রবিবার ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে হঠাৎ যে কারণে বাড়ছে লোডশেডিং

🗓 শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ৫৫ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ৫৫ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৪ এপ্রিল) :: দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদনে গড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের মতো ঘাটতি হচ্ছে। গতকালও তিন হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি হতে পারে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জানানো হয়।

উৎপাদন ঘাটতির কারণে মফস্বলে বেড়েছে লোডশেডিং। গ্যাস, জ্বালানি তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো দিয়ে ঘাটতি মোকাবেলার চেষ্টা করা হলেও তিনটি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বৃহৎ সক্ষমতা উৎপাদনে না থাকায় সম্প্রতি লোডশেডিং বেড়ে গেছে। আদানি, এসএস পাওয়ার ও আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৪ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট।

বর্তমানে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকায় গ্রিডে এ তিনটি কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট সরবরাহ হচ্ছে, যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৩৯ শতাংশ। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে এসব ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকটা কমে আসবে।

বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা-১) উম্মে রেহানা গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে আমদানি করা আদানির একটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এ কেন্দ্রের ইউনিটটি ২৬ এপ্রিল পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে। এছাড়া বাঁশখালীতে আইপিপি-ভিত্তিক এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট (৬৬০ মেগাওয়াট) ২৮ এপ্রিলের দিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে।

ফলে বাড়তি আরো ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ দেয়া গেলে এ সংকট কিছুটা নিরসন হবে। জ্বালানি সংকটের কারণে আরএনপিএলের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এটা উৎপাদনে আনার কথা জানিয়েছে তারা। সব মিলিয়ে গ্রিডে ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হবে।’

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, ভারতের আদানি পাওয়ারের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। ২১ এপ্রিলও কেন্দ্রটি থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৭৫০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে বিপিডিবি।

পটুয়াখালীতে আরপিসিএল ও নরিনকো পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি বা আরএনপিএলের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। এ কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে কয়লা সংকটে ভুগছে। বর্তমানে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট (৬৬০ মেগাওয়াট) থেকে ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ নিচ্ছে বিপিডিবি। বাকি একটি ইউনিট কয়লা সংকটে বন্ধ রয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে আরএনপিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা একটি ইউনিট অর্ধেক সক্ষমতায় চালিয়ে যাচ্ছি। আরেকটি ইউনিটের জন্য কয়লা আমদানি অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মূলত কয়লা সংকট, টেন্ডার জটিলতার জন্য এ ইউনিটটি চালু করা যায়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিট চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে মে মাসের শুরুতে করা যাবে কিনা তা নিয়ে একটু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’ চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বেসরকারি অর্থায়নে নির্মিত এসএস পাওয়ারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় বর্তমানে ৬০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি উৎপাদন করতে পারছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এসএস পাওয়ার প্লান্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মো. ইবাদত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের যে ইউনিটটি চালু করার কথা বলা হচ্ছে, সেটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কতদিন চালু রাখা যাবে সেটা বলা মুশকিল।

বিপিডিবির কাছে বকেয়া সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি মাসে পেমেন্ট দেয়া হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। আগামী মাসে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণের কিস্তি রয়েছে ১৪৫ মিলিয়ন ডলার। ফলে যে অর্থ দেয়া হচ্ছে তা দিয়ে কীভাবে জ্বালানি আমদানি করব আর কীভাবে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করব? আমরা বার বার বলছি বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে, কারণ টাকা ছাড়া তো জ্বালানি আমদানি করা যাচ্ছে না।’

এসএস পাওয়ার, আদানির ঝাড়খন্ডের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৪ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির হিসাব অনুসারে বর্তমানে এ তিন কেন্দ্র থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট (২২ এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী)। সক্ষমতা তুলনায় এ তিন কেন্দ্র থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত কয়লাভিত্তিক বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কেন্দ্রটির তিনটি ইউনিটের মধ্যে সচল থাকা ১ নম্বর ইউনিটটির উৎপাদন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত বুধবার রাত ১০টার দিকে বন্ধ হয়। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সবশেষ বন্ধ হওয়া ১২৫ মেগাওয়াটের ইউনিটটি থেকে প্রতিদিন ৫০-৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো।

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় মফস্বল ও প্রান্তিক এলাকায় বড় আকারে লোডশেডিং হচ্ছে। এ লোডশেডিং এখন দিনে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্তের কথা গতকাল জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুতের উৎপাদন ঘাটতি দুই হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি, যা সারা দেশে বিতরণ কোম্পানিগুলোর আওতায় লোডশেডিং করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ২২ এপ্রিল ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়।

তবে দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) তথ্য বলছে, ২২ এপ্রিল দুপুর ১২টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। একই সময়ে পিজিসিবির হিসাবে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৯৩ মেগাওয়াট। এর আগে বেলা ১১টায় আরইবির লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ১৯৫ মেগাওয়াট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন সংস্থার ভিন্ন তথ্যের কারণে লোডশেডিংয়ের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। তাদের দেয়া তথ্যে পার্থক্য থাকায় লোডশেডিংয়ের চিত্র নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের প্রকৃত তথ্য একমাত্র দিতে পারে সঞ্চালন সংস্থা পিজিসিবি। কারণ তারা এ তথ্য এনএলডিসি (ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার) থেকে দিচ্ছে। বিপিডিবি তথ্য দেয়ার সুযোগ নেই। সেই ধরনের প্রযুক্তিও তাদের নেই। আমি মনে করি লোডশেডিংয়ের সঠিক তথ্য জনসাধারণকে জানানো উচিত। এতে মানুষ প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবে।’

জাতীয় সংসদে গতকাল ৩০০ বিধিতে দেয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি, শহরের মানুষ আরামে থাকবে এবং গ্রামের মানুষ অর্থাৎ খেটে খাওয়া কৃষক কষ্টে থাকবে, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ সমাজ অর্থাৎ শহর এবং গ্রামের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকতে পারে না, সেই বৈষম্যমুক্ত করার জন্য আমরা শহরেও প্রয়োজনে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে করে কৃষকরা তাদের সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পেতে পারেন।’

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই, এ উত্তপ্ত গরমে অনেককেই বিদ্যুৎ সমস্যায় নাজেহাল হতে হয়েছে। এ সমস্যা একদিনের নয়। এ পুঞ্জীভূত সমস্যার দায় কোনোভাবেই বর্তমান নির্বাচিত সরকার কিংবা কারো নয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনার দায় সবাইকে নিতে হচ্ছে।’

উল্লেখ্য, জাতীয় গ্রিডে সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ৮ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি (আদানিসহ)। এর বিপরীতে বর্তমানে গড়ে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। বাকি অর্ধেক সক্ষমতা জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদনে নেই। পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দেয়ার সুযোগ থাকলেও এ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিনেও কাটানো যায়নি।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর