সোমবার ১৮ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জটিল সমীকরণে থমকে আছে বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান

🗓 সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

👁️ ৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

👁️ ৩ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৮ মে) :: বঙ্গোপসাগরের তলদেশে কোটি কোটি ঘনফুট গ্যাস লুকিয়ে থাকতে পারে — এই সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই কথা বলছেন। অথচ পাশের দেশ মিয়ানমার ও ভারত তাদের সমুদ্রসীমা থেকে গ্যাস তুলে নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখলেও বাংলাদেশ এখনো বসে আছে শূন্য হাতে। কারণ একটাই — ভূ-রাজনীতির এক জটিল চক্রে আটকে গেছে দেশের সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান।

একটি দেশকে সমুদ্র ব্লক ইজারা দিলে প্রতিবেশী বা প্রভাবশালী অন্য দেশ কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে—এমন কূটনৈতিক বিবেচনায় বছরের পর বছর গভীর ও অগভীর সমুদ্রে কার্যকর অনুসন্ধান কার্যক্রম এগোয়নি। ফলে বিশাল সম্ভাবনাময় বঙ্গোপসাগর এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা ক্রমেই কমে আসছে। অথচ সমুদ্র এলাকায় গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়েও বড় ধরনের সাফল্য আসেনি। একই সময়ে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার নিজেদের সমুদ্রসীমা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে অর্থনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

এলএনজি আমদানিতে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, তবুও সংকট

দেশে প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে। চলতি বছর শুধু এলএনজি আমদানিতেই বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে ৫৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আমদানি-নির্ভরতা যদি আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়তে থাকে, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক ভার সামলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।

স্থলভাগে নতুন গ্যাসের মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ছয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু কোনোবারই ব্যাপক সাড়া মেলেনি। এরই মধ্যে মাঝপথে ব্লক ছেড়ে চলে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের কনোকো ফিলিপস এবং কোরিয়ার পোসকো দাইয়ু।

শেখ হাসিনার সেই স্বীকারোক্তি এবং এক্সন মবিলের চিঠি

২০২৩ সালের মার্চে মার্কিন তেলসংস্থা এক্সন মবিল পেট্রোবাংলাকে সরাসরি চিঠি দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ১৫টি ব্লক ইজারা চায়। ব্লকগুলোর অবস্থান ছিল ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা — অর্থাৎ চীনের কৌশলগত স্বার্থের একেবারে কাছে।

জ্বালানি বিভাগের একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এক বৈঠকে বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্র আমাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য অনেক চেষ্টা করছে। এই ব্লকগুলো ইজারা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের আগেই ভারত এবং চীন আমাকে ফেলে দেবে।”

ফলে আবেদনটি আলোচনার টেবিলেই আটকে রাখা হয়। লোক দেখানো একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল — এক্সন মবিলকে কাজ দেওয়া হবে না।

উল্লেখ্য, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “আমি নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় থাকতে পারি যদি তাদের সেন্টমার্টিন দিয়ে দিই।”

চীনা জাহাজ ঢুকতে দেয়নি ভারত

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ভারতের ভূমিকাও বাংলাদেশের সমুদ্র অনুসন্ধানকে জটিল করে তুলেছে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গোপসাগরে প্রাথমিক জরিপের জন্য ফরাসি বহুজাতিক কোম্পানি এসএলবি (সাবেক স্ল্যামবার্জার)-কে নিয়োগ দিয়েছিল। কোম্পানিটি বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে কাজ করে এবং সাগরে তেল-গ্যাস জরিপে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত।

কিন্তু এসএলবি’র ভাড়া করা একটি চীনা জাহাজকে ভারতীয় সমুদ্রসীমার মাত্র দেড় কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি ভারত। পেট্রোবাংলা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতকে চিঠি দিয়ে শুধু জাহাজ ঘোরানোর জন্য সামান্য জায়গার অনুমতি চেয়েছিল। সেই সামান্য আবেদনও নাকচ হয়ে যায়।

ইউনূস সরকারের আমলেও একই চাপ

শেখ হাসিনার পতনের পরেও থামেনি এক্সন মবিলের তৎপরতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তারা পেট্রোবাংলাকে আগের ১৫টি ব্লক ইজারা দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল। কিন্তু পেট্রোবাংলা জানিয়ে দেয়, দরপত্র ছাড়া সরাসরি ব্লক ইজারা আইনসম্মত নয়।

পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তারা তখন আওয়ামী লীগ আমলে করা বিদ্যুৎ-জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ বিধান বাতিলের জন্য আফসোস করেছিলেন। কারণ ওই আইনটি থাকলে দরপত্র ছাড়াই চুক্তি করার পথ খোলা থাকত।

সম্প্রতি এক্সন মবিল আবারও পেট্রোবাংলায় এসে বৈঠক করেছে এবং প্রেজেন্টেশন দিয়েছে — সেই একই দাবিতে, দরপত্রের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট ১৫টি ব্লক ইজারা চেয়ে।

নতুন পিএসসি, নতুন দরপত্র — কিন্তু পথ কি মসৃণ?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) অনুমোদন দিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঘোষণা দিয়েছেন, শিগগিরই নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে। নতুন পিএসসিতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির (আইওসি) মতামতকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূ-রাজনৈতিক বাধাগুলো দূর না হলে কাগুজে সংস্কারে কাজ হবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির কারণে চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ এখন অনিশ্চিত। রাশিয়ান কোম্পানির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা দরপত্রে অংশ নিতে পারবে কিনা, সেটাও স্পষ্ট নয়। ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি বিদেশ ও অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে কাজ করলেও আওয়ামী লীগের পতনের পর তাদের কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস আগ্রহ দেখিয়েছিল, কিন্তু সাবেক সরকার সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, এই ভূ-রাজনৈতিক চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারি পর্যায়ে যৌথ মূলধনি কোম্পানি গঠন করে অনুসন্ধান চালাতে হবে। “চীন ও মালয়েশিয়াও এখন সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভালো করছে। সরকার-থেকে-সরকার পর্যায়ে চুক্তি হলে যারা আমাদের এই চক্করে ফেলেছে, তাদের কিছু বলার থাকবে না। তবে এজন্য বাংলাদেশকে বিনিয়োগ করতে হবে এবং ঝুঁকি নিতে হবে।”

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোর্তজা আহমেদ ফারুক চিশতী বলেন, পিএসসিকে সফল করা ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি ১৯৯৩ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, সেবার যোগ্য কোম্পানিকে ডেকে আলোচনার ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হয়েছিল, কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। এবারও সেই পথে যাওয়া সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, “অন্তত এটুকু স্বাধীনতা থাকা উচিত যাতে আমরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।”

প্রশ্নটা এখন তারেক রহমান সরকারের

এক্সন মবিলের সর্বশেষ তৎপরতার মুখে তারেক রহমানের সরকার কীভাবে সাড়া দেবে — সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। দরপত্র আহ্বান করলে কোন কোন দেশের কোম্পানি আসবে? আর না আসলে বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ কি আরও কয়েক দশক অব্যবহৃত পড়ে থাকবে?

বঙ্গোপসাগরের নীল জলের নিচে যা আছে, তা তোলার সুযোগ এখনো আছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে ভূ-রাজনীতির এই চক্র ভাঙতে হবে — কূটনীতিতে, সাহসে এবং কৌশলে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর