নজরুল ইসলাম, কুতুবদিয়া :: কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) সেবা।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল সংকট, বিশেষ করে গাইনি কনসালটেন্ট না থাকায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে বন্ধ হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ এ সেবা।
দীর্ঘদিন ধরে ওটি বন্ধ থাকায় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত পড়ে আছে।
এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হওয়া রোগীদের ছুটতে হচ্ছে কক্সবাজারসহ দূরবর্তী হাসপাতালে।
যেভাবে চালু হয়েছিল ওটি সেবাঃ
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পূর্ণাঙ্গভাবে ওটি সেবা চালু করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) অর্থায়নে হেলথ এন্ড জেন্ডার সাপোর্ট প্রজেক্ট (HGSP)-এর আওতায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা ছিল PHD।
প্রকল্পের আওতায় হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ওটি সেবার পাশাপাশি হাসপাতালের লেবার রুমের সক্ষমতা বাড়ানো হয় এবং NSU-সহ আরও কয়েকটি সেবা সম্প্রসারণ করা হয়।
ফলে কুতুবদিয়ার মানুষের জন্য স্থানীয় হাসপাতালেই প্রসূতি ও জরুরি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং অস্ত্রোপচারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দ্বীপের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা সংকটও তখন অনেকটা কমে আসে।
প্রকল্প শেষ, বন্ধ হয়ে গেল সেবাঃ
তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে HGSP প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে হাসপাতালটি চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটে পড়ে।
বিশেষ করে গাইনি কনসালটেন্ট না থাকায় ওটি সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর প্রায় দেড় বছর পার হলেও এখনো সেবাটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো একটি প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে সেবা চালু করাই যথেষ্ট নয়।
প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও সেবা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।
কিন্তু কুতুবদিয়া হাসপাতালে সেই স্থায়ী জনবল কাঠামো নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি মুখ থুবড়ে পড়ে।
কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নিয়ে শঙ্কাঃ
দীর্ঘদিন ধরে ওটি বন্ধ থাকায় সেখানে থাকা মূল্যবান যন্ত্রপাতির ব্যবহার নেই বললেই চলে। নিয়মিত ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি তদারকি না থাকলে এসব আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি স্থাপন করে যদি চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে সেবা বন্ধই থাকে, তাহলে সরকারি অর্থের এই বিনিয়োগ কতটা কার্যকর হচ্ছে?
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে প্রসূতি রোগীরাঃ
কুতুবদিয়া একটি দ্বীপ উপজেলা হওয়ায় এখানকার রোগীদের চিকিৎসার জন্য মূল ভূখণ্ডে যেতে হলে নৌপথ পাড়ি দিতে হয়। জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে এই যাতায়াত আরও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওটি সেবা চালু থাকা অবস্থায় কুতুবদিয়া হাসপাতালে অনেক রোগীর অস্ত্রোপচার স্থানীয়ভাবেই করা সম্ভব হতো। এখন সেই রোগীদের কক্সবাজার সদর হাসপাতাল কিংবা অন্যান্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি রোগীর জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
দ্রুত চালুর দাবিঃ
স্থানীয়দের দাবি, কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রুত গাইনি কনসালটেন্টসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল পদায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা ওটির যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে।
তাদের মতে, সরকারি অর্থে স্থাপিত একটি পূর্ণাঙ্গ ওটি সেবা এভাবে বছরের পর বছর বন্ধ থাকতে পারে না। প্রকল্পের মাধ্যমে যে সেবা চালু করা হয়েছিল, সেটিকে স্থায়ীভাবে চালু রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করে ওটি সেবা চালু করা না হলে একদিকে যেমন দ্বীপের মানুষের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে, অন্যদিকে কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতিও অকেজো হয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ গোলাম মারুফ বলেন, “ওটি সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে সেবাটি চালু করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে গাইনি কনসালটেন্ট না থাকায় অপারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা হলে দ্রুত ওটি সেবা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা যন্ত্রপাতিগুলোও সচল ও সংরক্ষণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”












