শনিবার ২৯ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজার শহরের পাঁচতারকা হোটেল পার্কিং থেকে ৩ বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ

🗓 শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৯ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৯ বার দেখা হয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদক :: কক্সবাজার শহরের একটি পাঁচতারকা হোটেলের পার্কিং থেকে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। বৈধ আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে আইন অনুযায়ী গাড়িগুলো জব্দ করা হয়।

এর আগে ভোররাত থেকে গাড়ি তিনটি নজরদারিতে রাখে শুল্ক গোয়েন্দার একটি দল। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় গাড়িগুলোর দাবিদারদের সঙ্গে কথা বলেন কর্মকর্তারা। তারা গাড়িগুলো ‘রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াধীন’ বলে দাবি করলেও এ-সংক্রান্ত কোনো প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেননি।

শুক্রবার বিকেলে কক্সবাজারের ওশান প্যারাডাইস হোটেলের একটি হলরুমে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ।

তিনি জানান, ‘ইউজড কার পার্টস’ বা ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করে পরে সেগুলো সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ বিলাসবহুল গাড়িতে রূপান্তর করার একটি কৌশলের তথ্য গোয়েন্দা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এভাবে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে কক্সবাজার থেকে জব্দ করা তিনটি গাড়িকে জাপানি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গাড়িগুলোর সুনির্দিষ্ট মডেল, সিসি, প্রকৃত মূল্য এবং আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তিনি বলেন, বিএমডব্লিউ, টয়োটা রয়াল সালুন, ক্রাউন ও রেঞ্জ রোভারের মতো বিলাসবহুল গাড়িও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এনে সংযোজনের মাধ্যমে দেশে তৈরি করে সড়কে চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এ ধরনের গাড়ি তৈরিতে কীভাবে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।

শুল্ক গোয়েন্দার এই কর্মকর্তা জানান, গত ২৭ আগস্ট মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে আনা কয়েকটি চালান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়। পরে চালানগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, আমদানি করা যন্ত্রাংশগুলো একসঙ্গে করলে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক কাস্টমস বিধির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কোনো পণ্যের ‘অ্যাসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বা মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। কোনো পণ্যের প্রয়োজনীয় প্রায় সব যন্ত্রাংশ একসঙ্গে এনে শুধু সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পণ্যে রূপ দেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিকে চূড়ান্ত পণ্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। এই বিধানের ফাঁক কাজে লাগিয়ে সুকৌশলে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

মোংলা বন্দরের ওই চালানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে শুল্ক গোয়েন্দার তথ্যদাতা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের একটি আবাসিক এলাকার ভবনের পার্কিং থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিএমডব্লিউ গাড়ি জব্দ করা হয়। ওই গাড়ির বৈধ আমদানি বা ক্রয়সংক্রান্ত কোনো নথি সংশ্লিষ্টরা দেখাতে পারেননি।

পরে গোয়েন্দা তথ্য আসে, একই ধরনের আরও তিনটি গাড়ি কক্সবাজারে নেওয়া হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে কক্সবাজারের ওশান প্যারাডাইস হোটেলের পার্কিংয়ে গাড়ি তিনটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, শুক্রবার ভোররাত ৪টা থেকে ৫টার দিকে শুল্ক গোয়েন্দার একটি দল হোটেলে গিয়ে গাড়িগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করে। তিনটি গাড়ির মধ্যে দুটির নম্বর প্লেটও ছিল না।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানান, গাড়িগুলো শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে আনা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গাড়িগুলো কারা এনেছেন এবং তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করাও জরুরি।

পরে হোটেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় গাড়িগুলোর মালিক দাবিদারদের সঙ্গে কথা বলেন কর্মকর্তারা এবং গাড়িগুলোর বৈধ আমদানি ও মালিকানার নথি দেখাতে বলেন।

সংশ্লিষ্ট তরুণরা গাড়িগুলো ‘রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াধীন’ বলে দাবি করেন। কিন্তু ‘অ্যাপ্লাইড ফর রেজিস্ট্রেশন’ লেখা কোনো কাগজ কিংবা প্রয়োজনীয় অন্য নথি তারা দেখাতে পারেননি।

সকালে পুনরায় কাগজপত্র চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা সময়ক্ষেপণ করেন বলে জানান শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা। বিকেল পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় আইন অনুযায়ী ডিটেনশন মেমো ইস্যু করে গাড়ি তিনটি জব্দ করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তরুণরা দাবি করেন, গাড়িগুলো তারা তাদের বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন। তবে এ দাবির সত্যতা নথিপত্র যাচাই ও তদন্তের পর নির্ধারণ করা হবে বলে জানান রেজভী আহম্মেদ।

তিনি বলেন, গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তিনজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ঢাকা মেট্রো গ-৩৪ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ হাসিবুর রহমান সিনহা, ঢাকা মেট্রো গ-৩৮ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সাফিয়াত মাহমুদ এবং ঢাকা মেট্রো গ-০৩ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সারাফাত রহমান ঈশান। তাদের জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের তথ্য এবং হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।

তবে গাড়িগুলোর প্রকৃত মালিক কে, সে বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি শুল্ক গোয়েন্দার এই কর্মকর্তা।

জব্দ করা গাড়িগুলোর আনুমানিক মূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে রেজভী আহম্মেদ বলেন, গাড়ির মূল্য নির্ধারণে তারা বিশেষজ্ঞ নন। তবে বিএমডব্লিউ ব্র্যান্ডের গাড়ির দাম ৮০ লাখ টাকা থেকে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। গাড়ির সিসি অনুযায়ী শুল্কের হারও ভিন্ন হয়। বিশেষ করে ৪ হাজার সিসির বেশি ইঞ্জিনের গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্কের স্ল্যাব আলাদা। জাপানি গাড়ির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ইয়েলো বুক’ অনুসরণ করা হয়।

জব্দ করা গাড়িগুলো প্রাথমিকভাবে স্পোর্টস কার ও বিলাসবহুল গাড়ি বলে মনে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো গাড়িগুলো কীভাবে দেশে এসেছে, কোথায় যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়েছে এবং আমদানি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা বের করা।

আমদানি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে রেজভী আহম্মেদ বলেন, চোরাচালানের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য সব আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এর পেছনে থাকা নেটওয়ার্কও শনাক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, আমদানি অবৈধ প্রমাণিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ও তদন্তে আসতে পারে। একইভাবে গাড়ির ব্র্যান্ড বা পরিচয় নকল করার প্রমাণ পাওয়া গেলে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসবে।

গাড়িগুলোর মালিক রাজনৈতিক নেতা বা কোনো আমলা কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রেজভী আহম্মেদ বলেন, কারও পেশা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তের বিষয় নয়। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাড়ি জব্দের অভিযানে র‍্যাব-১৫, কক্সবাজার জেলা পুলিশ এবং বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সহযোগিতা করেছে বলেও জানান তিনি। অভিযানের পুরো প্রক্রিয়ার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বিষয়টি সরাসরি তদারক করছেন এবং শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালকের মাধ্যমে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

জব্দ করা গাড়িগুলো বর্তমানে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের হেফাজতে রয়েছে। তদন্ত শেষে গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গাড়িগুলোর বৈধতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। আর চোরাচালান বা শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা করা হবে না বলে জানান শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রণয় চাকমা।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর