কক্সবাংলা ডটকম(২৩ নভেম্বর) :: পৃথিবীজুড়ে ভূমিকম্প এখন বড় আতঙ্কের নাম। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের কয়েকটি দেশে রিখটার স্কেলে সাত থেকে আট মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।
এসব ভূমিকম্প যখন হয়েছে, তখন বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন ঘুমে। তাই এখন ভূতত্ত্ববিদ ও সেমিওলজিস্টদের (ভূত্বকের সংকেত বিশ্লেষণকারী) কাছে মানুষের প্রশ্ন- আগে থেকে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস পাব কীভাবে?
বেশ কয়েক বছর ধরে ভূতত্ত্ববিদ ও সেমিওলজিস্টরা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন নিরন্তর। তবে বাস্তবতা বলছে, বৈজ্ঞানিকভাবে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া খুবই কঠিন।
বিবিসির প্রতিবেদনে ভূতাত্ত্বিক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উঠে এসেছে।
ইতালির রোমের সেপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিজ্ঞানের এবং যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস ম্যারোন বিবিসিকে বলেছেন, ‘একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রায়শই ভূ-কম্পনজনিত ডেটা বা সংকেত শনাক্ত করা যায়।
তবে কী অনুসন্ধান করতে হবে, সেটা বোঝা খুব কঠিন। আর পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য সেই সংকেত ব্যবহার করা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। প্রকৃতিতে অনেক অনিশ্চয়তা থাকায় আমরা প্রায়শই বড় ভূমিকম্প হতে যাচ্ছে এমন কোনো ইঙ্গিত পাই না।’
১৯৬০ সাল থেকে ভূতত্ত্ববিদরা ভূমিকম্পের আগাম বার্তা পাওয়ার জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। কিন্তু তাতে বড় সাফল্য আসেনি এখনো।
ক্রিস ম্যারোন বলেন, ‘এই ব্যর্থতার কারণ হলো- বিশ্বের বিভিন্ন দিক দিয়ে যাওয়া চ্যুতিগুলোর জটিলতা। এ ছাড়াও পৃথিবীর অভ্যন্তরে অনবরত সংঘর্ষের কারণে প্রচুর পরিমাণে আওয়াজ হয় এবং এটি বেশ গর্জন করতে থাকে।
এগুলো আবার রাস্তার ট্রাফিক, নির্মাণকাজ এবং দৈনন্দিন জীবনের কোলাহলের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় সেখান থেকে ভূমিকম্পের স্পষ্ট সংকেত বাছাই করা কঠিন হয়ে ওঠে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, একটি সত্যিকারের ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় জরুরি- এটি কোথায় ঘটবে, কখন ঘটবে এবং কত বড় আকারের হবে। ‘প্রাকৃতিক বিপদ মানচিত্র’ তৈরি করে ভূতত্ত্ববিদরা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথা জানান।
ভূতত্ত্ববিদরা ভূকম্পনের সতর্কতার পাশাপাশি প্রাণীদের আচরণ বোঝার চেষ্টা শুরু করেছেন। পৃথিবীর উপরের বায়ুমণ্ডলে বিদ্যুতের ঝলকানি থেকেও নানা তথ্য খুঁজছেন। বেইজিংয়ের ভূমিকম্প পূর্বাভাস ইনস্টিটিউটে জিং লিউয়ের নেতৃত্বে কাজ করছে একটি দল।
২০১০ সালের এপ্রিলে ক্যালিফোর্নিয়ায় ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ১০ দিন আগে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের উপরে বায়ুমণ্ডলীয় ইলেকট্রনগুলোতে বিশৃঙ্খলা দেখতে পান তারা।
পৃথিবীর আয়নমণ্ডলে বৈদ্যুতিক অসংগতি নিরীক্ষা করতে ২০১৮ সালে চায়না সিসমো-ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্যাটেলাইট (সিএসইএস) চালু করেছে চীন।
গত বছর বেইজিংয়ে চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক সেন্টারের বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, ২০২১ সালের মে মাসে ও ২০২২ সালের জানুয়ারিতে চীনের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার ১৫ দিন আগে আয়নমণ্ডলে ইলেকট্রনের ঘনত্ব কমে গেছে।
ভূতত্ত্ববিদদের কেউ কেউ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রয়োগ করছেন। মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম বা গাণিতিক পরিভাষা ব্যবহার করে অতীতের ভূমিকম্পের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছেন তারা। এই নিরীক্ষা এখনো সফলতা পায়নি।
ইসরায়েলভিত্তিক একটি দল সম্প্রতি দাবি করেছে যে, মেশিন-লার্নিংয়ের মাধ্যমে তারা গত ২০ বছরের আয়নমণ্ডলে ইলেকট্রনের পরিবর্তন পরীক্ষা করে ৮৩ শতাংশ নির্ভুলতার সঙ্গে ৪৮ ঘণ্টা আগে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে।
অন্য গবেষকরা বিভিন্ন সংকেতের ওপর ভরসা করছেন। জাপানে কেউ কেউ পূর্বাভাসের জন্য ভূমিকম্প অঞ্চলের ওপরে জলীয়বাষ্পের পরিবর্তনকে লক্ষণ হিসেবে ধরেছেন। পরীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে, এই পূর্বাভাসের ৭০ শতাংশ নির্ভুল।
চীনের তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয় এবং রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা উপগ্রহের মাধ্যমে ধারণ করা চিত্র থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট ক্ষতকে শ্রেণিবিন্যাস করছেন। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এমন সরঞ্জাম তৈরি করছেন যেন উদ্ধারকারী দলগুলোকে উপদ্রুত অঞ্চলে দ্রুত পাঠানো যায়।
অ্যালগরিদম বা গাণিতিক পরিভাষা ব্যবহার করে তারা ভবনের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করতে নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। এ নিরীক্ষা সফল হলে তারা ভূমিকম্পে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা সম্ভাব্য বিপজ্জনক কাঠামো শনাক্ত করতে পারবেন। এ গবেষণার মাধ্যমে বড় ভূমিকম্পের পরে আফটারশক বা ফোরশক নিয়ে ভালো পূর্বাভাস দেওয়া যাবে বলে দাবি করছেন তারা। তখন উদ্ধার তৎপরতায় অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।














