কক্সবাংলা ডটকম(১৮ এপ্রিল) :: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা ক্রমাগত দুর্যোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে চলেছে। এর ফলে আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সমাজের ভঙ্গুরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মূলত গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়ছে, যার ফলে সামুদ্রিক বরফ দ্রুত গলছে। এর প্রভাবে পৃথিবীর জলবায়ু পর্যবেক্ষণাধীন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।
এই পরিবর্তনগুলো মূলত কয়েক দশকের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু এর ক্ষতিকর প্রভাব শত শত বছর ধরে মানবজাতিকে ভোগ করতে হবে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশাবাহিত রোগবালাই বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্য ধীরে ধীরে সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট-২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গত ২৩ মার্চ বিশ্ব আবহাওয়া দিবস উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দশক। এই সময়ে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের গড় তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
সমুদ্র ক্রমাগত উষ্ণ হয়ে উঠছে
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্র ক্রমাগত উষ্ণ হয়ে উঠছে এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে চলেছে। গত দুই দশক ধরে প্রতি বছর এটি মানুষের বার্ষিক শক্তি ব্যবহারের প্রায় আঠারো গুণ সমপরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে আসছে।
প্রতিবেদনটি নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বৈশ্বিক জলবায়ুর অবস্থা এখন জরুরি পর্যায়ে পৌঁছেছে। পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য ধীরে ধীরে তার সীমা অতিক্রম করছে।
তিনি বলেন, মানবজাতি ইতোমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম এগারোটি বছর অতিক্রম করেছে। যখন কোনো ঘটনা বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, তখন তা আর কাকতালীয় থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের এক স্পষ্ট ও গুরুতর সতর্কবার্তা।
প্রতিবেদনটিতে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কারণ একটি স্থিতিশীল জলবায়ু ব্যবস্থায় সূর্য থেকে আগত শক্তি ও মহাশূন্যে নির্গত শক্তির পরিমাণ প্রায় সমান থাকে।
কিন্তু তাপ আটকে রাখা গ্রিনহাউস গ্যাস— যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের— ক্রমবর্ধমান ঘনত্ব অন্তত ৮ লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ফলে এই ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৬০ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর শক্তির এই ভারসাম্যহীনতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষত গত দুই দশকে এর মাত্রা সর্বাধিক বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেন, মানুষের কর্মকাণ্ড ক্রমাগতভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট করছে এবং এর পরিণতি মানবজাতিকে শত শত, এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে বহন করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতিদিনের আবহাওয়া আরও চরম রূপ নিচ্ছে। ২০২৫ সালে তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা, ক্রান্তিয় ঘূর্ণিঝড়, ঝড় ও বন্যার কারণে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শত শত কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মহাসাগরের তাপের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে
ডব্লিউএমওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মহাসাগরে সঞ্চিত তাপের পরিমাণ নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০০৫ থেকে ২০২৫ সময়কালে মহাসাগরের উষ্ণায়নের হার ১৯৬০ থেকে ২০০৫ সময়কালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দ্রুত উষ্ণায়নের ফলে সামুদ্রিক বরফ গলার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বেড়েছে।
৪১ বছরে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় পিএইচ হ্রাস পেয়েছে
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, মহাসাগরের উষ্ণায়ন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শত শত বছর ধরে চলতে থাকবে। দীর্ঘকালীন সময়—শতবর্ষ থেকে সহস্রাব্দ—মহাসাগরের উষ্ণায়ন এবং গভীর সমুদ্রের পিএইচের পরিবর্তন অপরিবর্তনীয় হবে।
মানুষের কার্যকলাপ থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ২৯% কার্বন মহাসাগর দ্বারা শোষিত হয়েছে, যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পিএইচ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
গত ৪১ বছরে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় পিএইচ হ্রাস পেয়েছে, এবং বর্তমান পিএইচ মান অন্তত ২৬ হাজার বছরের মধ্যে অভূতপূর্ব। এর ফলে মহাসাগরের জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, শামুক ও ঝিনুক চাষ এবং মৎস্যজাত খাদ্য উৎপাদনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথক পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনটি প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস— কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের মাত্রা ২০২৫ সালেও বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব গত ২০ লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের ঘনত্ব অন্তত গত ৮ লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ২০২৪ সালে বার্ষিক কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) ঘনত্বের বৃদ্ধি ছিল ১৯৫৭ সালে আধুনিক পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ।
বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের নিকটবর্তী তাপমাত্রা
২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এগারো বছর ইতিহাসের রেকর্ডকৃত উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ১৭৬ বছরের পর্যবেক্ষণমূলক রেকর্ডে ২০২৫ সাল ছিল দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর। বার্ষিক গড় বৈশ্বিক ভূপৃষ্ঠের নিকটবর্তী তাপমাত্রা ১৮৫০–১৯০০ সালের প্রাক-শিল্প যুগের গড়ের তুলনায় প্রায় ১.৪৩ ± ০.১৩°সেলসিয়াস বেশি ছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে ২০২৪ সালটি একটি শক্তিশালী এল নিনো ঘটনার সঙ্গে শুরু হয়েছিল। তারপরও এ বছরের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১.৫৫°সেলসিয়াস বেশি হয়ে ইতিহাসের উষ্ণতম বছরের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
৯ বছর ধরে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রেকর্ড
২০২৫ সালে সমুদ্রের তাপের পরিমাণ (২,০০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত) ১৯৬০ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে পূর্ববর্তী সকল রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। এভাবে গত ৯ বছর ধরে প্রতিবছরই সমুদ্রের তাপের পরিমাণ নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। ২০০৫ থেকে ২০২৫ অর্থাৎ গত দুই দশকে সমুদ্রের উষ্ণায়নের হার ১৯৬০ থেকে ২০০৫ সালের সময়কালে পরিলক্ষিত হারের দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এই পরিমাণ বছরে প্রায় ১১.০–১২.২ জেটাজুল।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ভূগর্ভস্থ জলের লবণাক্ততা বাড়ায় ও বন্যার কারণ
২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ ২০২৪ সালে পরিলক্ষিত রেকর্ড-উচ্চ স্তরের সমান ছিল। এটি ১৯৯৩ সালে স্যাটেলাইট অল্টিমেট্রি রেকর্ড শুরু হওয়ার পরের সময়ের তুলনায় প্রায় ১১ সেমি বেশি। যদিও ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের বৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় সামান্য কম ছিল। তবু ২০১২ সাল থেকে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার ১৯৯৩–২০১১ সালের হারের তুলনায় অনেক বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি ঘটে, ভূগর্ভস্থ জলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং বন্যার ঝুঁকি বাড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি তৈরি করে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার একটি ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে উদ্ভিদের ক্ষতিকর পোকা এবং পশুর রোগ ছড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা, অভিবাসন এবং জৈব-নিরাপত্তার ওপর ধারাবাহিক প্রভাব ফেলে থাকে। তা ছাড়া বিশ্বব্যাপী মানুষের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতিকেও প্রভাবিত করে।
কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকির মুখে ১.২ বিলিয়ন মানুষ
জলবায়ু পরিবর্তনে মৃত্যুহার, জীবিকা, বাস্তুতন্ত্র এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে পানিবাহিত রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত চাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এই রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
তাপজনিত চাপ একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা। বিশ্বব্যাপী কর্মশক্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি (১.২ বিলিয়ন মানুষ) প্রতিবছর কোনো না কোনো সময়ে কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন হন। বিশেষ করে যারা কৃষি ও নির্মাণ খাতে কর্মরত।














