রবিবার ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কী কী শর্তে হরমুজ খুলে দিল ইরান?

🗓 শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১০০ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১০০ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: মধ্যপ্রাচ্যের টানটান পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী আবারও খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, লেবানন–সংক্রান্ত যুদ্ধবিরতির বাকি সময়জুড়ে নির্ধারিত পথে সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে (বিবিসি)।

একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হরমুজ ‘খোলা’ থাকার কথা বলেছেন। তবে ঘোষণার পরও এটি কতটা বাস্তবে স্বাভাবিক হয়েছে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

কী শর্তে খোলা হলো হরমুজ?

ঘোষণায় ‘সম্পূর্ণ খোলা’ বলা হলেও বাস্তবে হরমুজ এখন একটি কঠোর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অধীনে চলছে।

বিবিসি ও সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজগুলোকে ইরান নির্ধারিত বিশেষ রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা আগের আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য বলছে, প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অনুমতি নিয়ে চলাচল করতে হবে।

শুধু বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল অনুমোদিত, সামরিক জাহাজের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থায় ইরান হরমুজ খুলছে না, বরং কার্যত পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বিশেষ রুট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফি বা টোল আরোপের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা এটিকে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত করতে পারে।

এছাড়া ইরান জানিয়েছে, এই খোলা ব্যবস্থা আপাতত লেবানন–ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান নাকি ভবিষ্যতে আর কখনো হরমুজ বন্ধ না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে — যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে জানিয়েছে আল জাজিরা ও সিএনএন।

‘সম্পূর্ণ খোলা’ — আসলে কতটা খোলা?

বিবিসি বলছে, পরিস্থিতি এখনো স্পষ্ট বা স্থিতিশীল নয়। যুদ্ধের আগে যে আন্তর্জাতিক ট্রাফিক ব্যবস্থা (ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম – টিএসএস) চালু ছিল, সেখানে পুরোপুরি ফেরা হয়নি। ফলে এই ব্যবস্থা কতটা দীর্ঘমেয়াদি হবে, কতটা স্বাধীন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আরও বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে আইআরজিসির ভূমিকা নিয়ে। তারা হরমুজে চলাচল করতে যাওয়া জাহাজে তল্লাশি চালাবে কি না, বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে কি না – তা এখনো পরিষ্কার নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এই নতুন ব্যবস্থাকে কতটা মেনে নেবে, সেটিও অনিশ্চিত। ফলে ‘খোলা’ শব্দটি বাস্তবে একটি শর্তসাপেক্ষ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারকেই বোঝাচ্ছে।

আমেরিকার আপত্তি থাকতে পারে যেখানে

ইরান বলেছে, শুধু বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে। কোনো সামরিক জাহাজ চলতে পারবে না। কিন্তু সেটা মেনে নিলে ঝামেলায় পড়বে যুক্তরাষ্ট্র।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর বাহরাইনে অবস্থিত, যা হরমুজ প্রণালীর ঠিক পরেই পারস্য উপসাগরের ভেতরে অবস্থিত।

এখানে ঝামেলাটা হলো, হরমুজ দিয়ে প্রবেশের পর এই পুরো উপসাগরীয় জলপথেই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দাপুটে নৌ উপস্থিতি। অপারেশনাল কেন্দ্র হিসেবেও এটি কাজ করছে। ফলে যদি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ বা নৌবাহিনীকে হরমুজ দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় কিংবা বিশেষ অনুমতির শর্তে চলতে হয়, তাহলে সেটি বাস্তবে বড় ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাত তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্লকেড’ থাকবে? 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক বক্তব্যে জানিয়েছেন, হরমুজ খুললেও ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকবে।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান সমুদ্রের মাইন সরাচ্ছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, হরমুজ খোলার ক্ষেত্রে ন্যাটো সহায়তার প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু তিনি তাদেরকে বলে দিয়েছেন ‘দূরে থাকো।’ যদিও ন্যাটো আসলেই এমন কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানাচ্ছে আল জাজিরা।

ট্রাম্পের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — তিনি চান ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করুক। অন্যদিকে ইরান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ছাড় চায়। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো সরাসরি চুক্তির পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: পারমাণবিক ইস্যুই কেন্দ্রবিন্দু

বর্তমান কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ পাবে। তবে এই শব্দটি পারমাণবিক খাতে প্রচলিত কোনো পরিভাষা নয়, বরং ইউরেনিয়াম মজুদের কথাই বোঝানো হচ্ছে বলে ধরে নিচ্ছেন সবাই।

অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের জব্দ করা প্রায় ২০০০ কোটি ডলার ছাড়ের বিনিময়ে এই ইউরেনিয়াম নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তিটি মূলত আর্থিক ও কৌশলগত বিনিময়ের ভিত্তিতে গঠিত হতে পারে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে দূরে থাকুক, আর ইরান চায় নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ বড় অর্থনৈতিক সুবিধা। ফলে এটি একটি ক্লাসিক ‘গিভ অ্যান্ড টেইক’ সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে।

লেবানন প্রসঙ্গ: দুই দিকে দুই দাবি

ইরান বলেই দিয়েছে, হরমুজ খোলা থাকবে লেবানন–ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির সময় পর্যন্ত। কিন্তু উল্টোদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ ইস্যু ও ইরান চুক্তির সঙ্গে লেবাননের কোনো সম্পর্ক নেই।

অথচ একই সময়ে ইসরায়েলকে আর লেবাননে হামলা না চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন বলেও দাবি করেন ট্রাম্প! যদিও ইসরায়েল বলছে, তাদের সামরিক অভিযান এখনো শেষ হয়নি।

কত জাহাজ আটকা ছিল?

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের সময় হরমুজ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়ে এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। এসব জাহাজে প্রায় ২১০০ কোটি লিটার তেল বহন করা হচ্ছিল।

এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। কারণ সাধারণ সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়।

তেলের বাজারে বড় প্রভাব

হরমুজ খোলার ঘোষণার পরপরই বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধাক্কা লাগে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডাব্লিউটিআই তেলের দাম প্রায় ১০.৫ শতাংশ কমে যায় – যা পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে দাম।

সামনে কী হতে পারে?

পাকিস্তান এরই মধ্যে ইসলামাবাদে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছে। তবে আলোচনায় কী হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘শর্তসাপেক্ষ ভারসাম্য।’ একদিকে রুট খোলা, অন্যদিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও চলমান অবরোধ।

এ অবস্থায় সম্ভাব্য তিনটি পথ সামনে রয়েছে—

প্রথমত, দ্রুত ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি হলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে আবার উত্তেজনা বাড়তে পারে।

তৃতীয়ত, হরমুজ আবারও কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ এখন শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াই, পারমাণবিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর