কক্সবাংলা ডটকম(১১ মার্চ) :: অন্তহীন কৌতূহল। বিস্তর গুঞ্জন। টানটান উত্তেজনা। একটিমাত্র খবরকে কেন্দ্র করেই। আলোচনার জাল চারদিকে। সীমান্ত পেরিয়ে ওপারেও।
খবরটা এলো ভারতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে।
শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে। কারণ আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন এক মোড় নিয়েছিল।
১২ ডিসেম্বরের কথা। ক’দিন আগেই নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হয়েছে।
ওসমান হাদি নিজেই একজন প্রার্থী। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি টিভির পর্দায় তখন সরব।
বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এরমধ্যেই ঘটে যায় নির্মম-নিষ্ঠুর এই হত্যাকাণ্ড।
রাজনীতিতে তখন ওলট-পালট অবস্থা। অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে যায় নির্বাচন। ভারতবিরোধী রাজনীতি আরও চাঙ্গা হয়।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের হাত রয়েছে- এমনটাও বলা হয়। ইউনূস প্রশাসন তটস্থ।
শাহবাগে লাগাতার অবস্থান শুরু হয়। সবার দৃষ্টি শাহবাগের দিকেই। সিঙ্গাপুর থেকে তখন খবর আসে ওসমান হাদি আর নেই।
বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী আর ছায়ানটে চালানো হয় আগুন সন্ত্রাস।
প্রফেসর ইউনূস সবাইকে শান্ত থাকতে বলেন। পরিস্থিতি তখন অশান্ত, উত্তাল। বলাবলি ছিল হত্যাকারী অবশ্যই ভারতে চলে গেছে।
যদিও আখেরে তা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু কীভাবে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হলো
এ নিয়ে পর্দার আড়ালের অনেক খবর চাউর হয়ে আছে। দু’দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানই নাকি এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে সাহায্য করছে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দার হাতে খবর ছিল- শ্যুটার মাসুদ আর আলমগীর দু’জনেই পশ্চিমবঙ্গে লুকিয়ে রয়েছে। অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন তারা।
যদিও তৎকালীন সরকার তাদের কোনো কার্যক্রমই আমলে নেয়নি।
১৮ মাস শাসনকালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাদের দেয়া কোনো তথ্য যাচাই বাছাই করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা যখন হুমকির মুখে তখনও তাদের আড়ালে রাখা হয়।
অবিশ্বাস আর সন্দেহ সরকারপ্রধানকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সরকারের ভেতরকার এবং বাইরের একটা শক্তি মিলে নানা খেলায় মত্ত ছিল।
অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল- নির্বাচন বিলম্বিত করা। কিন্তু প্রধান রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনের ব্যাপারে ছিল অবিচল।
তারা সরকারকে বারবারই বলেছে, নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ নেই।
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী ২২শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রধানের দায়িত্ব পান।
এর কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি ভারত সফরে যান। সেখানে তিনি ‘র’ প্রধান পরাগ জৈনর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন।
সম্ভবত এই বৈঠকে জেনারেল কায়সার কিছু তথ্য আদান-প্রদান করেন।
এই তথ্যের সূত্র ধরেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হন ওসমান হাদির হত্যাকারী পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছে। এর পরপরই তাদেরকে বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত বন্দি বিনিময় চুক্তির অধীনেই শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীরকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই কনস্যুলার অ্যাক্সেস চেয়েছে।
এই যখন অবস্থা তখন ঢাকায় অনেকের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তদন্ত শুরু হয়েছে। হাদি হত্যার পেছনে আসলে কারা জড়িত ছিল।
কারা নির্বাচনকে অনিশ্চিত করতে চেয়েছিল। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেছিল। কারা চেয়েছিল এক ঢিলে দুই পাখি মারতে!
গোয়েন্দাদের অনেকেই নিশ্চিত হয়েছেন- আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি বৃহৎ খেলার অংশ।
ইউনূস সরকারকে হটিয়ে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে নতুন কোনো পরিকল্পনা ছিল তাদের। তদন্তে বের হয়ে আসবে এর পেছনে কোন শক্তি কাজ করেছে।
হাদির হত্যাকারীরা যেভাবে বনগাঁ পৌঁছেছিল
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে বলে তদন্তকারীদের সূত্রে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। গোয়েন্দারা ধৃতরা কোন পথে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয় এসে পৌঁছেছিল তা জানার চেষ্টা করেছে। গোয়েন্দাদের দাবি, আটককৃতরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে সোজা গুয়াহাটিতে চলে যায়। সেখানে থাকা নিরাপদ নয় বিবেচনায় চলে এসেছিল শিলিগুড়িতে।
কিছুদিন থাকার পর বাংলাদেশে ফেরার অভিপ্রায়ে কৃষ্ণনগর হয়ে আটককৃতরা বনগাঁয় এসেছিল বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, বারাসাত-মধ্যমগ্রাম অঞ্চলে কয়েক জনের সঙ্গে দেখা করেছিল। জানা গেছে, মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীরের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে তাদের নিয়ে অভিযান চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত আড়াই মাস তারা নিয়মিত ডেরা পাল্টেছেন। কখনো পরিচিতদের আশ্রয়ে ছিল, কখনো পরিচয় গোপন করে হোটেলে ছিল। কোথায় কোথায় ধৃতরা কাদের আশ্রয়ে থেকেছে এবং কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল তার খোঁজ করছে গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তদন্তকারী গোয়েন্দারা ধৃত দু’জনকে নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। ধৃতরা পশ্চিমবঙ্গে এসে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল তাও জানার চেষ্টা চলছে। সীমান্ত এলাকায় কাদের মাধ্যমে আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরও খোঁজ চলছে।
বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য সীমান্ত এলাকার কোন কোন দালালের সঙ্গে কথা হচ্ছিল তাও জানার চেষ্টা চলছে।
শনিবার মধ্যরাতে বনগাঁ-বাগদা রোড থেকে তাদের আটক করা হয়। পরে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতীয় গোয়েন্দারা ওসমান হাদির হত্যাকারীদের সম্পর্কে কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ থেকে তথ্য পেয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। তার ভিত্তিতে তাদের ওপর নজর রাখছিল গোয়েন্দারা। শেষ পর্যন্ত শনিবার রাতে গ্রেপ্তার করে রোববার বিধাননগর আদালতে পেশ করা হয়। বিচারক পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে ধৃতদের ১৪ দিনের জন্য পুলিশ হেফাজত মঞ্জুর করেন।














