বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারক চক্র’র ফাঁদ : বড় ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা

🗓 বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১৪ বার দেখা হয়েছে

🗓 বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১৪ বার দেখা হয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদক :: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেছিল চীনা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন রিসোর্টে অবস্থান নিয়ে চক্রটির অন্তত ৩০০ সদস্য এই কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরই মধ্যে রিসোর্টগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছিল অত্যাধুনিক ডিজিটাল ল্যাব।

পুলিশের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম পরিচয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে প্রথমে অল্প বিনিয়োগে লাভের প্রলোভন দেখানো হতো। এতে আস্থা অর্জনের পর বড় অঙ্কের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা ছিল চক্রটির মূল কৌশল। হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি করা হতো আকর্ষণীয় বার্তা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য।

এ ঘটনায় কক্সবাজারের রামু থানায় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার অভিযোগে সাইবার আইনে মামলা হয়েছে। মামলাটি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের একটি দল মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

১০ দিন নজরদারির পর অভিযান

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের কয়েকটি রিসোর্টে চীনা নাগরিকদের অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড নজরে আসার পর জেলা পুলিশ প্রায় ১০ দিন ধরে বিষয়টি গোপনে পর্যবেক্ষণ করে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের নির্দেশে জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল এ নজরদারি চালায়।

পুলিশ সুপার বলেন, অভিযানের তথ্য আগেই প্রকাশ হয়ে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারত। তাই বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

নজরদারিতে রিসোর্টে বিপুলসংখ্যক চীনা নাগরিকের অবস্থান এবং সেখানে কম্পিউটারভিত্তিক ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি অবহিত করা হয় বাংলাদেশে অবস্থিত চীনা দূতাবাসকে।

রিসোর্টে অত্যাধুনিক ডিজিটাল ল্যাব

রামুর হিমছড়ির ‘মেরিনা বিচ ভিলাস’ রিসোর্টের একটি বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক ডিভাইসের পাশাপাশি কয়েকটি কক্ষ এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যাতে বাইরের শব্দ ভেতরে এবং ভেতরের শব্দ বাইরে না যায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ চীনা নাগরিকদের একটি অংশ সরাসরি প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছিল আরও দুই শতাধিক চীনা নাগরিক।

পুলিশ ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযানে জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতারণার পরিকল্পনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসছে।

দুই দফা অভিযানে ১,৯৩৮ আইফোন জব্দ

গত ২৫ আগস্ট ও ৩ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম জব্দ করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ। অভিযানে মোট ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ ও ৪০টি মাউসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া চীনের দুটি পতাকা, চীনা পুলিশের ব্যাজ, একটি ডায়েরিসহ অন্যান্য সামগ্রীও জব্দ করা হয়েছে। এসব অভিযানে পাঁচ চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ধারণা, চক্রটির নজর শুধু চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারে সীমাবদ্ধ ছিল না; বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকেও সম্ভাব্য টার্গেট হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

চার রিসোর্টে দুই শতাধিক চীনা নাগরিক

পুলিশের অনুসন্ধানে মেরিন ড্রাইভের চারটি রিসোর্টে দুই শতাধিক চীনা নাগরিকের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। দিনের বেলায় তাঁরা সাধারণত কক্ষের বাইরে বের হতেন না। চলাচলের জন্য ব্যবহার করতেন কয়েকটি মাইক্রোবাস। গাড়িগুলোর কাচ ছিল কালো এবং অনেক সময় মুখ ঢেকে তাঁরা চলাফেরা করতেন।

স্থানীয় তিন তরুণ শাহজাহান, আকতার কামাল ও ক্যাসন তাঁদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। চীনা নাগরিকেরা নিজেদের দেশ থেকে রান্নার লোকও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। রাতের দিকে তাঁদের রিসোর্টের কক্ষের বাইরে বের হতে দেখা যেত।

ভুয়া পরিচয়ে রিসোর্ট ভাড়া

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলাস এবং উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লুম রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের আবাসিক ভবনে বিপুলসংখ্যক চীনা নাগরিকের অবস্থানের তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে এক চীনা নাগরিক গত এপ্রিল থেকে এসব রিসোর্ট ও আবাসিক ভবন ভাড়া নেন। পরে জানা যায়, তাঁর প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তাঁর সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন।

অন্যদিকে উ ওয়েইপিং নামের আরেক চীনা নাগরিক নিজেকে ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে একটি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি দাবি করতেন। তবে এসবির অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

নির্মাণকর্মীর পরিচয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ

পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চীনা নাগরিকদের একটি অংশ প্রথম দিকে নিজেদের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আসা কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। তাঁরা কর্মসংস্থান ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

পুলিশের ভাষ্য, চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের বিষয়টি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও এসবির সংশ্লিষ্ট ফরেন ডেস্কের কাছে তাঁদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আগাম তথ্য ছিল না। পরে তাঁদের অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ও রিসোর্টে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক ডিভাইস স্থাপনের বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে।

চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধিদের বিস্ময়

রিসোর্টে চীনা নাগরিকদের গোপন কার্যক্রমের বিষয়টি জানার পর চীনা দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে আসে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টে গড়ে তোলা ডিজিটাল ল্যাব পরিদর্শন করেন।

সূত্র জানায়, রিসোর্টের ভেতরে বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেখে দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও বিস্মিত হন। পরিদর্শনের পর তাঁরা বিষয়টি নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে তাঁদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সহযোগিতার কথা জানানো হয়।

৯৪ জন সরাসরি জড়িত, ২৯৫ পাসপোর্ট নম্বর ব্লক

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্তত ৯৪ জন চীনা নাগরিকের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুই শতাধিক চীনা নাগরিকের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

এ পর্যন্ত কক্সবাজার পুলিশ চক্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৯৫ জন চীনা নাগরিকের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করেছে। এসব পাসপোর্ট নম্বর ব্লক করে দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

রামু থানায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ চীনা নাগরিকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও আড়াই থেকে তিন শ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।

এমএফএস অ্যাকাউন্টেও লেনদেনের জাল

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রিসোর্টে স্থাপন করা ডিজিটাল ল্যাবের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের একটি জাল তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।

একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনিয়োগের প্রলোভন, অন্যদিকে অর্থ স্থানান্তরের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল একাধিক আর্থিক চ্যানেল। ফলে পুরো কার্যক্রমটি কেবল একটি সাধারণ অনলাইন প্রতারণা নয়; বরং পরিকল্পিত ও আন্তর্জাতিক পরিসরের ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণার কাঠামো ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।

এসবির এক কর্মকর্তা জানান, বিনিয়োগকারীদের প্রথমে ছোট অঙ্কের বিনিয়োগে লাভ দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হতো। এরপর বেশি লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল চক্রটির।

বড় ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, চীনা নাগরিকদের কর্মকাণ্ড গত মার্চ থেকেই নজরদারিতে ছিল। প্রথমদিকে তাঁরা নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিলেও রিসোর্টে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের পর বিষয়টি পুলিশের কাছে গুরুতর বলে মনে হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, রিসোর্টে তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। এতে সম্ভাব্য বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিহত করা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চক্রটি তাদের পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশে বসে একাধিক দেশের বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা চালানো সম্ভব হতো। বর্তমানে জব্দ করা ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা, অর্থ লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ এবং চক্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

পুলিশ বলছে, চীন-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের সাইবার নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রতারণার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

কুতুবদিয়ার অদম্য মেধা শরিফুল

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিলুপ্তির পথে কাজিরমার্কেট-কাটাফাঁড়ি সড়ক

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কক্সবাজারে পুলিশের অভিযানে আটক হলো ২২ অপরাধী

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টৈইটংয়ে চেয়ারম্যান পদে লড়তে চান জাহেদ উল্লাহ

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চকরিয়াকে ট্রাইবেকারে ৩-১ গোলে হারিয়ে রামুর জয়

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর