাসের কথা জানা যায়। অন্যদিকে লন্ডন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ঢাকার ডেপুটি হাইকমিশনের কার্যক্রম চলমান থাকবে। কারণ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রস্থানকে পাকিস্তান ভিন্নভাবে বিচার করতে পারে। ভারতের হস্তক্ষেপ বা আওয়ামী লীগের পূর্বপরিকল্পনার কারণে তারা বিদায় নিয়েছেন বলে ভাবতে পারেন। তাই ডেপুটি হাইকমিশন সক্রিয় রাখা হয় এবং নিয়মিত আপডেট নেয়ার কাজে নিয়োজিত করা হয়। সর্বোপরি ধারাবাহিকভাবে টেলিগ্রামের মাধ্যমে সার্জেন্ট লন্ডনে ব্রিটিশ নাগরিকদের বিস্তারিত তথ্য প্রদান নিশ্চিত করেন।

(ইয়ান ট্যালবটের ‘দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাসি ইন পাকিস্তান’ বই অবলম্বনে অনূদিত ও সম্পাদিত)

ভাষান্তর: সাবরিনা স্বর্ণা

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর